গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা ভেস্তে যাওয়ার পর এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ কিনে নিতে চান ট্রাম্প
ভারত মহাসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে নতুন এক সম্ভাব্য পরিকল্পনা বিবেচনা করছে হোয়াইট হাউস। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দ্বীপটি কেনার মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেওয়ার একটি চুক্তি করতে পারে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এই আলোচনা এমন সময় সামনে এসেছে, যখন গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ট্রাম্পের আগের উচ্চাভিলাষ ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প এর আগেও বিভিন্ন সময় একাধিক দেশ ও অঞ্চলকে নিয়ে বিস্তৃত ভূখণ্ডগত দাবি ও হুমকির কথা বলেছেন। এর মধ্যে কানাডা ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের '৫১তম অঙ্গরাজ্য' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
এছাড়া, পানামা ও কিউবার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্প। একই সময়ে ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো এবং ছোট নৌযানের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে সামরিক অভিযান চালানোর কথাও উঠে এসেছে তার নীতিগত অবস্থানে।
সর্বশেষ চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে এই পরিকল্পনা এসেছে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যখন ব্রিটেনের একটি বিলম্বিত আইনি প্রক্রিয়া অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ পূর্ব আফ্রিকার দেশ মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।
জানুয়ারিতে এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রত্যাহার করা হয়। সে সময় ট্রাম্প এই চুক্তিকে 'চরম বোকামির কাজ' বলে অভিহিত করেন।
'দ্য টেলিগ্রাফ'-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাগোস দ্বীপ কেনার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলটিকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়টি হোয়াইট হাউসের কাছে বিবেচনাধীন একাধিক বিকল্পের মধ্যে একটি।
ভারত মহাসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যা এর কৌশলগত গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই তার পররাষ্ট্রনীতিতে ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণের প্রবণতা আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের মন্তব্য। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে নতুন আলোচনাও শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র দ্য টেলিগ্রাফকে জানিয়েছে, মার্কিন ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট সরাসরি এই ধারণাটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে উপস্থাপন করেন। তবে বলা হচ্ছে, এটি বর্তমানে ট্রাম্পের প্রধান বিবেচ্য বিকল্প নয়।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর প্রশ্নের জবাবে দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, যুক্তরাজ্যের উচিত ব্রিটিশ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলটি হস্তান্তর না করা—এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত হবে।
তিনি বলেন, 'ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ডিয়েগো গার্সিয়ার কৌশলগত অবস্থান এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য একটি সামরিক স্থাপনায় পরিণত করেছে।'
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য নিয়মিতভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে ডিয়েগো গার্সিয়াকে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কার্যকর রাখা যায়।
ট্রাম্পের কথিত ভূখণ্ড বিস্তারের নীতিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একাধিক প্রতিবেদনের বরাতে বলা হচ্ছে, জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত নেতা নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত দেন তিনি।
ওই সময় তিনি কথিত 'ডনরো ডকট্রিন' ঘোষণা করেন, যা ঐতিহাসিক মনরো ডকট্রিনের একটি বিকৃত ব্যাখ্যা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। মনরো ডকট্রিন মূলত লাতিন আমেরিকায় ইউরোপীয় প্রভাব ঠেকানোর নীতি ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নতুন নীতিগত অবস্থানকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসন পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আরও জোরদার করার দিকে এগোচ্ছে, যার অংশ হিসেবে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানও পরিচালিত হয়।
এদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতিও একই ধরনের কৌশলগত রূপরেখার অংশ হিসেবে পরিকল্পিত ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে যুদ্ধটি ট্রাম্পের পূর্বাভাসের চেয়ে কয়েক মাস বেশি সময় ধরে চলছে।
এখন পর্যন্ত একটি দুর্বল যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইরানের সঙ্গে সম্পূর্ণ চুক্তি করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার লক্ষ্য অর্জন করা যায়নি। প্রণালিটি দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচিত।
অন্যদিকে গত বছর গ্রিনল্যান্ডকে ডেনমার্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার একটি প্রচেষ্টাও চালান ট্রাম্প, যেখানে তিনি সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থের যুক্তি তুলে ধরেন। তবে সে উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত এগোয়নি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে এই সময় ইউরোপ ও ন্যাটোর ভূমিকা নিয়েও মতবিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থনকে ট্রাম্প যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন।
স্টারমারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়েও নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে। ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়, কারণ এখানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়া।
ডিয়েগো গার্সিয়া অবস্থানগতভাবে ভারত মহাসাগরের এমন একটি জায়গায়, যেখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অভিযান পরিচালনা সহজ। পাশাপাশি ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ বহুদিন ধরেই ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মরিশাসের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে।
