জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধ দমনে সেনাবাহিনীর উদ্যোগ: শুরু হয়েছে ৪ সড়ক নির্মাণের কাজ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চলঘেরা জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চারটি সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাস জমি ও বনভূমি নিয়ে বিস্তৃত এই এলাকায় অবৈধ দখল ও বসতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৮ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীনে ২৬ ইসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্মাণ কাজ শুরু করে। কাজ শুরুর আগে প্রকল্প এলাকা সরজমিনে পরিদর্শন করেন ২৬ ইসিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামরুল আল মাসুদ।
সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সড়কগুলো হলো—ছিন্নমূল এলাকা থেকে আলীনগর হাইস্কুল পর্যন্ত একটি সড়ক, আলীনগর থেকে টেক্সটাইল এলাকা হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত একটি সংযোগ সড়ক, আলীনগর থেকে বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমির (বিএমএ) পাশ ঘেঁষে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের সাথে যুক্ত আরেকটি সড়ক এবং এলাকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে আরও একটি সংযোগ সড়ক।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামরুল আল মাসুদ জানান, এই প্রকল্পের জন্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো বাজেট অনুমোদিত হয়নি। তবে জনস্বার্থে এবং এলাকাটির গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকায় সেনাবাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়েজিদ লিংক রোড সংলগ্ন জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় নব্বইয়ের দশক থেকে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন ও খাস জমি দখলের রাজত্ব শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, আলী আক্কাস নামের এক ব্যক্তি ওই সময় পাহাড়ি জমি দখল করে নিজস্ব সশস্ত্র বলয় গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে 'ছিন্নমূল সমবায় সমিতি'র নামে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে সরকারি জমি নামমাত্র মূল্যে বিক্রির এক বিশাল অবৈধ ভূমি বাণিজ্য গড়ে ওঠে।
আলী আক্কাস র্যাবের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তাঁর একাধিক সহযোগী—কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক পৃথক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। বর্তমানে এই এলাকাটিতে প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস থাকলেও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার বলে দাবি করা হয়। সেখানে পাহাড় কাটা, মাটির ব্যবসা, অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ, যানবাহনে টোল আদায় এবং নিয়মিত চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমনকি দুর্গম এই এলাকাটি মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের নিরাপদ আস্তানা হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকার সরকারি খাস জমিতে পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে গত ১১ মার্চ 'জঙ্গল সলিমপুর উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি' নামে ২৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে (ডিসি) সভাপতি করে গঠিত এই কমিটিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর প্রতিনিধির পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি বিভাগ ও এলজিইডির কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম সভায় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে স্থায়ী পুলিশ ও র্যাব ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে গত ৯ মার্চ জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অপরাধীদের ধরতে যৌথ বাহিনীর একটি বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযান পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন জঙ্গল সলিমপুরে বসবাসরত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, "অবকাঠামো উন্নয়ন, সমন্বিত প্রশাসনিক তদারকি এবং নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হলে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত এই এলাকায় পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।"
