জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ ফাঁড়ির পানির উৎসে বিষ মেশানোর ঘটনায় ৫৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে আলীনগর পুলিশ ফাঁড়ির পানির সরবরাহ লাইনে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগে ৫৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।
রোববার (২৬ জুলাই) রাতে সীতাকুণ্ড থানায় অন্তর্ঘাতমূলক অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত আরও ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)-কে বলেন, 'এ ঘটনায় অন্তর্ঘাতমূলক মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় সুনির্দিষ্ট ৩৪ জন এবং অজ্ঞাত ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে।'
তিনি বলেন, 'এ ঘটনায় মামলায় জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসী দল ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিনকেও আসামি করা হয়েছে।'
এর আগে রোববার বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম টিবিএসকে জানান, আলীনগর ক্যাম্পে র্যাব, বিজিবি ও পুলিশ মিলিয়ে প্রায় ৩০০ সদস্য অবস্থান করেন। ক্যাম্পে ট্যাংকের মাধ্যমে সরবরাহ করা পানি ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, 'ভোরে দায়িত্বে থাকা মোটর অপারেটর পানি সরবরাহ চালু করতে গিয়ে পানিতে তীব্র দুর্গন্ধ ও অস্বাভাবিক আলামত দেখতে পান। পরে দেখা যায়, সবগুলো পানির ট্যাংকের অবস্থাই একই রকম। ঘটনাস্থলে একটি খালি বিষের বোতলও পাওয়া গেছে।'
পুলিশ সুপার বলেন, 'পানির নমুনা এবং খালি বোতলটি পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত এটি বিষ, কীটনাশক নাকি অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ—তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।'
তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সরবরাহ লাইনের একটি সংযোগস্থল খুলে সেখানে কোনো পদার্থ ঢেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্তাধীন এবং নিশ্চিত হতে আরও সময় লাগবে।
মাসুদ আলম বলেন, 'ওই পানিতে হাত-মুখ ধোয়ার পর পুলিশের তিন কনস্টেবল সাময়িকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাদের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং কাউকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়নি।'
পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, রোববার সকালে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর পুলিশ ফাঁড়িতে ব্যবহৃত পানিতে সাদা ফেনা ও দুর্গন্ধ দেখতে পান দায়িত্বরত সদস্যরা। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে পানি ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে সীতাকুণ্ড থানা ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরীক্ষার জন্য পানির নমুনা সংগ্রহ করেন।
পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, 'জঙ্গল সলিমপুরকে ভূমিদস্যুমুক্ত রাখতে সেখানে যৌথবাহিনী অবস্থান করছে। এটি সন্ত্রাসীরা মেনে নিতে পারছে না। এর আগে তারা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে, ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। সর্বশেষ পানিতেও তারাই বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়েছে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।'
তিনি জানান, তদন্ত করতে গিয়ে জঙ্গলের ভেতরে পানির সরবরাহ লাইনের একটি অংশ কেটে প্লাস্টিক দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখানে দুটি পৃথক লাইন রয়েছে— একটি স্থানীয় স্কুলে এবং অন্যটি পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর যৌথ ক্যাম্পে পানি সরবরাহ করে।
অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, 'দুষ্কৃতকারীরা প্রথমে যৌথবাহিনীর লাইনের ভালভ বন্ধ করে পাইপ কেটে ভেতরে বিষাক্ত কোনো কেমিক্যাল ঢুকিয়ে দেয়। পরে সেটি প্লাস্টিক দিয়ে এমনভাবে মুড়িয়ে রাখা হয়, যাতে বিষয়টি সহজে ধরা না পড়ে। সকালে সদস্যরা পানি ব্যবহার করতে গিয়ে বিষয়টি টের পান। নচেৎ এই পানি ব্যবহার করলে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় স্কুলের শিক্ষার্থীরাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারত।'
তিনি আরও বলেন, 'রোববার ওই পানি ব্যবহারের পর ৩-৪ জন সদস্য পেটের সমস্যাসহ হালকা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়েছে এবং তারা সুস্থ আছেন।'
পুলিশ জানিয়েছে, পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পানিতে প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের বিষাক্ত বা ক্ষতিকর পদার্থ ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলছে। এর আগে ওই এলাকায় র্যাব ক্যাম্পে হামলা, গুলিবর্ষণ ও সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া, ক্যাম্প স্থাপনের কয়েক দিনের মধ্যেই পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক ঘটনার পর এলাকায় নিরাপত্তা ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
