তারা
মংসিনের কটেজ দেখতে যাবে।
তারা রওয়ানা দিয়েছিল পাহাড়ে। ঠাকুর ও ভব।
মংসিনের কটেজ এবং লোকেশন দেখবে।
ঠাকুর টেলিভিশন, ওটিটি ও ইউটিউব চ্যানেলের জন্য ভিডিও ফিকশন বানায়। ভব আর্ট ডিরেকশন দেয়।
বেশ কিছু পুরস্কার ইত্যাদি পেয়েছে।
শুটিং ইউনিটের গাড়িতে তারা যখন গাজীপুরের জঙ্গল পার হয়ে যাচ্ছিল, তাদের আমার কথা মনে পড়ে এবং তারা এই যাত্রায় আমাকে অনিবার্য মনে করতে থাকে। ঠাকুর হিংস্র একটা ভাব নেয় এবং গাড়ির ড্রাইভার সকেটকে বলে, 'গাড়ি ঘুরা।'
আমি ঘুমাই নাই। 'দেলুপি' দেখছিলাম। ভালো ছবি করেছে তাওকিররা। এন্ড টাইটেলে উপস্থিত হলো দুই ষন্ড। ঠাকুর বলল, 'তুমি ঘুমাও নাই।'
'দেলুপি দেখলাম।'
'অ, দেলুপি। কেমন বানিয়েছে?'
'ভালো লাগছে।'
'হইল।'
কী হইল?
ভব বলল, 'লন ওস্তাদ।'
'কই লব বাবা ভব?'
ঠাকুর বলল, 'জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ। মংসিনের কটেজ।'
ঠাকুর-ভব দুইটাই চারুকলায় পড়েছে। ঠাকুর ওরিয়েন্টালে, ভব ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিংয়ে। যৌথ সিদ্ধান্ত নিয়ে মাস্টার্স করে নাই। ভিডিও ফিকশন এবং খুচরো-খাচরা অ্যাড বানানোতে মনোনিবেশ করেছে। যৌথ এইম ইন লাইফ সিনেমা বানাবে। বানাক। সিনেপ্লেক্সে যদি মুক্তি দিতে পারে তবে সিনেপ্লেক্সে গিয়ে তাদের সিনেমা দেখব। এখন অন্য কথা বলি। আমি যদি ভবর বাবা হতাম, ভবর নাম ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক রাখতাম। সংক্ষেপে ন্যাট জিও। জঙ্গলে পাহাড়ে ভব প্রকৃত ভব হয়ে ওঠে। আর কিছু রহস্য আছে তার মধ্যে। সেটা আমি ধরতে পারি না। দুর্গম পাহাড়ের গহিন জঙ্গলে মংসিনের কটেজের আবিষ্কর্তা সে। জঙ্গলের অপদেবতা হিনজনের পত্নী মংসিন। আরও দুর্গম এক পাহাড়ের উপত্যকা থেকে হিনজন ধরে এনেছিল মংসিনকে। মানুষের মেয়ে অপদেবতা হিনজনের প্রণয়াসক্ত হয়েছিল। আকাশ থেকে পাথর পেড়ে হিনজন কটেজ বানিয়ে দিয়েছিল মংসিনকে। জলপ্রপাতের ধারে কটেজ। মানুষের মেয়ে জলপ্রপাতের জলের শব্দের মধ্যে ঘুমাবে।
রাত যেটুক বাকি ছিল, রাস্তায় গেল। দিনটাও।
আরেকটা রাতে গাড়ি গহিন জঙ্গলে ঢুকল।
মনে হলো তিষিকে একটা কল দেই। ৮৫ বছর বয়সে তিষির সিনু ফুফু গতকাল মারা গেছেন। সামান্য বিষাদ ভারাক্রান্ত হয়ে আছে তিষি। মেসেজ দিয়েছিল—
: একটা দৃশ্য শেষ হয়ে গেল।
বুঝতে পারি নাই।
: কোন দৃশ্য?
: সিনারি ফুফু।
সিনু ফুফুর মৃত্যুর পর, খুবই আজব কথা, তিষির মা তিষিকে বলেছেন, 'তোমার ফুফুর নাম ছিল সিনারি আখতার।'
সিনারি থেকে সিনু।
সিনারি—দৃশ্য।
জিরাফের ছেলে হবে। 'দৃশ্য' নাম রাখতে বলব। জিরাফ-জারিফ।
তিষিকে কল দিতে গিয়ে দেখলাম ফোনে নেটওয়ার্ক নাই। ভব বলল, 'আমরা এখন আউট ল, ওস্তাদ। আউট অফ নেটওয়ার্ক। সকেট, স্টপ।'
এই যে এই ছেলেটার নাম সকেট, গাড়ি রাখল সে। তার নাম সকেট কে রাখল? মানুষের নাম সিনারি, সকেট—আগে শুনি নাই।
আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। সকেট গাড়ি নিয়ে এখানে থাকবে। পূর্ণিমা দুই দিন পরে। জোছনায় মায়া ধরে আছে পাহাড়ে, জঙ্গলে। তারা ভর্তি আকাশ ঝকঝকে নীল—আর্টিস্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে চলাফেরা করি, আমি জানি এটা প্রুশিয়ান ব্লু।
বৃষ্টি হচ্ছে নিকট কোনো পাহাড়ে?
বৃষ্টির শব্দ।
বিভ্রম। জল প্রপাতের জলের শব্দ—বৃষ্টির শব্দ মনে হচ্ছিল। তবে জলপ্রপাত চোখে দেখলাম না, মংসিনের কটেজ দেখলাম। ছোট কটেজ। এই কটেজে মংসিন কী করে থাকত? আকাশ থেকে পাথর পেড়ে এনে এই কটেজ বানিয়ে রেখে গেছে হিনজন। শ্যাওলা জমে সবুজ হয়ে আছে কটেজ।
আর একটা ব্যাপার। রাতে অনেক রকম শব্দ উঠে জঙ্গলে। পাখির ডাক, জন্তু জানোয়ারের আওয়াজ। এই জঙ্গলে সেসব একদম নাই। বৃষ্টির শব্দের মতো জলপ্রপাতের শব্দ শুধু লুলাবাই গেয়ে যাচ্ছে সেই মানুষের মেয়ে মংসিনের জন্য।
'ভব দাদা।'
ঘাস জংলা ফুঁড়ে সে উঠল। শালপ্রাংশু একজন মানুষ। ঠাকুর ও ভব না থাকলে হয়তো আমি একে ভূত মনে করে নিতাম। যে পাহাড়ে অপদেবতা থাকে সেই পাহাড়ে ভূত থাকতেই পারে।
ভব বলল, 'উলোশ।'
শালপ্রাংশু মানুষটার নাম উলোশ। সে মংসিনের কটেজের 'ফইরল'। ফইরল মানে সিকিউরিটি গার্ড। হিনজন যেদিন মংসিনকে নিয়ে উড়ে যায়, দায়িত্ব দিয়ে গেছে উলোশকে, 'কটেজের রক্ষণাবেক্ষণ তুই করবি।'—তিন শ ছিয়াশি বছর ধরে সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে উলোশ। তিন শ ছিয়াশি বছর মানে কী? ছিয়াশি বছর? উলোশের বয়স কত হতে পারে?
মানুষের বয়স আমি কোনো দিনই আন্দাজ করতে পারি না। রহস্য সাহিত্যিক শেখ আবদুল হাকিমের বয়স ৭৮ যখন আন্দাজ করেছিলাম, শে. আ. হা-র বয়স ছিল তখন ৫৪। নাট্যাভিনেত্রী তাসনিয়া জান্নাতের বয়স যখন আন্দাজ করেছিলাম ২৭, নাট্যাভিনেত্রী তত দিনে ৪২ বছর, মতান্তরে ৪৩ বছর বয়স্ক মানবী। কেলেংকারি কাণ্ড। ধরে নিলাম উলোশের বয়স ৩৮। সেই উলোশ তিন শ ছিয়াশি বছর ধরে ফইরলগিরি করছে মংসিনের কটেজের? ক্যামনে কী?
ভব কটেজের সিঁড়িতে বসেছে। ঠাকুরের তরিকা মতো জয়েন্ট ম্যানুফ্যাকচার করতে লেগেছে। এখানে একটা কারেকশন আছে। আমি ভবর বাবা হলে ভবর নাম ক্যানাবিস রাখতাম। সে কি একটা ক্যানাবিস গাছ? সব সময় সেই পঞ্চপর্নী পাতাঅলা গাছের বিশুদ্ধ শুকনা ফুল থাকে তার জেবে। ঠাকুর এদিক ওদিক দেখছে হিংস্র ভঙ্গীতে—লোকেশন হান্টিং। আমি একটা তারা পড়তে দেখলাম। ঠাকুরকে এটা বললে ঠাকুর কারেকশন দিত, তারা না উল্কা পড়ে। তারা পড়লে পৃথিবী চ্যাপ্টা হয়ে যাবে।'
'পৃথিবী যদি চ্যাপ্টা হয়ে যায় অধ্যাপক লাইট হাউস কি চ্যাপ্টা হয়ে যাবেন? অধ্যাপক লাইট হাউসের টর্চ লাইট চ্যাপ্টা হয়ে যাবে? টু ডি?'
ম্যানুফ্যাকচারিং সমাপ্ত হয়েছে। জয়েন্ট হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো। ঠাকুর ধরাবে। ধরাল না। বদান্যতা দেখাল, 'ওরে উলোশ, তুই ধরা।'
তিন শ ছিয়াশি প্লাস বছর বয়স্ক একজন মানুষকে এরা তুইতোকারি করছে! ঠাকুর অবশ্য যখন যেখানে থাকে মনে করে সে লর্ড অব দ্য জাঙ্গল। এবং ইটস জাঙ্গল অল অ্যারাউন্ড।
শালপ্রাংশু উলোশ জয়েন্ট ধরাল। লম্বা এক টান দিয়ে ভবকে দিল, ভব টান দিয়ে আমাকে দিল, আমি টান দিয়ে ঠাকুরকে দিলাম—এভাবে চলল। ভব বলল, 'উলোশ, তুমি এখন আমাদের বলো সেই রাতে কী ঘটেছিল? তুমি একমাত্র আকাশ থেকে পাথর পাড়তে দেখেছো হিনজনকে?'
'পাথরের গাছও দেখিছি। ভব দাদা।'
ঠাকুর বলল, 'পাথরের গাছ!'
উলোশ বলল, 'পাথর ধরে। আকাশে ভেসে উঠছাল। সেই গাছ থেকে পাথর পাড়ছাল হিনজন। চাকতিঅলারা আলোর ফলা দিয়া সেই পাথর কাটি বসায় দিছাল। মংসিনের কটেজ বানাই দিছাল।'
ভব বলল, 'চাকতিঅলা?'
উলোশ বলল, 'মুই নিজ চোখে সেইটো দেখিছি।'
'চাকতিঅলারা কারা উলোশ?'
'চাকতিতি চড়ি তারা আসিত। আকাশ পাড়ের জঙ্গল থাকি আসিত। হিনজনের দেশ থাকি আসিত।'
'হিনজনের দেশ?'
'আকাশের পাড়ে।'
'চাকতিঅলারা আর আসে না উলোশ ভাই?' আমি বললাম।
'সিদিনের পর আর আসে নোই। উই যিদিন হিনজন উড়িল। মংসিন উড়িল।'
'উড়িল?'
'হয়। চাকতিঅলারা আলোর ফলা দিয়া উঠায় নিয়া গেল হিনজনকো, মংসিনকো। মানুষ জন যারা দেখিল তারা ভাবিল হিনজন উড়িল, মংসিন উড়িল।'
'আর তারা ফিরে নাই? হিনজন মংসিন?'
'ফিরিলে কি আমি থাকে?'
জয়েন্ট টেনে ঠাকুর সর্বদা ভাবলোকে অবস্থান করে, সেই লোক থেকে বলল, 'ভব।'
ভব বলল, 'বস।'
'এই জংলি কী বলে এসব? চাকতি কি? ইউএফওর কথা বলতেছে নাকি?'
আমি বললাম, 'এখন আর ইউএফও বলে না। ডোনাল্ড ডাক ট্রাম্পের নির্দেশে পেন্টাগন নথি প্রকাশ করছে, তারা বলতেছে ইউএপি। আনআইডেন্টিফায়েড অ্যানোমেলাস ফেনোমেনা। পরিচয়হীন অস্বাভাবিক বস্তু বা ঘটনা।'
ঠাকুর বলল, 'সেটা কি উড়ে না? অস্বাভাবিক হতেই পারে, পরিচয়হীন হতেই পারে। ওড়ে তো? ফ্লায়িং অবজেক্ট। তবে কি না মনে রাখতে হবে কোরবানির ঈদের হাট শুরু হয়ে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের বলদ হাটে উঠছে।'
আমি বললাম, 'এই দিকটাতে প্রথমত আলো পড়ে নাই।'
ভব হেসে দিয়ে গিলে নিল, 'উলোশ ভাই তুমি এরারে বুঝাও।'
উলোশ সেই কাহিনি শোনাল। মংসিন বারুদপোড়া কুয়ায় ডুবে মরেছিল। আলোর ফলা দিয়ে মাটি কেটে সেই কুয়া বানিয়ে দিয়েছিল চাকতিঅলারা। হিনজন পানি তুলে দিত, মংসিন গোসল করত। সেদিন কুয়ার দেয়ালে উঠেছিল মংসিন। ঝুপ করে পড়ে গিয়েছিল। বিপর্যস্ত হিনজন তখন যোগাযোগ করে তার আকাশ পাড়ের চাকতিঅলা বন্ধুদের সঙ্গে। তারা আসে। আলোর ফলা দিয়ে মংসিনকে উদ্ধার করে আকাশ পাড়ের জঙ্গলে নিয়ে যায়। হিনজনও যায় কারণ চাকতিঅলারা মৃত্যুর জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে মংসিনকে। সেটা হয়ে গেলে হিনজন আবার মংসিনকে নিয়ে এই পাহাড়ে ফিরবে।
ঠাকুর তার স্বতঃস্ফূর্ত বিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য দিল, 'সেটা তিন শ ছিয়াশি বছরেও হয় নাই।'
উলোশ বলল, 'সেইটো এই পৃথিবীর হিসাব, দাদা। তাদের হিসাবে এখনো তিন শতেক ছিয়াশি সেকেন্ডও হয় নোই, তারা নিয়ে গেল মংসিনকে।'
'অ! তাদের হিসাবে তবে কবে তারা ফিরিয়ে রেখে যাবে হিনজন মংসিনকে?' ঠাকুর বলল।
'হিনজন বলে গিছে চার ছয় দিনি।'
সত্যি অপদেবতা ছিল হিনজন? উলোশ কি মানুষ? তিন শ ছিয়াশি বছরের ধরে ফইরল কটেজের। তার বয়স আসলে কত? তিন শ ছিয়াশি বছরের গল্প কি বানোয়াট? কোনো প্রমাণ আছে?
উলোশ কিছু এনগ্রেভিং আমাদের দেখাল। কটেজের শ্যাওলা পড়া দেয়ালে কিছু চাকতি আর দুর্বোধ্য কিছু অক্ষর দেখলাম। উলোশ বলল, মংসিন এসব করেছে। হিনজন, চাকতি ও তার নিজের কথা লিখে রেখে গেছে।
ঠাকুর বলল, 'হিনজন মংসিনকে আমার লাগবে। স্ক্রিপটা সিনেমা ভেরিতে কনসেপ্টে ভাবতেছি।'
সিনেমা ভেরিতে। আমি মনে মনে ভাবলাম, সিনেমা দেরিতে। চাকতিঅলাদের চার ছয় দিন মানে পৃথিবীর দুই তিন হাজার বছরের হিসাব যদি হয়, ততদিন উলোশ না হয় থাকল, ঠাকুর থাকবে?
বারুদপোড়া কুয়া আমরা দেখেছি। উলোশের ভাষ্যমতো 'বাউদপোডা কূপ'। চাকতিঅলারা সেই কবে আলোর ফলা দিয়ে খুঁড়ে দিয়েছিল, কুয়া থেকে পোড়া বারুদের ঘ্রাণ এখনো যায় নাই। পরবর্তী ঘটনা গোপনীয়—জনহিতার্থে পেন্টাগন কখনো প্রকাশ করে দিতে পারে। সেটা তাদের মাথাব্যথা। আমাদের মাথা ব্যথা নাই, আমরা ভালোয় ভালোয় ঢাকায় ফিরেছি এবং গুগল আর্থে আমি সেই পাহাড়, সেই জঙ্গল বা মংসিনের কটেজের হদিস পাই নাই।
