ইচক দুয়েন্দে: স্মরণ-বিস্মরণ
'ভার্সিটিতে পড়াশুনো হলো শেষ। বিদায় বেলায় বললাম ওকে,
চলো গাছতলায় বসি
চোখে চোখ রেখে
দু'দণ্ড কথা বলি।
স্মৃতি থাক
একটু
রোমান্টিক।
সে ম্লান হেসে বলল, ওতে কী লাভ? আমাদের যে বিয়ে হবে না।
বললাম,
চলো, তোলা যাক
দু'একটা সেলফি
দেখাব কাউকে
বিষণ্ন মুহূর্তে
বলব, ভালবাসা এক যে ছিল আমার।
সে ম্লান হেসে বলল, ওতে কী লাভ? আমাদের যে বিয়ে হবে না।
বললাম,
চলো রেঁস্তোরায় বসি
চটপটি খাই
যা তোমার
একান্ত
প্রিয় খাবার।
সে ম্লান হেসে বলল, ওতে কী লাভ? আমাদের যে বিয়ে হবে না।
শেষে মরিয়া বললাম,
চলো ঝট করে দু'জনায়
চুমু খেয়ে ফেলি
থেকে যাবে এক শিহরণ জাগানো স্মৃতি
বলব সবে, সে এক দারুণ
ভালবাসা ছিল আমার।
সে ম্লান হেসে বলল, ছি: ওতে কী লাভ? আমাদের যে বিয়ে হবে না।
– আমাদের যে বিয়ে হবে না: ইচক দুয়েন্দে
ফরহানুর রহমান অপি: কিং অব পেঁচা।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: ক্রাউন প্রিন্স অব পেঁচা।
অসীম কুমার দাস: ফিলোসফার অব পেঁচা।
শামসুল কবির: লাইফ-লং প্রেসিডেন্ট অব পেঁচা।
এরকমই এক কাঠামো ছিল পেঁচা প্রকাশনার। সেখানে ছিলেন আরও কয়েকজন অনিয়মিত কর্মী। প্রকাশনাটির কার্যালয় ছিল রাজধানী ঢাকার ফকিরাপুলের গ্রিন লিফ হোটেলের দোতলায়, ১২৯ নং কক্ষে।
এরই মধ্যে সেই কার্যালয়ে দেখা দিলো আরও একটি নতুন মুখ। তার ডাক নাম টুকু। তাকে এখন তাহলে কোন পদ দেয়া যায়? পদও তো আর অবশিষ্ট নেই আপাতত। কিন্তু তাতে কী? আজীবন সভাপতির একমুহূর্তও লাগল না তার জন্যে নতুন একটি পদ সৃষ্টি করতে। টুকু নামটিকে উল্টে পদের নাম বের করে ফেললেন তিনি: উকুট অব পেঁচা।
যেকোনো পরিস্থিতিতে এমন স্বাভাবিকভাবে একটা জায়গায় পৌঁছে যেতে পারতেন শামসুল কবীর কচি ওরফে ইচক দুয়েন্দে। কাউকে হয়তো তা বিস্মিত করত, করত হতভম্ব, কিংবা তৈরি করত হাস্যরসের স্রোত। কিন্তু তিনি তা উপভোগ করতেন নরম নির্বিকার চোখে। বাংলা ভাষার সৃজনশীল এক লেখক তিনি। লেখার ফর্ম আর কনটেন্ট নিয়ে খেলায় মেতে থাকা ছিল তার যেন-বা সহজাত সহজিয়া স্বভাব। অনালোচিত সুদক্ষ প্রকাশকও। যেমন সুদক্ষ কৃষি খামার পরিচালনাকারী, ইংরেজি ভাষার অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক।
গত ১৬ মে তার মহাপ্রস্থান ঘটেছে ৬৬ বছর বয়সে। আমার এই জীবনে আমি এমন ক্রিয়েটিভ হিউমারাস মানুষ আর দ্বিতীয়টি পাইনি। এমন ক্রিয়েটিভ হিউমারাস মানুষের অস্তিত্ব অনুভব করা যায় কেবল বইয়ের পাতায়। যেমন শিব্রাম চক্রবর্তী। যেমন সৈয়দ মুজতবা আলী। পাইনি এমন ক্রিয়েটিভ অনুভূতিপ্রবণ অসীম কল্পনাশক্তির লেখক। এমন স্যুরিয়ালিস্টিক কল্পনাশক্তিসম্পন্ন লেখক আমরা দেখেছি ভিন দেশের সাহিত্যে। যেমন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। যেমন ফ্রানৎস কাফকা। যেমন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। তাঁর লেখা কারও ভালো লাগতে না পারে, কিন্তু একবার তাঁর নাম জানার পর তাঁকে আর উপেক্ষা করা সহজ নয়। আমি যে সময়ে বাস করেছি, ঠিক সেই সময়েই এমন একজন মানুষ বাস করেছেন; তাঁর সঙ্গে আবার আমার পরিচয়ও ঘটেছিল, কদাচিৎ আড্ডা দেয়ার সুযোগও হয়েছিল এবং মাঝেমধ্যে ফোনে কথাবার্তাও হতো–চিমটি কেটে বুঝে নিতে হয় সত্যিই আমিই সেই মানুষটি কি না।
দেখা হলে তিনি বলতেন, 'জনাব, কেমন আছেন?' গভীর, আন্তরিক সেই কণ্ঠস্বর। তাঁর কোনো তাড়া ছিল না, ধীরে ধীরে প্রস্তুত করেছিলেন নিজেকে। তাঁর সঙ্গে আমার আন্তরিকতার পর্বটি দীর্ঘ হতে পারত। কিন্তু হয়নি। তবে আমার বন্ধুদের অনেকেই কম-বেশি কাজ করেছেন 'পেঁচা' প্রকাশনীতে। কখনো তাঁর ফকিরাপুলের ডেরায়, কখনো তাঁর মালিবাগের ডেরায়। রাজশাহীর পাট চুকিয়ে ঢাকায় আসার পর অনিয়মিত কাজ করার এই বন্দোবস্ত রাজধানীর বেকার জীবনে নিঃসন্দেহে বড়ই মধুর ছিল। কিন্তু ভাগ্য আমার সঙ্গে বোধহয় পরিহাস করেছিল। ঢাকায় আসার মাত্র একদিন পরই মারুফ চিনু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে সেই যে সাংবাদিকতার টেবিলে বসলাম, সেখান থেকে আর ওঠা গেল না।
উনিশ শ আশির দশকে সে আমার এক বিশাল প্রাপ্তি–একদল তরুণ-তরুণীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে। দীপ্তিমান তারা সবাই। প্রাণোচ্ছল, সৃজনশীল, সংস্কৃতিবান। কেউ আমার বয়সে বড়, কেউ আবার ছোট; কিন্তু সব মিলিয়ে নদীর মুচড়ে মুচড়ে চলা স্রোতোধারার মতো। কচি ভাই–যিনি কালক্রমে পরিচিতি পেয়েছেন ইচক দুয়েন্দে নামে–তিনি ছিলেন তাদেরই একজন। ঠিক মনে নেই, তাঁর সঙ্গে প্রথম কবে পরিচয় ঘটেছিল কিংবা দেখা হয়েছিল; যেমন মনে নেই, শেষ দেখাই বা কবে হয়েছিল।
মিলনায়তনঘেঁষা পথের ধারের নিঃসঙ্গ একটা অর্জুনগাছ পেরিয়ে হলুদরঙা পানির পাম্পঘর ছাড়িয়ে খোলা প্রান্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল কিছু এলোমেলো ঢিবি। ছিল একটি পুকুর। আর ছিল এখানে ওখানে বাবলা গাছ, শিমুলগাছ; আম গাছ তো বটেই। আবুর ক্যান্টিন ছিল সেই পুকুরের ধারে। মিছিল-মিটিং আর ক্লাসের ফাঁকফোকরে আমরা প্রতিদিনই একবার না একবার সেই ক্যান্টিনে যেতাম। যেমন যেতাম মন্টুর দোকানে, যেটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের উল্টো দিকে কতবেলগাছের পাশে, যেটির আর অস্তিত্ব নেই এখন। ভারী স্যাঁতসেঁতে সেই দোকান। পেছনে মিলেমিশে ছিল মাজার ও কাঠের মিল। জানালা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়ত গাছের গুঁড়ি, কাঠের টুকরো, কাঠের মিহি গুঁড়ো।
রাজশাহীর দুপুরের ভাঁপে তা থেকে একটা বোবা গন্ধ ছড়াত। তাকে না যেত উপেক্ষা করা, না যেত আপন করে নেয়া। বর্ষার দিনেও অদ্ভুত একটা টক টক গন্ধ থাকত সেখানকার বাতাসের গায়ে। তিনটি মাত্র টেবিল পাতার মতো জায়গা ছিল মন্টুর দোকানে। কিন্তু তেঁতুলপাতায় তো কতজনই আঁটে। আমি নিশ্চিত ওখানেই প্রথম কথা হয় আমাদের। বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলাম না আমরা। কিন্তু তবু কখনো কখনো কথা হয়েছে হয়তো-বা রাজশাহীকে নিয়ে, হয়তো 'বৈশম্পায়ন' নিয়ে, হয়তো বিষ্ণু বিশ্বাসকে নিয়ে,–যে তখন পৈতৃক জমি বিক্রি করে দিয়েছিল 'পেঁচা' নামের লিটল ম্যাগ প্রকাশ করতে।
১৯৮৬ সালের শেষ দিকে তাঁরা দুজন রাজশাহী নিউমার্কেটের পেছনের কাঁচাবাজারে আজাহার রেস্টুরেন্টে বসে এই পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালে প্রথম খণ্ড এবং ১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের পর 'পেঁচা' আর ছাপা হয়নি। কিন্তু মরা হাতির দামও লক্ষ টাকা। কচি ভাই এ পত্রিকার এমন ব্র্যান্ডিং ভ্যালু তৈরি করেছেন যে, তা নিয়ে এখনো কথা হয়। এখন এই লেখা শুরুর আগে টুকুর সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় জোর গলায় জানাল সে, কখনো লাইব্রেরির দেয়ালের কার্নিশে বসে, কখনো বা জয়নালের ক্যান্টিনে বসে কচি ভাই আমাদের তাঁর লেখা 'সখাবাবা'র পাণ্ডুলিপি পাঠ করে শোনাতেন। লেখাবাহুল্য, 'সখাবাবা' লেখার ব্যাপ্তিকাল ১৯৮৪-১৯৯০ সাল।
আমার নিজের মনে আছে একটি দিনের কথা। ঝিমমারা দুপুর সেদিন। তখন কেবল 'বৈশম্পায়ন' ছাপা হয়েছে। রাশেদ উন নবী সম্পাদিত ওই লিটল ম্যাগে আমার একটু লেখার সুযোগ হয়েছিল। সম্পাদকের সঙ্গে কচি ভাইয়ের শিরোইলের বাসায় যাওয়ার সৌভাগ্যও হয়েছিল। তখনো মাহমুদুল হকের 'কালো বরফ' গ্রন্থাকারে বের হয়নি। সেই 'কালো বরফ' নিয়ে একটি লেখা। সেই ঝিমধরা দুপুরে মন্টুর দোকানে কাঠের গুঁড়োর ঘ্রাণ নিতে নিতে শুনলাম, কচি ভাই বলছেন, 'হাসান স্যারকে আপনার কথা বললাম–দেখেছেন স্যার, মাত্র দেড়-দুই লাইনে আপনাকে একেবারে ডেড হর্স বানিয়ে দিল!... শোনেন, আমার গল্পের বই বেরোলে আপনি কিন্তু সমালোচনা লিখবেন।'
পরে কচি ভাইয়ের একফর্মা 'সখাবাবা' বের হলো, কিন্তু আমি কল্কে পেলাম না। তত দিনে তিনি খ্যাতির গগনে গনগন করছেন। রাজধানীতে তাঁর বন্ধুবৃত্ত আরও বেড়েছে, বেড়েছে স্বজন; তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আর রসবোধ দিয়ে তাদের মধ্যমণি হয়ে উঠেছেন। ইউপিএল ছেড়ে নিজেই একটি প্রকাশনা সংস্থার কাজ শুরু করেছেন এবং আমাদের বেকার বন্ধুরা যার যখন সময়-সুযোগ হচ্ছে, সেটির ছাতার নিচে কাজ করছেন। যত না কাজ, তারও বেশি আড্ডা আরকি। বন্ধুদের সঙ্গে তাঁর সেই প্রথম কার্যালয় কাম বাসস্থান হোটেল গ্রিন লিফের ১২৯ নাম্বার কক্ষে যাওয়ার সুযোগ আমার বহুবার ঘটেছে; কিন্তু আমি ছিলাম তাঁর যাত্রীদলের অনেক অনেক পিছে–ঘটনাবহুল এই মানুষটির আড্ডা উপভোগ করা ছাড়া আমার বিশেষ কোনো ভূমিকা ছিল না।
বলা ভালো, তখনই তাঁর ইচক দুয়েন্দে হয়ে ওঠার সময়। জানি না, টুকুর নামটাকে উল্টোরথে ফেলে উটুক রাখতে রাখতেই ইচক নাম ধারণের চিন্তা তাঁর মাথায় এসেছিল কি না। কিন্তু দুয়েন্দে নাম নেয়াটা ছিল নিঃসন্দেহে লুই বুনুয়েল, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা আর সালভাদর দালি প্রীতির ফল। একটা প্রায় ছেঁড়া নিউজপ্রিন্টে এক রাশিয়ান সামরিক কর্মকর্তার পেপার কাটিং স্কচটেপ দিয়ে সেঁটে কিছু একটা লিখে হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে একদিন বিকেলে হোটেল গ্রিন লিফে তিনি বলেছিলেন আমাকে, 'ইমতিয়ার শামীম–আপনাকে তো ইশা বলা যায়...।'
তবে কখনো ডাকেননি ওই নামে। শুধু ইচক নয়, আরও বহু নামই ধারণ করেছেন তিনি। যেমন, 'মিশ্রীনার ইচক সারস রিবক এঞ্জেলো'। এই নামে তিনি একটি কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপিও তৈরি করেছিলেন। নামটি, অনুমান করি, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের সঙ্গে যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, তারই প্রভাবে ধারণ করা।
দুই.
তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল মুহম্মদ শামসুল কবীর, জন্ম নিয়েছিলেন ১৯৬০ সালের ১৪ ডিসেম্বর। এই কবীর বানানকে কখনো হ্রস-ইকারও দিয়েও হতে দেখেছি। সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন তাঁর বাবা ফয়েজ উদ্দিন সরকার। মা হাজেরা বেগম। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে তাঁকে তাঁর আরও তিন ভাই ও দুই বোনের সঙ্গে এ জেলা ও জেলায় কাটাতে হয়েছে বহুবার।
এদিক দিয়ে তাঁর ভাগ্য সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মতো। নানা জায়গায় থাকতে হয়েছে বলে বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যেমন, তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষজনের সঙ্গেও তিনি পরিচিত হয়েছেন। মূল বাড়ি আর জোতজমি ছিল রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার ব্রহ্মপুর গ্রামের, কিন্তু রাজশাহী শহরের শিরোইলে এই পরিবারটি থিতু হয় ১৯৭৫/৭৬ সালের দিকে। বাংলাদেশে নিউজপ্রিন্টে ছাপানো কলকাতার সব বেআইনি বই আর বাংলায় অনূদিত সোভিয়েত বই পড়তে পড়তে একসময় তিনি বাংলাদেশের বইপত্রেরও পাঠক হয়ে ওঠেন। সোভিয়েত গল্প-উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রের নামগুলোকে তাঁর মনে হতো বিদঘুটে। অনেক পরে তাঁর বিভিন্ন গল্পে বিভিন্ন চরিত্রের নামকরণে যে বৈচিত্র্য দেখি, তা নিঃসন্দেহে এই সোভিয়েত বইপত্র পড়ার প্রভাব।
রাজশাহীতে থিতু হওয়ার পর তাঁর নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে পড়ুয়া মানুষ পারভেজ ইমাম পলাশের সঙ্গে। সখ্য গড়ে ওঠে দুই ভাই–অধুনা স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর ও কবি এনায়েত কবিরের সঙ্গে। আজীবন ছিল তাঁদের এ সখ্য। একপর্যায়ে তাঁর অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে অবিসংবাদিত গল্পকার হাসান আজিজুল হকের সঙ্গেও। তিনিই কচি ভাইয়ের সঙ্গে সেতুবন্ধ রচনা করেন কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের। কলেজ জীবন থেকেই বই তৈরির ঝোঁক ছিল তাঁর। বন্ধু, কবি সরকার মাসুদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'বিষণ্ন জ্যোৎস্নার আঁকুতি' এবং অধুনা সুপ্রতিষ্ঠিত স্থপতি এনামুল কবির নির্ঝরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'চৌদ্দ গোষ্ঠীর উদ্ধার পর্ব' ও রকম সময়েই প্রকাশিত হয় তাঁর হাত দিয়ে।
২১/২২ বছর বয়সে, ১৯৮২ সালে তিনি এক দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ করেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ 'খোঁয়ারি'। ইলিয়াসের সাহিত্যজীবনকে অনুসরণকারীরা জানেন, এই দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থের প্রকাশ তাঁকে নতুন জীবন দিয়েছিল। ১৯৮৬ সালের পর 'পেঁচা'কে কেন্দ্র করে এবং 'পেঁচা'কে ছাপিয়ে বড় এক আড্ডার বৃত্ত গড়ে উঠেছিল রাজশাহী শহরে। যেটিতে আগে-পরে মিলিয়ে যুক্ত হয়েছিলেন কবি ও অধ্যাপক অসীম কুমার দাস, কবি মোহাম্মদ কামাল, কবি হাসানুল বান্না, কবি ও কথাসাহিত্যিক এনায়েত কবীর, কবি আরিফুল হক কুমার, অধ্যাপক মীর রবিউল ইসলাম, কবি ও চিকিৎসক মাসুম হাবিব, মামুন হুসাইন প্রমুখ।
তিন.
দেশজুড়ে তখন এক অন্যরকম সময়। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে চলছে আন্দোলন। সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে জীবন দিচ্ছেন আমাদের সহযাত্রীরা, আমাদের বন্ধু-স্বজনরা। শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনে নয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকেও উঠে আসছে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। রাজশাহীতে 'পেঁচা' আর শামসুল কবীর কচিকে কেন্দ্র করে যে সাহিত্যিক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল তাতে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক কবি অসীম কুমার দাশ, বিষ্ণু বিশ্বাস, ফয়জুল ইসলাম, রাশেদ উন নবী–এরা। এর কিছু আগে বেরিয়েছিল আরও একটি শক্তিশালী লিটল ম্যাগাজিন 'কথা'–যেটির সম্পাদনায় ছিলেন নূরুল কবির। আরও ছিল কবি ও কবিতার সংগঠন ও পত্রিকা 'শব্দায়ন'।
আন্দোলনমুখর অমন সময়ে 'পেঁচাকে' আমাদের মতো অনেকে এলিট লিটল ম্যাগই মনে করত। আমরা এই ম্যাগাজিনের মুখোমুখি নিয়ে এসেছিলাম 'তর্জনী'কে,–যেটির সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন মামুন হুসাইন, মহীবুল আজিজ, দীপক রঞ্জন চৌধুরী, রাজা হাসান, স্বদেশ বন্ধু সরকার, পিন্টু ভৌমিক, শাওন সৈয়দ (রেজাউল করিম) প্রমুখ। বিপুল সম্ভাবনা নিয়েও এই ম্যাগাজিন মাত্র তিনটি সংখ্যা ছাপার পরপরই হারিয়ে যায় অন্ধকারে। 'পেঁচা' বৃত্তের রাশেদ উন নবী পরে সম্পাদনা করেন 'বৈশম্পায়ন'। আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পর্বে এটির একটিমাত্র সংখ্যা বেরিয়েছিল, রাজধানী পর্বে আরও দুটি সংখ্যা বেরোনোর পর এটির প্রকাশনাও থমকে যায়।
নানা ডামাডোলের মধ্যে কচি ভাইয়ের রাজধানীর জীবন শুরু হয় ১৯৮৮ সালের মে-জুন মাসের দিকে, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডে সম্পাদনা বিভাগে যুক্ত হওয়ার মধ্যে দিয়ে। তাঁকে ইউপিএলে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে সম্পাদক হিসেবে কর্মরত, লিটল ম্যাগ 'নিরন্তর' সম্পাদক নাঈম হাসান। ইউপিএলে তখন বইপত্র প্যাক করার জন্যে যে এ-ফোর সাইজের খামটি ব্যবহার করা হতো, সেটির বাঁ দিকে দীর্ঘ একটি উদ্ধৃতি মুদ্রিত ছিল। যার অর্থ পুরোপুরি ভাবার আগেই কেন যেন খেই হারিয়ে ফেলতাম। উদ্ধৃতিটি কেন মুদ্রণ করা হতো, তা আজও জানি না। তবে খামটির কথা এখনো মনে পড়ে। এখানে কাজ করতে করতেই তাঁর মধ্যে বোধকরি 'পেঁচা' লিটল ম্যাগকে প্রকাশনা হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা দানা বাঁধে। তাঁর সে চিন্তার সঙ্গে আরও যুক্ত হন আবৃত্তিশিল্পী ফরহানুর রহমান অপি, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, ফয়জুল ইসলাম প্রমুখ। পরে তিনি মালিবাগে যাওয়ার পর পেঁচার পাশাপাশি 'লংম্যান' নামে একটি ইংরেজি প্রকাশনীর কাজও শুরু করেন। এসবের পাশাপাশি তিনি ব্র্যাকের বিভিন্ন প্রকাশনাকর্মেও যুক্ত ছিলেন।
কচি ভাইয়ের স্যাটায়ার, হিউমার ও কনভিন্স করার ক্ষমতা ঈর্ষণীয়। স্যাটায়ার ও হিউমার করতে করতে চরম বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পরও তিনি তাঁর ক্ষুব্ধ প্রতিপক্ষকে যেন-বা অদ্ভুত কালো জাদুদণ্ড খুব ঠান্ডা মাথায় নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতেন, বাধ্য করতেন হেসে ফেলতে। হোটেল গ্রিন লিফে কচি ভাইয়ের রুমটিতে একবার তার এক কবি বন্ধু সামান্য অসুস্থ হয়ে ঠাঁই নিয়েছিলেন। তাকে তিনি যেভাবে বিদায় করেছিলেন, তা মনে পড়লে এখনো হেসে ফেলি। কয়েক দিন পেরোনোর পর বিছানা শেয়ার করতে করতে ক্লান্ত কচি ভাই একদিন তাকে এক গ্লাস দুধ খাওয়ানোর পর বলেছিলেন, 'জনাব, আপনার এখন কেমন লাগছে?'
'ভালো–ভালো লাগছে।'
'হাঁটতে পারবেন? ... দেখি, হাঁটতে পারেন কি না।' বলে তাঁকে হাঁটাতে হাঁটাতে রুমের বাইরে নিয়ে গেলেন তিনি। তার পর আবারও বললেন, '... ভালো লাগছে?' কবি তাতে সায় দিলেন। আর কচি ভাই রুমের ভেতর গিয়ে তার ব্যাগটা এনে করিডোরে রেখে বললেন, 'তা হলে আপনি এখন প্রস্থান করুন, জনাব।' বলে নির্বিকারভাবে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় পেঁচা প্রকাশনা প্রথম স্টল দিয়েছিল ১৯৯২ সালে। স্টলের নকশা করেছিলেন শিল্পী আমানউল্লাহ্ আর অধুনা ভাস্কর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক নাসিমা হক মিতু। কচি ভাইয়ের ডিক্রি অনুযায়ী ফয়জুল ইসলাম সুমন 'পেঁচা'র একজন অংশীদার হলেও তাকে কখনো এই স্টলে আসতে দেখিনি। কারণ, পেঁচার জন্যে ১৯৯১ সালে রোকেয়া হল বার্ষিকীর মুদ্রণকাজ এনে দিয়ে সুমন একজন পাকাপোক্ত শেয়ারার হওয়ার পরও বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিলেন।
এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করলেই তিনি গাঁক–গাঁক করে উঠতেন, 'তুমি আমার কাছে এ ব্যাপার কখনো তুলবা না। ...আমার পারসোনাল লাইফটা ডুম করে দিয়েছে!' সুমন ভাই স্টলে না এলেও কচি ভাই নিয়মিতই আসতেন অদ্ভুতভাবে চুল-গোঁফ বিন্যস্ত করে। কী অদ্ভূত ঘটনা! তা দেখতে দেখতে 'পেঁচা'তেই কর্মরত তরুণ এক কবি এক বিকেলে স্টলে এলেন নিজের চুল-গোঁফকে ইচকের ছাঁচে ছেঁটে। কচি ভাই বিরক্ত হলেও তাঁর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন নরম চোখে। তার পর মিষ্টি কণ্ঠে বললেন, 'জনাব, এ আপনি কী করেছেন? আপনার মুখের অবস্থা এমন কেন?'
প্রকাশনার কর্ণধার বিষয়টিকে সহজভাবে নিয়েছেন মনে করে তরুণ কবিও হাসতে হাসতে জানালেন, 'আমি পেঁচা হয়েছি।'
'পেঁচা হয়েছেন?...বেশ করেছেন। এবার তাহলে আপনি উড়াল দিতে পারেন।'–অতিশয় নিস্পৃহ কণ্ঠে এ কথা বলে ইচক দুয়েন্দে তাকে স্টলের বাইরের প্রাঙ্গণ দেখালেন। মানে তাকে চাকরিচ্যুত করা হলো আরকি।
পরে একসময় নিজেই ঢাকা ছাড়লেন ইচক। কবে, জানি না। বিষ্ণু বিশ্বাস ঢাকা ত্যাগ বা নিরুদ্দেশ হওয়ার সময় যতটুকু সংশ্লিষ্টতা ছিল ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে, কচি ভাইয়ের তেমন একটুও ছিল না। অনেক পরে শুনলাম, রাজশাহী গিয়ে তিনি অভিনব উপায়ে ইংরেজি শিক্ষা দিতে শুরু করেছেন। ছাত্রছাত্রীদের তিনি পড়াতেন নোবেল প্রাইজপ্রাপ্ত গল্প-উপন্যাস; আর কৃষি খামার প্রকল্প গড়ে তুলেছিলেন নিজের গ্রাম ব্রহ্মপুরে।
ফয়জুল ইসলাম সুমনের মৃত্যুর পর গত ২০২৫ সালে যখন আমাদের আরেক বন্ধু সাহিদুল আলম টুকু কানাডা থেকে দেশে এলেন, তখন কচি ভাইয়ের ঐকান্তিক আগ্রহে তিনি সেই কৃষি খামার দেখতে গিয়েছিলেন। কচি ভাইয়ের ঢাকা ত্যাগের একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, অন্য এক বন্ধুর সূত্রে শুনেছি, বয়সী বাবার সঙ্গে থাকা। মা মারা গিয়েছিলেন তাঁর ছাত্রাবস্থাতেই–১৯৮২ সালে। ভাইবোনদের মধ্যে একমাত্র তিনিই তখন গা-হাত পা ঝাড়া, পেশায়ও স্বাধীন। অতএব রাজশাহী ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। প্রসঙ্গত, মনে পড়ছে কচি ভাইয়ের ভীষণ সখ্য ছিল তার ছোট বোন রওনক সুলতানা জ্যোতির সঙ্গে। তিনি পড়তেন অর্থনীতিতে। প্রায়ই কচি ভাইকে দেখা যেত, দুপুরবেলা বোনের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে করতে ভার্সিটির বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছেন জারুলের পথ দিয়ে, তাঁকে বাসে তুলে দিতে।
নিজের শৈশব, শিক্ষা ও ছোট বোনের সঙ্গে সখ্য নিয়ে তাঁর একটি আবেগময় স্মৃতিগদ্যও আছে। তাঁর পাঠকদের বলব, সেটি সম্ভব হলে পড়ে দেখতে। সাহিদুল আলম টুকু রাজশাহী থেকে ফিরে জানিয়েছিল আমাকে–বাবার মৃত্যুর পর অনেক আগে থেকেই কচি ভাই তাঁদের শিরোইলের পৈতৃক বাসা 'শারিক স্মৃতি'তে রাতে থাকা বন্ধ করে দিয়েছেন। আর 'শারিক স্মৃতি'ও অচিরেই ভেঙে ফেলা হচ্ছে–অ্যাপার্টমেন্ট হবে।
ব্রহ্মপুরে একটি একতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন, বইপত্র সেখানেই চালান করছেন কচি ভাই। টুকু যে তিন দিন-রাত্রি রাজশাহীতে ছিল, তারা দুজনই ছিলেন 'শারিক স্মৃতি'তে। অনেক অনেক দিন পর টুকুর সুবাদে আবারও তাঁর তিনটি রাত কেটেছিল 'শারিক স্মৃতি'তে। যত দূর জানি, সেটিই কচি ভাইয়ের তাদের পুরানো বাসায় শেষ রাত্রি যাপন।
চার.
অনেক চরিত্র ভিড় করেছিল ইচক দুয়েন্দের অশরীরে। সেখানে বাস করত মানিক বন্দোপাধ্যায়ের হোসেন মিয়া, তার ছিল নতুন এক পত্তনের স্বপ্ন। ছিল বুনুয়েল, লোরকা ও দালির সুরিয়ালিজম। ছিল গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ম্যাজিক রিয়ালিজম। ছিল জেমস জয়েস কিংবা আর কে নারায়ণের কল্পনার বসতি। এইসব মিলেমিশে যে চেতনসেতু গড়ে উঠেছিল তার একটি দর্শনসত্বাও তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর তারুণ্যের বন্ধু পারভেজ ইমাম পলাশের সান্নিধ্যে। পলাশ ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের কৃতি ছাত্র; এ দেশে দর্শনচর্চার ক্ষেত্রে যিনি নতুন এক সম্ভাবনাকে স্পষ্ট করে তুলছিলেন। যদিও মৃত্যু এসে কেড়ে নিয়ে গেছে তাঁকে। দুয়েন্দে নাম ধারণ করেছিলেন কচি, বোধ করি তার ঐতিহ্যিক অনুসন্ধানপ্রীতির কারণেই।
রাজশাহী ফিরে গেলেও ইচক যে বৃত্তের পরিধিতে ছিলেন রাজধানীতে, যে বৃত্ত তৈরি করেছিলেন, তার সঙ্গে সম্পর্কচ্যুত হননি। লিখতেন কম–তা সে তো শুরু থেকেই। একটি লেখাকে কেন্দ্র করে যে ঘোর তৈরি হয়, সেই ঘোরের মধ্যে ঘুরপাক খেতে তিনি খুবই ভালোবাসতেন। নিষ্কৃতি চাইতেন না। তবে লিখতে যে খুব বেশি সময় নিতেন, সে রকম নয়।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়েও শেষ হচ্ছিল না সামরিক শাসনের কারণে। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে থাকতেই আমরা জানলাম, কচি ভাইয়ের এক ফর্মার গল্পের বই বেরিয়েছে। নাম 'সখাবাবা'। রচনাকাল: ১৯৮৪–১৯৯০। রাজশাহী থেকেই বইটি মুদ্রিত হয় ১৯৯০-এর ১৬ আগস্ট। এটি তিনি লিখেছিলেন শুধু 'কবির' নামে।
তাঁর এই 'সখাবাবা' পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত 'সখা' থেকে আলাদা নয়। ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত লেখা তাঁর সাতটি গল্প নিয়ে ২০০৪ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত হয়েছিল আরেকটি গল্পের বই 'কচি সমগ্র'। এতে যে সব গল্প রয়েছে, সেগুলো হলো–'যুদ্ধযাত্রা', 'ঘুম ভাঙলো', 'শুভ্র, নদীর সুদূর পারে', 'সখা', 'রমানাথ', 'ধূলিযুদ্ধ' এবং 'মওলানা নাভাসি'।
মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁর যে নিবিড় মমত্ব, তার সাক্ষর এ বইয়ের প্রথম দুটি গল্প। ১৯৮৮ সালে লেখা 'ধূলিযুদ্ধ' গল্পটিতে এসে দেখা যাবে, তাঁর গল্পের ফর্ম আর কনটেন্ট পাল্টে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে এই ফর্ম আর কনটেন্টই হয়ে উঠেছিল তাঁর লেখালেখির মূল সত্তা। কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত 'বাংলাদেশের পাঁচ দশকের গল্প' সংকলনের জন্যে বেছে নেয়া হয়েছিল তাঁর এই গল্পটিকেই। ওই সময় বেশ কয়েকবার ফোনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। সংকলনের জন্য পাঠানোর আগে গল্পটি আবারও সম্পাদনা করেছিলেন তিনি। সে হিসেবে ওই সংকলনে প্রকাশিত 'ধূলিযুদ্ধ'ই গল্পটির চূড়ান্ত রূপ।
ইচক দুয়েন্দের বড় গল্প 'লালঘর'–একটি আলোচিত গল্প, সেটি প্রথম ছাপা হয়েছিল বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোরের আর্টস বিভাগে। বিভাগটি তখন দেখভাল করতেন ব্রাত্য রাইসু। ২০০৮ সালের ১৫ মে গল্পটি আপলোড হয় সেখানে। ওটি লেখা হয়েছিল ২০০৭ সালের মার্চ-এপ্রিল দু'মাসের মধ্যে। সে হিসেবে ছাপার মুখ দেখতে গল্পটিকে অপেক্ষা করতে হয় এক বছরেরও বেশি সময়।
বই আকারে এটি প্রকাশনার মুখ দেখে ২০০৯ সালে–বাংলায়ন থেকে প্রকাশিত হয় এ গ্রন্থের প্রথম মুদ্রিত সংস্করণ। 'ধূলিযুদ্ধ' নামের গল্পের বইটি লেখার সময় থেকে কচি ভাইয়ের গদ্য যে আদল পাচ্ছিল, 'লালঘর'কে বলা চলে তারই পরিণত পর্যায়। পৃথিবীটিকে, পৃথিবীর একেকটি রাষ্ট্রকে তিনি এ গল্পে দেখেছেন মূর্তিমান কারাগাররূপে। চিন্তাশীল ১৩ জন মানুষের মাত্র এক দিনের কারাবাসের মধ্যে দিয়ে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এই ব্যবস্থাকে–যা কিনা আধুনিক প্রতিটি রাষ্ট্রের অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। তবে কেবল কারাগারকেই তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন–এমন মনে করলে ভুলই হবে।
কেননা কারাগারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে প্রকারান্তরে তিনি ওই চিন্তাশীল মানুষদের নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন–কারাগারে যাওয়ার আগপর্যন্ত যাদের চিন্তার পরিধিতে এই প্রতিষ্ঠানটির ভয়াবহতা সম্পর্কে কোনো প্রশ্নই জাগেনি। এমনকি তারা যখন কারাগারে, তখনো তারা কখনো কখনো এমন সব কথাবার্তা বলে, যা থেকে বোঝা যায়, তারা কারাগারের বাইরে থাকার সময়েও কী ভীষণ জনবিচ্ছিন্ন ছিলেন। কারাগারে যাওয়ার ফলে তাদের সেই প্রাত্যহিক গণবিচ্ছিন্ন জীবনে ছন্দপতন ঘটে, তারা মুখোমুখি হন সাধারণ মানুষের জীবন-বাস্তবতার। অসচরাচর কিন্তু খুবই আস্থার সঙ্গে স্যাটায়ার করেন তিনি তাঁর এই লেখাতে–যেমনটি করতেন অনেকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে।
নিজের মতো করে একটি জগৎ গড়ে নেন তিনি, গড়ে নেন অবাস্তব স্থান ও বলয়, কথা বলার ভঙ্গিমা, এমনকি তাদের নামগুলোও তুমুল কল্পনাপীড়িত। কিন্তু তার পরও তারা একসময় বড় বেশি বাস্তব হয়ে ওঠে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই গল্পে তিনি তাঁর রাষ্ট্র, সমাজ ও জীবন দর্শনকেও উচ্চকিত করে তুলেছেন। যারা কাফকার সাহিত্যকে জানেন, আর কে নারায়ণের সাহিত্যকে জানে, হুয়ান রুলফোর আস্বাদ পেয়েছেন, তাদের কাছে এই গল্পে প্রবহমান দর্শন ও চিত্রকল্প নির্মাণ হয়তো ততো নতুন মনে হবে না; কিন্তু আমাদের সাহিত্যের পরিবৃত্তে এমন প্রকাশভঙ্গিমায় এই দর্শনের স্ফূরণ ও ভাষা-নিরীক্ষণ নিঃসন্দেহে নতুন ও অভিনব। বলা প্রয়োজন ব্রাত্য রাইসু সম্পাদিত আর্টসে প্রকাশিত 'লালঘরে'র সঙ্গে এর গ্রন্থাগারে মুদ্রিত সংস্করণের কোথাও কোথাও দূরত্ব রয়েছে; যা নিঃসন্দেহে গ্রন্থটিকে পরিশীলিত করে তুলেছে।
ইচক দুয়েন্দের সর্বশেষ গ্রন্থ তাঁর অপরূপকথা 'টিয়াদুর'। তাঁর যে স্বপ্নাচ্ছন্নতা, অসীম কল্পনার ক্ষমতা, জীবনকে সৌন্দর্যময় করে তোলার আকুলতা–সেসবের চূড়ান্ত পরিণতি এই বই। এখানে তিনি বোবাডুম নামের চরিত্রে ভর করে গড়ে তোলেন এমন এক দেশ, যেখানে যুদ্ধের কোনো স্থান নেই, যেখানে যুদ্ধ নিজেই উঁকি দিতে ভয় পায়। কিন্তু যুদ্ধকেই বড় করে দেখে এমন শক্তিও তো আছে পৃথিবীতে। সেই পরাশক্তির উত্থান দেশছাড়া করে বোবাডুমকে। তার শেষ আশ্রয় হয় নিবিড় অরণ্য, কিন্তু তিনি হাল ছাড়েন না–একাগ্রচিত্তে ধ্যানস্থ হন নতুনের সাধনে। তার সেই ধ্যানের সাধন হয়ে ওঠে টিয়াদুর। যে টিয়াদুর তার বিশাল ডানার আড়ালে ছায়া দেয় পরীর মেলার সব মৃত মানুষদের। ইচ্ছেপুর নামে এক পরম প্রশান্তিময় নতুন দেশের গল্প শোনায় সে দেয়ালে সাজানো পুতুলদের।
'লালঘরের' মতো এ বইয়ের চরিত্রেও রয়েছে অভিনবত্ব এবং নিঃসন্দেহে তা আরও বিস্তৃত। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের যেমন মাকান্দো, আর কে নারায়ণের যেমন মালগুডি, জেমস জয়েসের যেমন ডাবলিন, তেমনি ইচক দুয়েন্দের এই কাহিনীতেও পত্তন ঘটেছে স্বপ্নাচ্ছন্ন 'ইচ্ছেপুরে'র।
এসবের বাইরেও ইচক দুয়েন্দে লিখেছেন বইকি। তাঁর 'খুচরো রচনা' তেমন এক সম্ভার। খসড়া এ পাণ্ডুলিপি এখনো মুদ্রণের মুখ দেখেনি, কিন্তু পড়ার ভাগ্য হয়েছে হয়তো অনেকেরই। নিজের জীবনের এক-আধ ভগ্নাংশ মাত্র তুলে ধরেছেন তিনি এ পাণ্ডুলিপিতে। পাণ্ডুলিপিভুক্ত রচনাগুলোর নাম যথাক্রমে–'স্মৃতিতে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ', 'টু চেইজ আ মিরাকল', 'খোঁয়ারি প্রকাশ আখ্যান', 'পারভেজ ইমাম পলাশ স্মরণে' এবং 'শাহবাগ মন উদ্বাগ'।
শেষের লেখাটিতে কবিতার ছন্দে ধরা দিয়েছে তাঁর দেখা শাহবাগ–যেখানে তিনি একদা আড্ডা দিতেন। কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ ও তাঁর পরিবারকে তিনি তুলে ধরেছেন পরম দরদ ও মুগ্ধতা দিয়ে। লেখাটি শেষ হয়ে গেছে হঠাৎ করে; কিন্তু সেই হঠাৎ শেষ হওয়াই যেন লেখাটিকে অপার্থিব সৌন্দর্যময় করে তুলেছেন। 'খোঁয়ারি প্রকাশ আখ্যান' নামের গদ্যে তিনি কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'খোয়ারি' প্রকাশের পূর্বাপর তুলে ধরতে গিয়ে স্বগত স্বরে প্রশ্ন তুলেছেন, 'সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র চরিত্রগুলো কি বাঙালি মুসলমান? না, চিরন্তন মানুষ? ইলিয়াসের চরিত্রগুলো কি বাঙালি মুসলমান? না, ভূমি ও কালের সন্তান?' এই প্রশ্নের উত্তর আমরা কে কী খুঁজে পাব, খুঁজে নেব–তার ওপরেও বোধ করি নির্ভর করছে আমাদের সাহিত্যের দূরযাত্রা। 'টু চেইজ আ মিরাক্ল' তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্য ইউপিএলের প্রকাশক মহিউদ্দিন আহমেদের প্রতি। একটি বই প্রকাশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইচক দুয়েন্দে আমাদের যা জানান, তা আমাদের নতুন এক মহিউদ্দিন আহমেদকে চেনায়। তিনি লিখেছেন,
'আমার পক্ষে বরখাস্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কেন হই নাই তার ব্যাখ্যা বোধ করি দেবার দরকার নেই।
যত দূর জানি, জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ তাঁর সমগ্র প্রকাশনা জীবনে এত মারাত্মক ভুলসহ কোনো বই প্রকাশ করেননি।
আমার জীবনেও এমন অভিজ্ঞতা দ্বিতীয়টি নেই।'
শুনেছি, কয়েক বছর ধরে কচি ভাই কিটো চিকিৎসাপদ্ধতির অনুসারী হয়ে উঠেছিলেন। জানি না, এতে তার চিত্ত প্রসন্ন হয়েছিল কি না। তবে আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেল। আড্ডা দিতে দিতে তিনি প্রায়ই কণ্ঠ ও সুরনিরপেক্ষ গলায় রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে উঠতেন। রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া হয়ে উঠেছিল তাঁর সহজাত এক স্বভাব। এভাবে তাঁর নিজের মুক্তির সাধনে যেন আমরাও যুক্ত হয়ে যেতাম। দীর্ঘশ্বাস এই, তেমনটি আর কখনো ঘটবে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসের এক চরিত্র নিখিলেশ বলেছিল, '...জীবনটাকে কেঁদে ভাসিয়ে দেওয়ার চেয়ে হেসে উড়িয়ে দেওয়াই ভালো।' কচি ভাই সেই কাজটিই করেছেন। জীবনটাকে তিনি হেসে হেসে উড়িয়ে দিলেন।
কচি ভাইকে নিয়ে বলতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে। ইতি টানার আগে আরও একটি ঘটনা মনে করি। আমাদের আর এক বন্ধু ফয়জুল ইসলাম সুমনের মৃত্যুর পর ঢাকায় এক স্মরণসভা হলো। সাহিদুল আলম টুকুর কাছে শুনেছি, ব্রহ্মপুরে যেতে যেতে কচি ভাই তাকে বলেছিলেন, 'সুমনের স্মরণসভা করলেন ... যদি আমারও একটা স্মরণসভা করতেন, শুনে যেতে পারতাম, কে কী বলেন!'
কচি ভাইয়ের পক্ষেই সম্ভব এমন বলা!
তবে কচি ভাই, শুনতে পান বা না পান–স্মরণসভা হোক বা না হোক, জেনে রাখুন, আপনাকে কিন্তু আমরা সকলেই মনে করছি। আপনি আছেন, স্মরণে-বিস্মরণে, আমাদের সঙ্গে।
