এআই প্রযুক্তি ব্যাপক গতি আনছে চীনের নতুন অস্ত্র তৈরিতে, বলছেন বিজ্ঞানীরা
বিশ্বজুড়ে সামরিকখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহার মূলত স্বচালিত অস্ত্র এবং লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (এলএলএম) মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বেইজিং পর্দার আড়ালে নীরব এক রূপান্তর ঘটিয়ে চলেছে; দেশটি শিল্প উৎপাদনের (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানুফ্যাকচারিং) একদম গভীরতম স্তরে এআই প্রযুক্তিকে যুক্ত করছে।
গত মাসে চীনের প্রতিরক্ষা প্রকৌশলবিষয়ক সাময়িকী 'অ্যাক্টা আর্টামেন্টারি'-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বর্ণনা করা হয়েছে যে, কীভাবে গবেষকেরা এআই-চালিত একটি 'বেয়ারিং ডিজাইন এজেন্ট' তৈরি করেছেন—যা উন্নত যন্ত্রপাতির 'রোলিং বেয়ারিং' (ঘূর্ণনশীল যন্ত্রাংশ) স্বয়ংক্রিয়ভাবে নকশা করতে সক্ষম।
এই সাময়িকীটি দীর্ঘদিন ধরে চীনের অস্ত্র শিল্পের একটি শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে আসছে। এতে মহাকাশ বা অ্যারোস্পেস, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, সামরিক বর্ম (আর্মার), গাইডেন্স সিস্টেম এবং সামরিক উৎপাদনের মতো প্রযুক্তি নিয়ে নিয়মিত নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়।
'লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের রিজনিং অ্যান্ড অ্যাক্টিং ধারণার ওপর ভিত্তি করে রোলিং বেয়ারিং ডিজাইন এজেন্টের ওপর সমীক্ষা' শীর্ষক এই গবেষণা পত্রে 'চ্যাটবেয়ারিং' নামের একটি এআই ব্যবস্থার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের সঙ্গে প্রকৌশলগত হিসাব-নিকাশের টুল এবং শিল্পক্ষেত্রের ডেটাবেজের সমন্বয় ঘটিয়েছে।
চংকিং ইউনিভার্সিটির 'স্টেট কি ল্যাবরেটরি অফ মেকানিক্যাল ট্রান্সমিশন ফর অ্যাডভান্সড ইকুইপমেন্ট'-এর গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নকশার প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ, লোড বা ওজন বহন ক্ষমতা গণনা, বেয়ারিং নির্বাচন, স্থায়িত্বের পূর্বাভাস, শক্তি যাচাই করে স্বয়ংক্রিয় রিপোর্ট তৈরি করতে পারে।
প্রথাগত বেয়ারিং ডিজাইনের বিষয়টি বহুলাংশে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী, দীর্ঘমেয়াদি ট্রায়াল-অ্যান্ড-এরর (ভুলত্রুটি সংশোধন) প্রক্রিয়া এবং উচ্চ তাপমাত্রা, ভারী লোড ও উচ্চ ঘূর্ণন গতিসহ চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে। এআই এসব ঝক্কি দূর করাতেই গতি বেড়েছে সমরাস্ত্র উৎপাদন কাজে।
গবেষণাদলটি উল্লেখ করেছে, চ্যাটবেয়ারিং সিস্টেমটি 'হেলিকপ্টারের টেইল রোটর গিয়ারবক্স, উইন্ড টারবাইন গিয়ারবক্স এবং বৈদ্যুতিক যানের (ইভি) ড্রাইভট্রেন'-এর ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে।
সনাতন বা প্রচলিত মানবচালিত পদ্ধতির তুলনায়, "চ্যাটবেয়ারিং নকশা তৈরির সময়কে দুই থেকে তিন ঘণ্টা থেকে কমিয়ে মাত্র তিন মিনিটেরও নিচে নিয়ে এসেছে। একই সাথে এটি বেয়ারিংয়ের মোট ওজন ৪ শতাংশের বেশি কমিয়ে আনতে পেরেছে।"
বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে চীনের একজন অস্ত্রবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জানান, এই গবেষণার গুরুত্ব কেবল বেয়ারিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর চেয়েও অনেক দূর বিস্তৃত।
তিনি বলেন, "নকশা তৈরির দক্ষতা এবং অপ্টিমাইজেশনের (উৎকর্ষ সাধন) এই কার্যকারিতা সত্যিই দারুণ। এটি অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের গবেষণা ও উন্নয়নকে 'ডিজিটালাইজেশন' (ডিজিটাল রূপান্তর) থেকে 'ইন্টেলিজেন্স' (বুদ্ধিমত্তা বা স্বয়ংক্রিয় বুদ্ধিমত্তার রূপান্তর) পর্যায়ে উন্নীত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।"
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিরক্ষাখাতে এআই-এর ব্যবহার সংক্রান্ত আলোচনাগুলো মূলত যুদ্ধক্ষেত্রের অ্যাপ্লিকেশনের ওপরই কেন্দ্রীভূত। যেমন—স্বত্তশাসিত ড্রোন, এআই-সহায়তাধীন কমান্ড সিস্টেম, সেন্সর ফিউশন এবং সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্ল্যাটফর্ম। প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিসের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলো অপারেশনাল বা যুদ্ধক্ষেত্র-সংক্রান্ত এআই-এর প্রতি পেন্টাগনের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে, চীন এর সমান্তরালে একটি 'বটম-আপ' (তৃণমূল থেকে ঊর্ধ্বমুখী) কৌশল তৈরি করছে, যা মূলত "এআই প্লাস ম্যানুফ্যাকচারিং"-এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা এআই-কে ব্যবহার করছে শিল্প প্রকৌশল, উৎপাদন দক্ষতা এবং হার্ডওয়্যার উন্নয়নের ভিত্তি মজবুত করতে।
এই পার্থক্যের গুরুত্ব অনেক গভীর, কারণ সামরিক শক্তি শেষ পর্যন্ত কেবল উন্নত অস্ত্রের ওপরই নির্ভর করে না, বরং বড় পরিসরে সেগুলোর নকশা তৈরি, উৎপাদন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা সচল রাখার সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে।
ইতোমধ্যেই চীনের কাছে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন ভিত্তি (ম্যানুফ্যাকচারিং বেস), শিল্পখাতের বিস্তৃত সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) এবং প্রকৌশল প্রতিভার এক বিশাল ভান্ডার।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতিটি আধুনিক প্রতিরক্ষা উৎপাদনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বেশ কয়েকটি খাতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছে, যার মধ্যে রয়েছে— ড্রোন, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক মোটর, প্রিসিশন মেশিনিং (নিখুঁত যন্ত্রাংশ তৈরি), বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবোটিক্স।
এআই প্রযুক্তি প্রোটোটাইপ বা পরীক্ষামূলক মডেলের উন্নয়নকে বেগবান করে, প্রকৌশলগত খরচ কমায়, সিমুলেশন দক্ষতা বাড়ায় এবং দ্রুততর নকশা পরিবর্তনের সুযোগ করে দিয়ে— চীনের এই শিল্প সক্ষমতাগুলোকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও গোপন সক্ষমতা
ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে সামরিক পরিকল্পনাবিদদের একটি শিক্ষাকে ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে: সংঘাতের মধ্যেও একটি দেশের শিল্পখাতের দীর্ঘস্থায়ী সহনশীলতা বা টিকে থাকার ক্ষমতাই আসল কথা।
আধুনিক যুদ্ধগুলো এখন আর কেবল কোন পক্ষের কাছে কত বেশি পরিশীলিত বা আধুনিক অস্ত্র রয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় না। বরং কোন পক্ষ কত দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন, মেরামত এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়ে অস্ত্রব্যবস্থার পরিবর্তন করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে।
বেয়ারিং সংক্রান্ত এই গবেষণাটি মূলত সেই যুক্তির প্রতিফলন তুলে ধরেছে।
প্রথম দেখায়, বেয়ারিংয়ের বিষয়টিকে এআই যুদ্ধের সেই ফিউচারিস্টিক বা ভবিষ্যৎ রূপকল্প থেকে অনেক দূরবর্তী কিছু মনে হতে পারে। এগুলো কোনো ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে ওড়া ড্রোন কিংবা হিউম্যানয়েড রোবটও নয়। কিন্তু এগুলো ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র, নৌবাহিনীর প্রপালশন সিস্টেম, রাডার, অ্যারো-ইঞ্জিন এবং ড্রোনের ভেতরের সবচেয়ে মৌলিক ও অপরিহার্য যন্ত্রাংশগুলো তৈরিতে ব্যবহার হয়।
চংকিং ইউনিভার্সিটির অন্যতম গবেষক হুয়াইজু লিউ-এর মতে, শিল্পক্ষেত্রের ভাষায় বেয়ারিং হলো উৎপাদনের এক মৌলিক সক্ষমতা—প্রকৌশলগত নিখুঁততার এমন এক অদৃশ্য স্তর— যার ওপর উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের কার্যকারিতা পুরোপুরি নির্ভর করে।
লিউ এবং তাঁর সহকর্মীরা লিখেছেন, "ডিজাইন বা নকশা তৈরির কাজে আলিবাবা এবং গুগলের অবমুক্ত করা অত্যন্ত উন্নত ও বৃহৎ আকারের এআই মডেল যথাক্রমে Qwen3-235B-A22B এবং Gemini-2.5-Pro-0506-এর তুলনায় চ্যাটবেয়ারিং সামগ্রিক স্কোরে ৪৩.৬ শতাংশ এবং ২১.১ শতাংশ উচ্চতর ফলাফল অর্জন করেছে।" উল্লেখ্য, আলিবাবা হলো সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।
গবেষকদের এই এআই সিস্টেমে রিজনিং মডেল, প্রকৌশলগত মানদণ্ড, সিমুলেশন টুল এবং একটি বিশাল ডেটাবেজ যুক্ত রয়েছে, যাতে চীনের শিল্পমান এবং সুইডিশ বল বেয়ারিং প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান 'সভেনস্কা কুলাগারফ্যাব্রিকেন' (এসকেএফ)-এর রোলিং বেয়ারিং ক্যাটালগ থেকে সংগৃহীত ৪,৫০০-এর বেশি বেয়ারিংয়ের রেকর্ড রয়েছে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই সিস্টেমটি একটি "রিজনিং অ্যান্ড অ্যাক্টিং" (যুক্তিনির্ভর ও কর্মক্ষম) কাঠামোর ওপর কাজ করে, যা এআই-কে তাকে দেওয়া কাজ বা টাস্কের পরিকল্পনা করতে, প্রকৌশলগত টুলগুলো ব্যবহার করতে, গণনা যাচাই করতে এবং নকশা তৈরির প্রক্রিয়ার সময় নিজের ভুলগুলো নিজেই সংশোধন (সেলফ-কারেক্ট) করতে সাহায্য করে।
লিউ লিখেছেন, "এই কাজটি কেবল বুদ্ধিমান রোলিং বেয়ারিং ডিজাইনের একটি বাস্তবসম্মত প্রযুক্তিগত পথই দেখায় না, বরং উচ্চ-স্তরের বা হাই-এন্ড যন্ত্রাংশের মূল উপাদানগুলোর এআই-চালিত নকশার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের (প্যারাডাইম শিফট) ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক সমর্থন এবং ব্যবহারিক রেফারেন্সও দেয়।"
বেয়ারিংয়ের মতো অত্যন্ত মৌলিক একটি শিল্প উপকরণের উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে চীনের সামগ্রিক শিল্প দক্ষতা, অস্ত্র তৈরির গতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
