ঈদযাত্রায় সতর্ক না হলে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
দেশে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ৫২৮ শিশু। আক্রান্ত হয়েছে ৭২ হাজারের বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামে মারা গেছে আরও ১৬ শিশু। ফলে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা যেন কমছেই না।
এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের ভ্রমণ বাড়লে ঈদের পর আবারও হামের সংক্রমণ বাড়তে পারে। তাই শিশুদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলা এবং উপসর্গ দেখা দিলে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদকে কেন্দ্র করে মার্কেট ও পশুর হাটে বাড়তি জনসমাগম, গণপরিবহনে ভিড়, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া-আসা এবং বিনোদনকেন্দ্রে ভ্রমণের কারণে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চিকিৎসকেরা জানান, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন।
অপুষ্ট ও টিকা না নেওয়া শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ঈদের সময় মানুষ শিশুদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাবে। এতে সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ঈদের পরের এক সপ্তাহ সংক্রমণ বাড়তে পারে। আর আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লে মৃত্যুও বাড়বে। অপুষ্ট শিশুরা বেশি বিপদে পড়বে।"
তিনি বলেন, "অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা কিছুটা অসুস্থ, তাদের নিয়ে এই ঈদে ভ্রমণ না করাই ভালো। তা না হলে ওই শিশুর নিজের যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে, তেমনি তার সংস্পর্শে আসা সুস্থ শিশুরাও ঝুঁকিতে পড়বে।"
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ঈদের সময় এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় মানুষের ব্যাপক চলাচল হয়। যাদের শরীরে হামের ভাইরাস রয়েছে, তারা অজান্তেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। কারণ হামের র্যাশ ওঠার চার দিন আগ থেকেই রোগটি সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে।"
তিনি আরও বলেন, "পরিবারের কারও জ্বর, সর্দি বা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ থাকলে তাকে নিয়ে ভ্রমণ না করাই ভালো। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।"
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের মতো উপসর্গ নিয়ে এক হাজার ৩০৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ১২৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে অন্তত ৮৬ শিশু। এছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মানার পরামর্শ
হামের সংক্রমণের মধ্যে শিশুদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ঈদযাত্রায় সবাই যেন মাস্ক ব্যবহার করে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে এবং কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে। অপ্রয়োজনে শিশুদের নিয়ে ঘোরাঘুরি না করাই ভালো। কোনো শিশুর জ্বর বা অন্য উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। জ্বর হলে ওই শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে।"
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও হাম সংক্রমণ এড়াতে ঈদের সময় শিশুদের নিয়ে সতর্কভাবে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা অনুরোধ করছি, ঈদের সময় শিশুদের যেন সব জায়গায় নিয়ে না যাওয়া হয়। বিশেষ করে যেসব শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বা অতিরিক্ত ভিড় রয়েছে এমন জায়গায় না নেওয়াই ভালো।"
মন্ত্রী বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের কাছ থেকে সুস্থ শিশুদের দূরে রাখতে হবে। একইভাবে আক্রান্ত রোগীদেরও অন্যদের সঙ্গে মিশতে দেওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
