কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ব্যবসা পরিবেশ সংস্কার জরুরি, সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা
বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
তাদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেন, নীতিগত অনিশ্চয়তা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত সংরক্ষণবাদ বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত করছে।
সোমবার (১৮ মে) ঢাকায় পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে আয়োজিত 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট- স্পেশাল ফোকাস: এ বিজনেস এনভায়রনমেন্ট দ্যাট ডেলিভারস জবস'- শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলা হয়।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ধ্রুব শর্মা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের দ্রুত সম্প্রসারিত শ্রমশক্তিকে কাজে লাগাতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, 'নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কমানো, লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, প্রতিযোগিতা জোরদার করা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধির বাধা দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।'
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
প্রায় ৪০ শতাংশ যুব বেকারত্বের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
তিনি আরও বলেন, 'প্রবৃদ্ধি ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, আর কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন টেকসই হবে না।'
ড. সাত্তার বলেন, রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের ৬০ শতাংশ দারিদ্র্যের হার ২০২০ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তবে এখন সেই মডেলকে নতুনভাবে শক্তিশালী করতে হবে।
রেমিট্যান্স প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারের অতিরিক্ত ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা এখনও প্রয়োজন আছে কি না।
তার মতে, টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের ফলে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রণোদনা আগেই বেড়েছে।
আলোচনায় দেশের কর প্রণোদনা কাঠামোর বিকৃতিও তুলে ধরা হয়।
ড. সাত্তার বলেন, তৈরি পোশাক খাত এখনও অন্য শিল্পের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম করপোরেট কর সুবিধা পাচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চ সুরক্ষামূলক শুল্কের কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি থাকছে, যা রপ্তানি বহুমুখীকরণ নিরুৎসাহিত করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, 'ফ্রন্টিয়ার ফার্ম'গুলো দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি ও ৭৫ শতাংশ রাজস্ব আয় সৃষ্টি করলেও মোট কর্মসংস্থানে তাদের অবদান মাত্র ১৫ শতাংশ। বক্তাদের মতে, এটি অর্থনীতির একটি কাঠামোগত দ্বৈততা তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, কম মজুরির শ্রম ও অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণবাদের ওপর নির্ভরশীল প্রবৃদ্ধি মডেল থেকে বের হয়ে বাংলাদেশকে আরও বহুমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির দিকে যেতে হবে, যেখানে মানসম্মত কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, দেশের অনেক চাকরিই এখনও অনানুষ্ঠানিক, কম বেতনের এবং অনিশ্চিত।
নতুন শিল্পের জন্য সহায়তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি বাজার বিকৃতি এড়াতে এসব সুরক্ষার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধির জন্য সাশ্রয়ী অর্থায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) নির্বাহী পরিচালক টি আই এম নুরুল কবির বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে অসামঞ্জস্যপূর্ণ রাজস্ব ও করনীতি দায়ী।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঘন ঘন নীতিপরিবর্তন ও হঠাৎ সম্পূরক শুল্ক আরোপ ব্যবসা সম্প্রসারণ নিরুৎসাহিত করছে এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ও কর রাজস্ব কমিয়ে দিচ্ছে।
পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধারে এখন বিশ্বাসযোগ্য রাজস্ব ও আর্থিক খাত সংস্কার অত্যাবশ্যক।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক খুরশিদ আলম বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ও অংশীজনদের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
