ইরানে এসে হোঁচট খেল ট্রাম্পের ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভূ-রাজনীতি’
ক্ষমতায় ফিরে আসার প্রথম বছরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাম্ভিকতাপূর্ণ আলোচনার শৈলী তাকে শুল্ক থেকে শুরু করে সশস্ত্র সংঘাতের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে তার সেই একই ধরনের 'জবরদস্তিমূলক কূটনীতি', যা মূলত প্রকাশ্য হুমকি, অপমান এবং আল্টিমেটামের মাধ্যমে চিহ্নিত, তা এখন এক কঠিন দেয়ালের মুখে দাঁড়িয়েছে এবং এটি সম্ভবত বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধ শেষ করার জন্য তাঁর নিজস্ব প্রচেষ্টাকেই বাধাগ্রস্ত করছে।
দুই পক্ষের মধ্যে চলা এই অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প ১১ সপ্তাহ ধরে চলা এই সংকটের বিষয়ে তাঁর ক্রমবর্ধমান হতাশার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে ইরানের নেতাদের প্রতি তাঁর কঠোর কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নমনীয় করার কোনো আগ্রহ দেখাননি। এটি দ্রুত কোনো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য ভালো লক্ষণ নয়, বরং এমন শঙ্কা বাড়াচ্ছে যে বর্তমান স্থবিরতা এবং বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে এর নজিরবিহীন ধাক্কা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতার পথে অন্যতম প্রধান বাধা হলো ইরানি শাসকদের মানসিকতা, বিশেষ করে তাদের অভ্যন্তরীণ জনসাধারণের কাছে নিজেদের মর্যাদা বা 'মুখ রক্ষা' করার প্রয়োজনীয়তা। যদিও মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
যদিও ইরান মূলত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে দরকষাকষিতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, তবুও ট্রাম্প তাঁর সেই কূটনৈতিক কৌশল বজায় রেখেছেন যা মূলত সর্বোচ্চ দাবি-দাওয়া, অনিশ্চয়তা, পরস্পরবিরোধী সংকেত এবং কটু ভাষায় পূর্ণ। বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ট্রাম্পের এই জেদ যে, তিনি এই সংঘাত থেকে 'একচ্ছত্র বিজয়ী' হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে চান—এমনকি যদি তা ময়দানের বাস্তবতার সাথে না-ও মিলে। অন্যদিকে ইরানিদের 'চূড়ান্ত পরাজয়' মেনে নিতে হবে, যা তারা করার সম্ভাবনা কম।
ওবামা এবং বাইডেন প্রশাসনের সাবেক ইরান আলোচক রব ম্যালি বলেন, "এটি অনিবার্যভাবে একটি যুক্তিসঙ্গত চুক্তিতে পৌঁছানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় কারণ ইরানের মতো কোনো সরকারই নিজেদের 'আত্মসমর্পণকারী' হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারে না।"
ইরানের সাথে এই নিরবচ্ছিন্ন অচলাবস্থা এমন সময়ে চলছে যখন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য এবং নিজের জনপ্রিয়তা হ্রাসের কারণে অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে রয়েছেন। বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি এই অজনপ্রিয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। তাঁর রিপাবলিকান পার্টিও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস ট্রাম্পের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন যে, তাঁর "ভালো চুক্তি করার প্রমাণিত রেকর্ড" রয়েছে এবং তিনি দাবি করেন যে ইরানিরাই এখন চুক্তির জন্য ক্রমবর্ধমান "বেপরোয়া" হয়ে উঠেছে।
চরম ধ্বংসের হুমকি
গত মাসে ট্রাম্পের সবচাইতে ভয়াবহ বক্তব্যটি এসেছিল যখন তিনি এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে হুমকি দিয়েছিলেন, যদি চুক্তি না হয় তবে তিনি ইরানের সভ্যতা নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। প্রশাসনের কর্মকর্তারা 'ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'কে জানিয়েছেন, এই বার্তাটি তাৎক্ষণিক ছিল এবং এটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে আগে যাচাই করা হয়নি। ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসেন এবং একটি যুদ্ধবিরতিতে রাজি হন। কিন্তু গত 'ইস্টার সানডে'তে ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎ গ্রিড ধ্বংস করার হুমকির পর থেকে তিনি বারবার সেই সতর্কবার্তা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এমনকি গত শুক্রবার চীন থেকে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের কাছেও তিনি একই কথা বলেন।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেছে কি না তা তাঁরা বুঝতে পারবেন যদি দেখেন যে "ইরান থেকে একটি বিশাল আলো নির্গত হচ্ছে।" অনেকে এটিকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি হিসেবে দেখলেও ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি কখনোই তা করবেন না।
ট্রাম্প ইরানের নেতাদের প্রতি তাঁর কঠোরতম শব্দগুলো তুলে রেখেছেন, তাদের 'বর্বর উন্মাদ', 'পাগল' এবং 'সন্ত্রাসী' বলে ডাকছেন। জবাবে তেহরানও ট্রাম্পকে উপহাস করে নানা গ্রাফিক মিম ও সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে অবগত দুটি সূত্রের দাবি, প্রেসিডেন্টকে তাঁর এই বার্তায় সংযত করার কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। যদিও ট্রাম্পের অনুসারীদের বড় অংশ তাঁর পাশে রয়েছে, তবে তাঁর কিছু পুরোনো সমর্থক এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
মধ্যরাতের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট
ট্রাম্পের কিছু কঠোর বিবৃতি প্রায়ই মধ্যরাতের পর তাঁর 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হয়। গত মাসে যখন তিনি হঠাত করেই ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধের ঘোষণা দেন, তখন ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। গত সোমবার তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের পাঠানো সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবকে 'আবর্জনার টুকরো' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ডেনিস রস বলেন, "কৌশলগত ধৈর্যের অভাব এবং প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের অসংগতি তাঁর প্রেরিত বার্তাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।"
চীনের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এবং বেইজিংয়ের ইরানি তেলের গ্রাহক হওয়ার কারণে ট্রাম্প সেখানে অবস্থানকালে তেহরানের ওপর আক্রমণাত্মক মন্তব্য থেকে বিরত ছিলেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্প যদি সত্যিই এই সংঘাতের সমাধান চান, তবে তাঁর উচিত কথা কমিয়ে আনা। তুরস্ক সফরকালে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "তিনি (ট্রাম্প) বড় বেশি কথা বলেন।"
ট্রাম্প নিজেকে একজন 'মাস্টার ডিল মেকার' হিসেবে দাবি করেন এবং তাঁর অনিশ্চিত আচরণকে একটি বিশেষ কৌশল বলে মনে করেন। এই পদ্ধতি শুল্ক চুক্তির ক্ষেত্রে সফল হলেও ইরানের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা সংশয় প্রকাশ করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প নিজেকে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য ইস্যুতে নতি স্বীকার করাতে চান। কিন্তু সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে এটি কাজ করার সম্ভাবনা কম, বিশেষ করে ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক কাঠামোর দৃঢ়তা এবং তাদের জাতীয় গৌরবের ইতিহাসের কারণে।
বাস্তবে ট্রাম্পের হুমকি ইরানের নতুন শাসকদের আরও সাহসী করে তুলতে পারে। মার্কিন হামলার পর ট্রাম্পের প্রতি ইরানের আস্থা আরও কমে গেছে। সাবেক স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা নেট সোয়ানসন বলেন, "ইরানকে স্রেফ প্রবল চাপে ফেলে আত্মসমর্পণ করানো যাবে—এটি একটি ভুল ধারণা। ইরানের ক্ষেত্রে এটি এভাবে কাজ করে না।" অন্যদিকে বারবারা লিফ বলেন, ইরানকে ভেনেজুয়েলার মতো একটি সমস্যা মনে করা এবং এই শাসনের অভ্যন্তরীণ স্থিতিস্থাপকতা বুঝতে না পারাটা মার্কিন অভিযানের বড় ভুল ছিল।
কিছু বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন, ট্রাম্পের এই 'জবরদস্তিমূলক কূটনীতি' শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হতে পারে। উত্তর কোরিয়ার মতো নিজেদের রক্ষা করতে ইরান হয়তো এখন আরও দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে ঝুঁকে পড়বে। এছাড়া ট্রাম্প যেখানে দ্রুত একটি চুক্তি চান, সেখানে ইরানি প্রতিনিধিদের ইতিহাস হলো আলোচনা দীর্ঘায়িত করা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একজন শিক্ষাবিদ আব্দুল খালেক আব্দুল্লাহ মনে করেন, ট্রাম্প কথা কমাতে পারেন তবে বর্তমান অচলাবস্থার জন্য ইরানের অনড় অবস্থানই বেশি দায়ী।
ওয়াশিংটনস্থ কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী সহ-সভাপতি ত্রিতা পারসি বলেন, তেহরানের নেতারা ট্রাম্পের এই অসংলগ্ন আচরণকে তাঁর 'বেপরোয়া অবস্থা'র চিহ্ন হিসেবে দেখছেন এবং তারা ট্রাম্পের বিদায় পর্যন্ত অপেক্ষা করার কৌশল নিচ্ছেন। পারসি বলেন, "একভাবে ট্রাম্প আসলে তাদের হাতের পুতুল হিসেবেই খেলছেন।"
