আদানির বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা তুলে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
বাইডেন প্রশাসনের শেষ কয়েক সপ্তাহে ভারতের শীর্ষ ধনী গৌতম আদানির বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ এনেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। প্রসিকিউটররা (কৌঁসুলি) তখন বলেছিলেন, মার্কিন বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করে একটি 'বিস্তৃত' ঘুষের স্কিম চালিয়েছে আদানি গ্রুপ।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। মামলার বিষয়ে অবগত বেশ কয়েকজনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আদানির বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
আদানি তার আইনি লড়াইয়ের জন্য নতুন একটি আইনজীবী দল নিয়োগ করার পরই এই নাটকীয় মোড় আসে। এই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন রবার্ট জে জিউফ্রা জুনিয়র, যিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবীদের একজন এবং বিখ্যাত ল ফার্ম 'সালিভান অ্যান্ড ক্রমওয়েল'-এর কো-চেয়ারম্যান।
গত মাসে ওয়াশিংটনে বিচার বিভাগের সদর দপ্তরে আদানির পক্ষে জিউফ্রার নেতৃত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বৈঠকে জিউফ্রা প্রায় ১০০টি স্লাইড উপস্থাপন করে দেখান যে আদানির বিরুদ্ধে মামলার কোনো প্রাথমিক প্রমাণ প্রসিকিউটরদের হাতে নেই। এমনকি এই মামলা চালানোর আইনি এখতিয়ারও তাদের নেই।
তবে একটি স্লাইডে এমন এক অদ্ভুত প্রস্তাব ছিল, যা সবার নজর কাড়ে। প্রস্তাবে বলা হয়, প্রসিকিউটররা যদি আদানির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তুলে নেন, তবে আদানি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং ১৫ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করবেন।
একই বৈঠকে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এবং ট্রেজারি বিভাগের আলাদা দুটি মামলারও সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন জিউফ্রা। গত বৃহস্পতিবার এসইসি আদানির সঙ্গে তাদের একটি মীমাংসার কথা ঘোষণা করেছে। ট্রেজারি বিভাগও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাদের মীমাংসার কথা জানাতে পারে।
প্রসিকিউটররা পরে জিউফ্রাকে জানিয়েছিলেন যে ফৌজদারি মামলার সমাধানের ক্ষেত্রে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাবটি কোনো কাজে আসবে না। তবে সূত্রগুলো বলছে, বিচার বিভাগের অন্তত একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই প্রস্তাবটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখেছিলেন।
'বিক্রির জন্য উন্মুক্ত স্বাধীনতা'
১০ বিলিয়ন ডলারের এই প্রস্তাবটিকে ট্রাম্প তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারতেন। এটি মূলত ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিচারব্যবস্থার প্রতি 'লেনদেনভিত্তিক' দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রকটভাবে তুলে ধরে।
গত এক বছরে ট্রাম্প তার অনেক দাতা এবং ব্যবসায়িক অংশীদারকে বাঁচিয়েছেন। বিচার বিভাগ তার রাজনৈতিক মিত্রদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও তদন্ত বাতিল করেছে। প্রসিকিউটরিয়াল নিয়মনীতির এমন লঙ্ঘন এই ধারণা তৈরি করেছে যে ট্রাম্পের জমানায় 'স্বাধীনতাও বিক্রির জন্য উন্মুক্ত'। আর এটিই অভিযুক্তদের এমন সব অর্থনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব দিতে উৎসাহিত করছে, যা একসময় কল্পনাতীত ছিল।
জরিমানা দিতে হবে আদানিকে
ফৌজদারি মামলা বাতিল হলেও আদানিকে আর্থিক জরিমানা দিতে হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার এসইসির মীমাংসায় আদানি গ্রুপকে ১৮ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে আদানিকে দিতে হবে ৬ মিলিয়ন ডলার এবং বাকিটা দেবেন তার সহ-অভিযুক্ত।
অন্যদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানের গ্যাস পরিবহনের অভিযোগে ট্রেজারি বিভাগ আদানির কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আলাদা তদন্ত করছিল। তারা এখন প্রায় ২৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা আদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ বিষয়ে আদানির মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
মামলার প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের শেষের দিকে ব্রুকলিনের প্রসিকিউটররা আদানির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনেন। এই অভিযোগের ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যও ছিল। ভারতে অবকাঠামো খাতে আদানির একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। তার আদানি গ্রুপ দেশের বৃহত্তম বন্দর ও মহাসড়কগুলো নির্মাণের পাশাপাশি বিমানবন্দর পরিচালনা করে এবং তাদের নিজস্ব টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলও রয়েছে।
ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, ১০৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে আদানি বর্তমানে বিশ্বের ১৭তম শীর্ষ ধনী।
প্রসিকিউটররা আদানি, তার ভাতিজা এবং আরও ছয় সহযোগীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। তাদের দাবি, ভারতে লাভজনক সৌরবিদ্যুৎ চুক্তি পেতে অভিযুক্তরা সে দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদানে ২৬৫ মিলিয়ন ডলারের একটি স্কিম চালিয়েছিল। মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা তোলার সময় তারা এই ঘুষের কথা লুকিয়েছিলেন।
তবে অভিযোগ ঘোষণার সময় অভিযুক্তরা কেউ যুক্তরাষ্ট্রে না থাকায় তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
১০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি ও ট্রাম্পের প্রশংসা
২০২৪ সালের নভেম্বরে আদানির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার ঠিক এক সপ্তাহ আগে তিনি এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের অংশ হিসেবে আমেরিকার জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং ১৫ হাজার কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন। যদিও ব্লুমবার্গ নিউজ এর আগেই জানিয়ে দিয়েছিল যে মার্কিন প্রসিকিউটররা আদানির বিরুদ্ধে তদন্ত করছেন।
এক্সে ট্রাম্পের প্রশংসাও করেছিলেন আদানি। তিনি লিখেছিলেন, পুনর্নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হলেন 'অটুট জেদ, অটল সাহস, নিরলস সংকল্প এবং নিজের বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থাকার এক মূর্ত প্রতীক।'
কিন্তু অভিযোগ সামনে আসার পর আদানির বিনিয়োগ পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। আমেরিকার বাজারে প্রবেশ এবং ভারতের বাইরে তার অবাধে চলাফেরাও হুমকির মুখে পড়ে। বাধ্য হয়ে আদানির আইনজীবীরা মামলা বাতিলের জন্য জোর চেষ্টা শুরু করেন। গত গ্রীষ্মে জিউফ্রাসহ সালিভান অ্যান্ড ক্রমওয়েলের একদল আইনজীবীকে নিয়োগ দেন তিনি।
উল্লেখ্য, জিউফ্রা তখন পর্ন তারকাকে মুখ বন্ধ রাখার জন্য ঘুষ দেওয়া এবং নথিপত্র জালিয়াতির অভিযোগে ম্যানহাটনে ট্রাম্পের ফৌজদারি মামলার আপিল লড়ছিলেন।
মামলার ভবিষ্যৎ কী?
আদানির মামলার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসইসির মামলাটি বাতিলের উদ্যোগ নেন জিউফ্রা। আদালতে তিনি যুক্তি দেন যে এই মামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ এটি ভারতের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে, যেখানে কোনো মার্কিন দরদাতা বা ভোক্তা ছিল না।
গত মাসের বৈঠকে ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাবটি জিউফ্রার উপস্থাপনার একটি ছোট অংশ হলেও, তা বিচার বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নজর কাড়ে।
বৈঠকের বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা জানান, প্রিন্সিপাল অ্যাসোসিয়েট ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ট্রেন্ট ম্যাককটার এই প্রস্তাবের সঙ্গে নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের মামলার মিল খুঁজে পান। ওই মামলায় বিচার বিভাগ অ্যাডামসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বাতিল করেছিল, যার বিনিময়ে অ্যাডামস অভিবাসন আইন প্রয়োগে তাদের সহযোগিতা করেছিলেন।
ম্যাককটার মনে করেন, অ্যাডামসের মামলা বাতিলের পেছনের কারণগুলো যৌক্তিক ছিল। জানুয়ারিতে বিচার বিভাগে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি অ্যাডামসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নেওয়ার পক্ষে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছিলেন।
অ্যাডামসের ওই মামলার জেরে ওয়াশিংটনের বিচার বিভাগ এবং ম্যানহাটনের ইউএস অ্যাটর্নি অফিসের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ট্রাম্প প্রশাসন এবং নিউইয়র্কের মেয়রের মধ্যে এই চুক্তিকে 'স্বার্থের বিনিময়' মনে করে মামলার প্রসিকিউটররা পদত্যাগ করেছিলেন।
একইভাবে আদানির মামলা বাতিলের চেষ্টার বিরুদ্ধেও কিছু সরকারি কর্মকর্তা কয়েক মাস ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছেন।
আদানির পাঁচ সহযোগীর বিরুদ্ধে 'ফরেন করাপ্ট প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট'-এর (এফসিপিএ) অধীনে অভিযোগ আনা হয়েছিল। এই আইনে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা করা কোম্পানিগুলোর বিদেশে কাজ পেতে ঘুষ দেওয়া নিষিদ্ধ।
তবে গত বছর ট্রাম্প এফসিপিএ প্রয়োগ স্থগিত করে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। তার যুক্তি ছিল, এই আইন 'অন্যান্য দেশের সাধারণ ব্যবসায়িক অনুশীলনকে' অপরাধ হিসেবে দেখে, যা মার্কিন অর্থনীতির প্রতিযোগিতার সক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ট্রাম্পের এই আদেশের পরপরই ভারতে ঘুষের স্কিম চালানোর অভিযোগে কগনিজেন্ট টেকনোলজি সলিউশনস করপোরেশনের সাবেক নির্বাহীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলা বাতিল করে বিচার বিভাগ।
