মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে চাকরি ও মজুরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশি অভিবাসীরা: আরএমএমআরইউ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা চাকরি, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অভিবাসন সম্ভাবনা নিয়ে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
বুধবার (১৩ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাবে শরণার্থী ও অভিবাসী আন্দোলন গবেষণা ইউনিট (আরএমএমআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেন।
সংগঠনটি জানায়, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত উপসাগরীয় শ্রমবাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যা লাখো বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিএমইটির তথ্য উদ্ধৃত করে আরএমএমআরইউ জানায়, যুদ্ধের কারণে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ মাসে বিদেশগামী কর্মী প্রবাহ ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, 'লেবাননে অন্তত ৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। সৌদি কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীসংখ্যা কমিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কর্মীরা মজুরি কমে যাওয়া, মজুরি আত্মসাৎ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হচ্ছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অন্তত ১১ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।'
আরএমএমআরইউর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, 'যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ২০০ বাংলাদেশি ইরান থেকে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু সরকার থেকে ফেরত আসাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য আমরা পাইনি, যা তাদের পুনর্বাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি যুদ্ধকবলিত অভিবাসীদের সহায়তায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের তহবিল ব্যবহার না করে আলাদা বাজেট বরাদ্দের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই তহবিল শ্রমিকদের অবদানে গঠিত।
আরএমএমআরইউ জানায়, যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চজুড়ে ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন ঘটেছে। এ অনিশ্চয়তা সৌদি আরবের 'ভিশন ২০৩০'-এর মেগা প্রকল্পগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে নিওম, রেড সি পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্প এবং কিদ্দিয়া। এসব প্রকল্প নির্মাণ ও সেবাখাতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছিল।
সংগঠনটি সতর্ক করে জানায়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে সম্ভাব্য বহু চাকরির সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পৃক্ততা ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি আমিরাতে বসবাসরত প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশির জীবন ও জীবিকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, আঞ্চলিক পরিবহন ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় অভিবাসন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় 'দ্বিতীয় সংকট' তৈরি হয়েছে।
আরএমএমআরইউ জানায়, কর্মী পাঠানো বিলম্বিত হওয়া ও বাতিল হওয়ার কারণে নিয়োগদাতা এজেন্ট ও বিদেশে যেতে আগ্রহী কর্মীদের মধ্যে খরচ ও অর্থ পরিশোধ নিয়ে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
সংগঠনটি সতর্ক করে জানায়, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
আরএমএমআরইউ সরকারের সমালোচনা করে বলে, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য সরকারের কোনো সমন্বিত সংকট মোকাবিলা ব্যবস্থা নেই। চাকরি হারানো, আহত হওয়া বা দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া শ্রমিকদের জন্য আলাদা জরুরি তহবিলও নেই।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, 'সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল থেকে বাতিল হওয়া ফ্লাইট, আটকে পড়া অভিবাসী এবং দেশে ফেরত আসাদের তথ্য পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো রিয়েল-টাইম মনিটরিং ড্যাশবোর্ড নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'ইরান বা উপসাগরীয় দেশ থেকে ফেরা কর্মীদের জন্য কোনো সমন্বিত পুনর্বাসন কর্মসূচি নেই। বিদেশে আটকে পড়া ও কাজ হারানো শ্রমিকদের জন্যও জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি।
আরএমএমআরইউ গৃহকর্মীদের নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংগঠনটি জানায়, তারা সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসী গোষ্ঠীগুলোর একটি এবং অনেক সময় হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক জরুরি সহায়তা নেটওয়ার্কের বাইরেই থেকে যান।
সংগঠনটি আরও জানায়, বাধ্যতামূলক বিমান টিকিট দেখানোর শর্তের কারণে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ বিতরণ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
সংকট মোকাবিলায় আরএমএমআরইউ উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোতে বাংলাদেশি দূতাবাসে বিশেষ অভিবাসী সংকট মোকাবিলা সেল গঠনের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা চালু বাংলা ভাষার হটলাইন চালুর আহ্বানও জানানো হয়।
এ ছাড়া ইরান থেকে ফেরা কর্মীদের বিমানভাড়া সহায়তা, নগদ সহায়তা এবং চাকরি হারানো বা সংঘাতজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য জরুরি তহবিল গঠনের আহ্বান জানানো হয়।
সংগঠনটি আটকে পড়া কর্মীদের জন্য জরুরি খাদ্য, আশ্রয় ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, হোয়াটসঅ্যাপ ও এসএমএসের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় সংকট সতর্কতা ব্যবস্থা চালু এবং দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণেরও সুপারিশ করেছে।
