হরমুজে নিয়ন্ত্রণ জোরদার, ইরানের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি ইরাক-পাকিস্তানের
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে ইরানের সঙ্গে জ্বালানি পরিবহনে পৃথক চুক্তি করেছে ইরাক ও পাকিস্তান।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের জন্য তেহরানের সঙ্গে এ চুক্তি করা হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে এ অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। যুদ্ধের আগে এখান থেকে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করা হতো।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে। যদিও শুরুতে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে চেয়েছিল, এখন সেই অবস্থান বদলাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের ক্লদিও স্টুয়ার।
তিনি বলেন, 'ইরান হরমুজ বন্ধ করার অবস্থান থেকে সরে এসে এখন সেখানে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করছে। হরমুজ আর নিরপেক্ষ নৌপথ নয়, এটি এখন নিয়ন্ত্রিত করিডর।'
সাধারণত নিজেদের অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়েই রপ্তানি করে ইরাক। ফলে প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ছিল তারা।
অন্যদিকে সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা পাকিস্তান উপসাগরীয় জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে দেশটিতে জ্বালানির খরচও বেড়ে গেছে।
বাগদাদ ও তেহরানের মধ্যে হওয়া অপ্রকাশিত এক চুক্তির আওতায় রোববার হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে পার হয়েছে দুটি অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল ছিল।
প্রাথমিক চুক্তি ও চলমান আলোচনার বিষয়ে অবগত ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, আরও জাহাজ চলাচলের অনুমোদন পেতে এখন ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাগদাদ। কারণ, ইরাকের জাতীয় বাজেটের ৯৫ শতাংশই আসে তেল আয়ের মাধ্যমে।
তিনি বলেন, 'ইরাক ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ইরাকের অর্থনীতির অবনতি হলে দেশটিতে ইরানের অর্থনৈতিক স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা এবং জাহাজ পরিবহন খাতের একটি সূত্রও তেহরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি ইরাকি সরকারের একজন মুখপাত্র।
পাকিস্তানের পথে কাতারের এলএনজিবাহী জাহাজ
এদিকে পৃথক এক দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় কাতারের এলএনজি বহনকারী দুটি জাহাজ পাকিস্তানের পথে রয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট দুই শিল্পসূত্র।
যুদ্ধ শুরুর আগে পাকিস্তান প্রতি মাসে প্রায় ১০টি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) কার্গো আমদানি করত। এখন গ্রীষ্মের তীব্র গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণসহ বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দেশটিকে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ইরান বা দেশটির ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) কোনো সরাসরি অর্থ পরিশোধ করেনি ইরাক বা পাকিস্তান।
দুই শিল্পসূত্র জানায়, পাকিস্তানের সঙ্গে হওয়া দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে কাতার সরাসরি অংশ নেয়নি। তবে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে এলএনজি পাঠানোর আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বিষয়টি জানিয়েছিল।
এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম ও তথ্য মন্ত্রণালয়। একইভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।
জাহাজ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে ইরান
বাড়তে থাকা জ্বালানির খরচ এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। এ কারণে আরও কিছু দেশ ইরানের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে বলে আলোচনার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো জানিয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এমএসটি মার্কির গবেষণা প্রধান সল কাভোনিক বলেন, 'আরও বেশি দেশ যদি যাতায়াতের অনুমতির জন্য ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে রাজি হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের আরও স্থায়ী নিয়ন্ত্রণের ধারণা স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।'
যুদ্ধের আগে প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করত। তবে জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেই সংখ্যা আগের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এছাড়া ইউরোপ ও এশিয়ায় এলএনজির দামও প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
ইরান বলেছে, যুদ্ধের পরও তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। সম্ভাব্য যেকোনো সমঝোতার অংশ হিসেবে দেশটি ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং জব্দ করা সম্পদে প্রবেশাধিকারের দাবি জানিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব শর্তকে 'আবর্জনা' বলে উল্লেখ করেছেন। এতে সংঘাত নিরসনের চুক্তির আশা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।
এদিকে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে আরও আনুষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে ইরান।
ইরাকি তেল মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরানের নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্ধারিত সমুদ্রপথ ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল সহজ করতে প্রতিটি ট্যাংকারের তথ্যপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে ইরাককে।
ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ দল প্রতিটি জাহাজের গন্তব্য, পরিবহনসংক্রান্ত তথ্য, মালিকানা এবং কার্গোর বিস্তারিত তথ্য ইরানি কর্তৃপক্ষকে দিচ্ছে, যাতে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে অবগত পাকিস্তানের একটি সূত্র জানায়, পুরো প্রক্রিয়ায় কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, 'আইআরজিসি মাঝেমধ্যে শর্ত বদলে ফেলে। ফলে সব কিছু ঠিকভাবে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আমরা বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি।'
