ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্পের দাবি কী, আর গোয়েন্দা তথ্য কী বলছে
ইরান যুদ্ধের ময়দানে দেশটির সামরিক সক্ষমতা আসলে কতটুকু চূর্ণ হয়েছে, তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি এবং গোপন গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে, গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার আগেই মার্কিন-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে অপ্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো বলছে ভিন্ন কথা।
এপ্রিলের শুরুতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন একটি গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে জানায়, ইরান তাদের ড্রোন সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার একটি বড় শতাংশ এখনো টিকিয়ে রেখেছে। এই গোয়েন্দা মূল্যায়নটি ট্রাম্পের সেই সময়ের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। ট্রাম্প তখন জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন- "তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণের ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং তাদের অস্ত্রের কারখানা ও রকেট লঞ্চারগুলো টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। খুব অল্পই অবশিষ্ট আছে। যুদ্ধের ইতিহাসে কোনো শত্রু মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এত স্পষ্ট এবং বিধ্বংসী বড় মাপের ক্ষতির শিকার হয়নি। আমাদের শত্রুরা হারছে।"
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে ইরান সেই সব লঞ্চার খুঁড়ে বের করেছে যা আগের হামলায় হয়তো মাটির নিচে চাপা পড়েছিল। এটিই ব্যাখ্যা করে যে কেন ইরান এত কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে টান দিতে পেরেছে। ট্রাম্প যেখানে ইরানের সক্ষমতা বোঝাতে 'পুরোপুরি চূর্ণ' এর মতো শব্দ ব্যবহার করছেন, গোয়েন্দা তথ্য বলছে ইরান বর্তমান নৌ-অবরোধের মধ্যেও অন্তত চার মাস তাদের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম। এমনকি চলতি সপ্তাহে 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস' জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে মাত্র ৩টি বাদে বাকি সবগুলোতে এখনো তাদের 'অপারেশনাল অ্যাক্সেস' বা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন। প্রতিবেদনে তার আগের দাবির বিরোধিতা করায় তিনি একে 'দেশদ্রোহিতা' হিসেবে অভিহিত করেন। ট্রাম্প লিখেছেন- "যখন ফেইক নিউজ বলে যে ইরানি শত্রু আমাদের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে ভালো করছে, তখন এটি কার্যত দেশদ্রোহিতা; কারণ এটি একটি মিথ্যা এবং এমনকি অযৌক্তিক বক্তব্য। তারা শত্রুকে সাহায্য ও প্ররোচনা দিচ্ছে! এটি কেবল ইরানকে একটি মিথ্যা আশা দিচ্ছে যখন কোনো আশাই থাকা উচিত নয়। এরা আমেরিকান কাপুরুষ যারা আমাদের দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। ইরানের নৌবাহিনীতে ১৫৯টি জাহাজ ছিল—প্রতিটি জাহাজ এখন সমুদ্রের তলদেশে। তাদের কোনো নৌবাহিনী নেই, তাদের বিমান বাহিনী চলে গেছে, সমস্ত প্রযুক্তি শেষ, তাদের 'নেতারা' আর নেই এবং দেশটি একটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের নাম। কেবল পরাজিত, অকৃতজ্ঞ এবং বোকারাই আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে! প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প।"
উল্লেখ্য যে, এই পোস্টে ট্রাম্প সরাসরি এটি অস্বীকার করেননি যে হরমুজ প্রণালির ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে ইরানের প্রবেশাধিকার নেই।
মঙ্গলবার সিনেট শুনানিতে জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে টাইমসের প্রতিবেদনটি ট্রাম্পের আগের দাবির বিরোধী কি না। কিন্তু শীর্ষ এই জেনারেল উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান। কেইন বলেন, "আমাদের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের সব বিষয় গোপন এবং এই ফোরামে সে বিষয়ে মন্তব্য করা আমার জন্য অনুচিত হবে। আমি প্রশ্নের প্রশংসা করছি, কিন্তু আমি এর উত্তর দেব না।"
প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথও একই সুর মিলিয়ে বলেন, "মানুষ কী ফাঁস করল বা না করল তা আমি কেন নিশ্চিত করতে যাব? আমরা এসব বিষয়ে কথা বলি না।" অথচ গত এপ্রিলেই পেন্টাগনে দাঁড়িয়ে হেগসেথ দাবি করেছিলেন: "তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কার্যত ধ্বংস, লঞ্চার, উৎপাদন কেন্দ্র এবং বিদ্যমান মজুদ ফুরিয়ে গেছে ও ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় পুরোপুরি অকার্যকর।"
সিনেটর ক্রিস মারফি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে প্রশাসন জনসমক্ষে যা বলছে, গোপন বা ক্লাসিফাইড সেটিংসে তারা তার চেয়ে ভিন্ন কথা বলছে। শুনানিতে মারফি যখন হেগসেথকে জিজ্ঞেস করেন—যুক্তরাষ্ট্রের কি হরমুজ প্রণালি খোলার মতো কোনো সামরিক উপায় অবশিষ্ট নেই? হেগসেথ তা অস্বীকার করে বলেন যে অবশ্যই উপায় আছে। মারফি তখন পাল্টা প্রশ্ন করেন, "ব্যক্তিগত ব্রিফিংয়ে আমাদের কাছে যা সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে এটি তেমন নয়।" তিনি প্রশ্ন তোলেন যে যদি সামরিক পথ খোলাই থাকে তবে কেন প্রশাসন তা ব্যবহার করছে না। জবাবে হেগসেথ দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন প্রায়শই তাদের এজেন্ডা এগিয়ে নিতে অতিরঞ্জিত তথ্য ব্যবহার করে। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের শীর্ষ নেতাকে হত্যা করলেই শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটবে না—এমন গোয়েন্দা পূর্বাভাস ট্রাম্পকে আগেই দেওয়া হয়েছিল। সাবেক ন্যাটো কমান্ডার অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল জেমস স্টাভরিডিস বলেন, "যদি এই প্রতিবেদনগুলো সঠিক হয়, তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ঠিক তাই করছে যা তাদের করা উচিত।"
ইরানের এই যুদ্ধ নিয়ে হোয়াইট হাউসের অনেক যুক্তিই প্রশাসনের অতিরঞ্জিত বয়ান তৈরির পুরোনো অভ্যাসের সাথে মিলে যাচ্ছে। সেটা হোক গণ-ডিপোর্টেশন নিয়ে তথ্য বা মার্কিন নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ—সবখানেই এই ধরন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
