ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টাগুলো ‘সাজানো’ মনে করেন অনেক আমেরিকান: জরিপ
গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলে হোয়াইট হাউসের সাংবাদিক সমিতির নৈশভোজে বন্দুক হামলার ঘটনাটি আসলে সাজানো ছিল—এমনটাই মনে করেন প্রতি চারজন আমেরিকানের মধ্যে একজন। সোমবার (১১ মে) প্রকাশিত এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। এতে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে আমেরিকানদের মধ্যে বড় ধরনের বিভাজন লক্ষ্য করা গেছে।
অনলাইন সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান নিউজগার্ডের প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের প্রায় তিনজনের একজন মনে করেন ঘটনাটি সাজানো ছিল। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রতি আটজনে একজন এমনটি বিশ্বাস করেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বয়স্কদের তুলনায় ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই ঘটনাকে 'সাজানো' মনে করার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসির একটি গ্র্যান্ড জুরি অভিযুক্ত বন্দুকধারী কোল টমাস অ্যালেনকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টাসহ চারটি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত করেছে। ওয়াশিংটন হিলটনে ওই ঘটনার পরপরই অনলাইনে নানা ধরণের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ভিত্তিহীনভাবে দাবি করা হয়, প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান পার্টির জন্য জনসমর্থন তৈরি করতে এবং হোয়াইট হাউসের পরিকল্পিত নতুন বলরুমের স্বপক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেই এই ঘটনা সাজিয়েছে।
নিউজগার্ডের জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ২৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মনে করেন ওয়াশিংটন হিলটনের ঘটনাটি ভুয়া ছিল। অন্যদিকে ৪৫ শতাংশ মনে করেন ঘটনাটি বাস্তব। আরও ৩২ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে নিশ্চিত নন। ইউগভ এক হাজার মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর ২৮ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত জরিপটি পরিচালনা করে।
নিউজগার্ডের সম্পাদক সোফিয়া রুবিনসন বলেন, 'এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।' তার মতে, এই ফলাফল সরকার ও সংবাদমাধ্যমের প্রতি মার্কিনিদের বৃহত্তর সন্দেহ ও অনাস্থার প্রতিফলন। তিনি বলেন, 'রাজনৈতিক বিভাজনের সব পক্ষের মানুষই ক্রমশ এই প্রশাসন এবং সংবাদমাধ্যম—উভয়ের প্রতিই অবিশ্বাসী হয়ে উঠছে।' তবে অনলাইনে পাওয়া যাচাইবিহীন তথ্য তারা সহজেই বিশ্বাস করছে।
প্রকাশের পর দেওয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করে। মুখপাত্র ডেভিস ইংল বলেন, 'যারা মনে করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই নিজের হত্যাচেষ্টা সাজিয়েছেন, তারা পুরোপুরি নির্বোধ।'
মিডিয়া অপব্যবহার নিয়ে গবেষণা করা বোস্টন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোয়ান ডোনোভান বলেন, এই ফলাফল ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে নাটকীয়তার প্রভাবকে নির্দেশ করে। তিনি মন্তব্য করেন, 'এটি সাজানো বলে কল্পনা করাটাও অনেকটা হলিউডি সিনেমার মতো মনে হয়। পুরো সরকারি ব্যবস্থাটিই যেন একটি রিয়েলিটি টিভিতে রূপান্তরিত হয়েছে।'
গত এপ্রিলের ঘটনার আগেও ২০২৪ সালে ট্রাম্পের ওপর আরও দুটি হত্যাচেষ্টা হয়েছিল। এর একটি ছিল পেনসিলভেনিয়ার বাটলারের এক নির্বাচনী সভায় এবং দ্বিতীয়টি ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল গলফ ক্লাবে।
ট্রাম্পের জনসভায় ঘটা এই তিনটি ঘটনার কোনোটি যে 'সাজানো' ছিল, তার সপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও অনেক আমেরিকানই মনে করেন প্রতিটি ঘটনাই ছিল পূর্বপরিকল্পিত।
বাটলারের সেই হত্যাচেষ্টার বিষয়ে জরিপে অংশ নেওয়া ২৪ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা মনে করেন এটি সাজানো ছিল। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ ডেমোক্র্যাট সমর্থক এই ঘটনায় সন্দেহ প্রকাশ করলেও রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের গলফ ক্লাবের ঘটনাটিকে সাজানো মনে করেন ১৬ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ৭ শতাংশ রিপাবলিকান রয়েছেন।
সব মিলিয়ে জরিপে অংশ নেওয়া ২১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করেন, ট্রাম্পের ওপর হওয়া তিনটি ঘটনাই সাজানো ছিল। এই একই ধারণা পোষণ করেন ১১ শতাংশ স্বতন্ত্র ভোটার এবং মাত্র ৩ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থক।
অধ্যাপক ডনোভান জানান, ডেমোক্র্যাটরা এসব ঘটনার সত্যতা নিয়ে বেশি সন্দেহ প্রকাশ করবে—তাতে তিনি অবাক হননি। তিনি বলেন, 'বামপন্থী বা উদারপন্থীদের মধ্যে ষড়যন্ত্রমূলক চিন্তার একটি জোয়ার দেখা যাচ্ছে। এর একটি বড় কারণ হলো, আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা ও নির্ভরতা দিন দিন কমে যাচ্ছে।'
অনলাইনে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ওপেন মেজারস-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক জ্যারেড হোল্ট বলেন, এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্রে ষড়যন্ত্রমূলক চিন্তাভাবনা কতটা সাধারণ হয়ে উঠছে।
হোল্ট বলেন, 'জরিপের এই ফলাফল আমাকে খুব বেশি অবাক না করলেও এটি নিশ্চিতভাবেই এক হতাশাজনক চিত্র। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এখন আমাদের রাজনীতির এমন গভীরে প্রবেশ করেছে যে এটি এখন সাধারণ মানুষের একটি সহজাত প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।'
ডনোভান মনে করেন, মানুষ যখন কোনো জটিল পরিস্থিতি বা ঘটনার কূলকিনারা করতে পারে না, তখন প্রাকৃতিকভাবেই তারা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
তিনি বলেন, 'দুর্ভাগ্যবশত, সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সত্য গোপন করে অথবা নিয়মনীতি নিয়ে কারসাজি করে, তখন পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়েছে—এমনটি মেনে নেওয়ার চেয়ে একটি ষড়যন্ত্রে বিশ্বাস করা মানুষের জন্য অনেক সহজ হয়ে দাঁড়ায়।'
