ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪৪% বেড়ে রেকর্ড ৯৪,০০০ কোটি টাকা
দেশের শীর্ষ বেসরকারি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির এক ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের চিত্র সামনে এসেছে। ব্যাংকটির সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে এর মোট ঋণ পোর্টফোলিও বা বিনিয়োগের ৫১ শতাংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে কোনো একক ব্যাংকের ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ।
খেলাপি ঋণের চিত্র
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৫ সাল শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা, যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের (৪২.৩৬ শতাংশ) তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। ব্যাংকটির এই বিশাল খেলাপি ঋণ জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকা, যার ১৭ শতাংশই এককভাবে ইসলামী ব্যাংকের। একই সময়ে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা জনতা ব্যাংকের খেলাপির পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা।
নেপথ্যে এস আলম গ্রুপের 'গোপন ঋণ'
ব্যাংকটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই নজিরবিহীন খেলাপি ঋণের মূল কারণ এস আলম গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট 'গোপনকৃত ঋণ'। তিনি অভিযোগ করেন, আগের ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পিতভাবে এই বিপুল পরিমাণ ঋণের তথ্য গোপন করে রেখেছিল। বর্তমান ম্যানেজমেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করায় এই আকাশচুম্বী চিত্র সামনে এসেছে।
নিরীক্ষকদের সতর্কতা ও 'গোয়িং কনসার্ন' শঙ্কা
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম মাহফেল হক অ্যান্ড কো.-এর তৈরি ২০২৫ সালের অডিট রিপোর্টে ব্যাংকটির আর্থিক সুরক্ষার বিশাল ঘাটতি তুলে ধরা হয়েছে। নিরীক্ষকরা ব্যাংকটির ওপর 'কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন' দিয়েছেন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত ব্যাংকটির মন্দ বিনিয়োগ ও সম্পদের বিপরীতে ৯২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা প্রভিশন বা সঞ্চিতি রাখার কথা ছিল, কিন্তু রাখা হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। ফলে রেকর্ড ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকার সঞ্চিতি ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই বিশাল ঘাটতিকে আর্থিক প্রতিবেদনে সমন্বয় না করায় ব্যাংকের সম্পদ, নিট মুনাফা ও ইকুইটি অনেক বেশি দেখানো হয়েছে এবং দায় কম দেখানো হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নীতিগত ছাড়ের কারণেই ব্যাংকটি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সমর্থন না থাকলে ব্যাংকটির 'গোয়িং কনসার্ন' বা ভবিষ্যতে টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে চরম সংশয় রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সমর্থন অব্যাহত না থাকলে ব্যাংকটির টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
মূলধন ঘাটতি ও লোকসানের হিসাব
ব্যাংকটির মূলধনের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক। নিয়ম অনুযায়ী ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে ১৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা মূলধন থাকার কথা থাকলেও ব্যাংকের রিপোর্ট করা মূলধন মাত্র ৯ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। দৃশ্যমান মূলধন ঘাটতি ৯ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা হলেও নিরীক্ষকদের মতে, যদি ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি পূর্ণ বিবেচনা করা হতো, তবে ব্যাংকটির রেগুলেটরি মূলধন ঘাটতি দাঁড়াত প্রায় ৯৩ হাজার ৯৬০ কোটি টাকায়।
বর্তমানে ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিআরএআর) মাত্র ৬.৪২ শতাংশ, যেখানে থাকার কথা ১২.৫০ শতাংশ। অডিট রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাড় না থাকলে ২০২৫ সালে ব্যাংকটি এককভাবে ৮৪ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা লোকসান গুনত।
এস আলম গ্রুপের কাছে পাওনা
প্রতিবেদনে ব্যাংকটির পতনের জন্য এস আলম গ্রুপের বিশাল ঋণের তথ্য উঠে এসেছে। উল্লেখযোগ্য ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে এস আলম স্টিলস ও রিফাইনড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের ঋণ ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের ১৪ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা এবং এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের ঋণ ১২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ অনুযায়ী এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট প্রায় ৮৩ শতাংশ শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে প্রভাব ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাড়
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও চলতি বছরের গত ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ইসলামী ব্যাংককে ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকার প্রভিশন সমন্বয় ছাড়াই আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার বিশেষ অনুমতি দিয়েছে। মূলত পর্যাপ্ত মুনাফা না থাকায় এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে এর বিনিময়ে আগামী এক মাসের মধ্যে ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা বোর্ডে পাস করিয়ে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক পারফরম্যান্স তলানিতে ঠেকায় এবং টানা দ্বিতীয় বছর লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় শেয়ারবাজারে ইসলামী ব্যাংককে 'জেড' বা জাঙ্ক ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটি যে ১৩৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে, সেটিও সম্ভব হয়েছে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ছাড়ের কারণে। বর্তমানে ব্যাংকটির শেয়ার দর ফ্লোর প্রাইস ৩২.৬০ টাকায় আটকে আছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট বিনিয়োগ আয়ও আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ কমে ১ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
