রয়টার্সের বিশ্লেষণ: অর্থনীতি নিয়ে ট্রাম্পের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে দিয়েছে ইরান
আমেরিকা-ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া ছয় সপ্তাহের যুদ্ধও ইরানের ধর্মীয় শাসকদের ক্ষমতা থেকে সরাতে পারেনি বা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সব দাবি মানতে বাধ্য করতে পারেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী ও মিত্র দেশগুলোর কাছে এটি ট্রাম্পের একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। আর সেটা হচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ।
শুক্রবার ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সীমাবদ্ধতা কোথায়।
ট্রাম্প গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালান, যা তিনি তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি—বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি—দেখিয়ে ন্যায্যতা দেন। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি এবং তার জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায়—তিনি দ্রুত একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে চেষ্টা করছেন, যাতে দেশের ভেতরের চাপ কমানো যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও ইরান দেখিয়েছে, তারা অর্থনৈতিকভাবে এমন চাপ সৃষ্টি করতে পারে—যা ট্রাম্প প্রশাসন আগে অনুমান করতে পারেনি। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ইতিহাসের অন্যতম বড় ধাক্কা লেগেছে।
জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে, মন্দার ঝুঁকি
যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উদ্বেগ নিয়ে ট্রাম্প প্রায়ই উদাসীনতা দেখিয়েছেন।
তবে বাস্তবতা হলো, বিশ্বব্যাপী তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়, যার ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ইরানের। নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন থাকায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এর ওপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু জ্বালানির দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে দাম বাড়ার প্রভাব মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও পড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করায় সার্বিক পরিস্থিতি ঘিরে উদ্বেগ আরও গভীরতর হয়ে উঠেছে।
এবছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। বর্তমানে মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ—কংগ্রেসে অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল। কিন্তু, আসছে নির্বাচনে তা ধরে রাখাই এবার কঠিন হবে। ফলে ট্রাম্পের রিপাবলিকান সহকর্মীদের ওপরও অজনপ্রিয় এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার চাপ বাড়ছে।
ইরানের নেতৃত্ব এ বিষয়টি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। তাই হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনকে আলোচনার টেবিলে আনতে পেরেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও রাশিয়া এখান থেকে একটি শিক্ষা নিতে পারে। আর সেটা হচ্ছে, ক্ষমতার দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প সামরিক শক্তি প্রয়োগে আগ্রহ দেখালেও, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেই তিনি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে ঝোঁকেন।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা এবং কৌশলগত পরামর্শক সংস্থা–গ্লোবাল সিচুয়েশন রুমের প্রধান ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, "এই যুদ্ধে ট্রাম্প অর্থনৈতিক চাপ অনুভব করছেন, যা তার দুর্বলতার জায়গা।"
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে 'অস্থায়ী' জ্বালানি বাজারের সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে মার্কিনীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এজেন্ডা বাস্তবায়নে—ট্রাম্প যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন— সেখান থেকেও মনোযোগ হারায়নি।
তিনি বলেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একসঙ্গে একাধিক বিষয় সামলাতে পারেন।"
চাপের মুখে অবস্থান পরিবর্তন
৮ এপ্রিল ট্রাম্পের হঠাৎ করেই বিমান হামলা থেকে কূটনৈতিক পথে ঝোঁকার পেছনে আর্থিক বাজার ও তার 'মাগা' সমর্থক গোষ্ঠীর একটি অংশের চাপ কাজ করেছে।
এই অর্থনৈতিক চাপের একটি অংশ বহন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরা—যারা ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক—কারণ যুদ্ধের ডামাডোলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় বিমান ভাড়াও বেড়েছে।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে ট্রাম্প তার যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন কিনা, ২১ এপ্রিলের পর যুদ্ধবিরতি বাড়াবেন কিনা, নাকি আবার হামলা শুরু করবেন—তা এখনো অনিশ্চিত।
তবে ইসরায়েল-লেবাবনের মধ্যেকার ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালে, হরমুজ প্রণালি খোলা থাকবে– শুক্রবার ইরান এ ঘোষণা দেওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যায় এবং আর্থিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ট্রাম্প এটিকে তার সাফল্য হিসেবে দেখেছেন।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিকে নিরাপদ ঘোষণা করেন এবং ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য চুক্তির কথা তুলে ধরেন, যা তার ভাষায় শিগগিরই সম্পন্ন হবে এবং বেশিরভাগ শর্তই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকবে। তবে ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, উভয়পক্ষের মাঝে এখনো বেশ কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বার বার সতর্ক করেছেন, ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কয়েক মাসই কেবল নয়, বছরও লেগে যেতে পারে।
চুক্তির শর্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা
মূল প্রশ্ন হলো, সম্ভাব্য কোনো চুক্তি ট্রাম্প ঘোষিত লক্ষ্য—বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ বন্ধ করা—পূরণ করতে পারবে কিনা। তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই এমন কর্মসূচি থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় গত বছরের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যে হামলা চালায়–তাতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি মজুত ভূগর্ভে চাপা পড়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানান, সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ওই ইউরেনিয়াম উদ্ধার করে নিজ দেশে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে। তবে ইরান বলেছে, তাদের ভূখণ্ডের বাইরে কোথাও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের বিষয়ে আলোচনায় তারা রাজি হয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি 'রেডলাইন' বজায় রেখেছে।
অন্যদিকে যুদ্ধের শুরুতে ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানালেও ট্রাম্পের সেই আহ্বানে তেমন সাড়া দেয়নি ইরানের সিংহভাগ জনগণ।
ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো শুরুতে ট্রাম্পের এই যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছিল, কারণ তাদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা না করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এশিয়া বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি পোলিং বলেন, "এই যুদ্ধ দেখিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন অনেক সময় পরিণতি বিবেচনা না করেই অস্থিরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এটাই এখন মার্কিন মিত্রদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।"
ভুল হিসাবের খেসারত
২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার জ্বালানি খাতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সময় সতর্ক ছিলেন, কারণ এতে তেলের সরবরাহ কমে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দাম বাড়তে পারে।
কিন্তু সস্তা জ্বালানি ও কম মূল্যস্ফীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ট্রাম্প নিজেই এমন অভিযোগের প্রতি সংবেদনশীল যে তার নীতির কারণে দাম বাড়ছে। গত বছর চীনের পাল্টা পদক্ষেপের পর তিনি শুল্ক কমিয়ে দেন—যা এর একটি উদাহরণ।
যেমনভাবে বাণিজ্য যুদ্ধে বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া তিনি ভুলভাবে অনুমান করেছিলেন, তেমনি ইরানের সামরিক পাল্টা জবাব অর্থনৈতিকভাবে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে তাও তিনি ভুল হিসাব করেছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দিয়ে ইরান সেই প্রভাব দেখিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প ভেবেছিলেন এই যুদ্ধটি জানুয়ারির ভেনেজুয়েলায় দ্রুত অভিযান বা জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মতো সীমিত পরিসরের হবে।
কিন্তু এবার এর প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো এশীয় মিত্ররা এখন মনে করতে পারে যে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী ট্রাম্প তাদের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে কম গুরুত্ব দিতে পারেন।
তাই সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য—যেমন চীনের তাইওয়ান দখলের চেষ্টা—এই দেশগুলো নিজেদের প্রস্তুতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
ইউরোপীয় দেশগুলোও এই যুদ্ধে তাদের ওপর চাপানো অর্থনৈতিক বোঝা নিয়ে বিরক্ত। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ট্রাম্প কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবেন– সেটা নিয়েও তারা শঙ্কায় রয়েছে।
এদিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো দ্রুত যুদ্ধের সমাপ্তি চায়, তবে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো চুক্তি হলে তারা অসন্তুষ্ট হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, "এই সংঘাতের অবসান এমনভাবে হওয়া উচিত নয়—যাতে অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়।"
কিছু প্রভাবশালী ভিন্নমত থাকলেও ট্রাম্পের বেশিরভাগ 'মাগা' সমর্থক এখনো তার পাশে রয়েছে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হারানো সমর্থন পুনরুদ্ধারে তিনি কতটা সফল হবেন—বিশেষ করে স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে—তা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে।
অ্যারিজোনাভিত্তিক রাজনৈতিক কৌশলবিদ চাক কফলিন বলেন, "তিনি (ট্রাম্প) জানেন, তার 'মাগা' সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে দেশের বড় একটি অংশ—এমনকি মাগা সমর্থকদের ভেতরেও কিছু মানুষ তার এই পদক্ষেপের (ইরান যুদ্ধের) কঠোর বিরোধিতা করছে, এবং এর মূল্য তাকে দিতেই হবে।"
