নিজের গ্রামকে পরিচ্ছন্ন রাখতে কাজ করছেন ইমাম মাহবুবুর রহমান
মাহবুবুর রহমান এখনও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে তার প্রথম ধর্মীয় বয়ানটি মনে রেখেছেন। তার গ্রামের মসজিদে জনাকীর্ণ এক জামাতের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি পাপ বা মুক্তির কথা বলেননি, বরং সাবান এবং স্যানিটেশনের কথা বলেন। কিছু লোক বিস্ময়ে তাকাতাকি করছিল। অন্যরা চুপচাপ হেসেছিল। কিন্তু মাহবুবুর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি জানতেন মিম্বর থেকে দেওয়া বার্তার শক্তি অন্যরকম।
মাহবুবুর যখন বাগেরহাটের রামপালের একটি ছোট মসজিদের ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান তখন তার বয়স মাত্র ২৪ বছর। তার বিশ্বাস তাকে শিখিয়েছিল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক। তিনি সেই শিক্ষাকে কাজে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন।
মাহবুবুর বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এমন এক পরিবারে বেড়ে ওঠেন যারা আর্থিকভাবে অন্যান্য পরিবারের তুলনায় সচ্ছল ছিল। তার বাবা-মা ছিলেন গণ্যমান্য ও দয়াশীল, বন্যা বা ঘুর্ণিঝড়ের পর প্রায়ই প্রতিবেশীদের খাবার এবং টাকা দিয়ে সহায়তা করতেন। তাদের কাছ থেকে মাহবুবুর শিখেছিলেন ধর্ম মানে সেবা।
বাগেরহাট তখন ভিন্ন ছিল। রাস্তাঘাট বেশিরভাগই কাঁচা ছিল, বিদ্যুৎ ছিল না এবং পরিষ্কার পানি ছিল বিলাসিতা। প্রতি বছর গ্রামে কলেরা এবং ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ত। বেশিরভাগ পরিবার গোসল এবং ধোয়ার জন্য পুকুরের পানি ব্যবহার করত, তারা জানত না যে এই পানিতে নানা ধরনের রোগ-জীবাণু থাকে।
মাহবুবুর বলেন, আমি ইচ্ছে করলে দিনে চারবার খেতে পারতাম। কিন্তু আমার অনেক প্রতিবেশীর পক্ষে একবেলাও খাওয়া সম্ভব ছিল না। এটা আমার ভালো লাগত না।
তার শৈশবের স্বপ্ন ছিল একজন ইমাম হওয়া, যাকে মানুষ বিশ্বাস করবে এবং তার কথা মান্য করবে। মাহবুবুর একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন, তারপর ঢাকার একটি নামী ইসলামি স্কুলে ভর্তি হন। বাগেরহাটের এক ছেলের কাছে এটা অনেকটা স্বপ্নের মতো মনে হত। কয়েক বছর পর, সে তার এলাকার লোকজনকে নেতৃত্ব দিতে বাড়ি ফিরে আসেন। মাহবুবুর নিজেকে শুধু ধর্মীয় বাণী প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি।
মাহবুবুরের সামনে সেই সুযোগ আসে যখন ব্র্যাক তার এলাকায় তাদের পানি, স্যানিটেশন এবং হাইজিন (ওয়াশ) কর্মসূচি চালু করে। খুব কম বাড়িতেই টয়লেট বা হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছিল। দূষিত পুকুর এবং নলকূপের কারণে অসুস্থতা স্বাভাবিক ঘটনায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ব্র্যাক যখন প্রচারণার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য স্থানীয় অংশীদারদের খুঁজছিল, মাহবুবুর তাৎক্ষণিকভাবে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
মাহবুবুর কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে যোগদান করেন, কিন্তু তার দৃঢ় মনোভাবের কারণে দ্রুতই তিনি সভাপতি হয়ে যান। গ্রামবাসী তার আন্তরিকতা এবং ধর্মীয় উপদেশ বিশ্বাস করত। তিনি শুক্রবারের নামাজে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে শিক্ষা দিতে শুরু করেন। মানুষকে কেবল অজুর সময় নয়, খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পরে হাত ধোয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
মাহবুবুর বলেন, লোকজন ইমামের বলা কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। আমি যদি নিজের বয়ানকে কারও জীবন বাঁচাতে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে সেটাও এক ধরনেরর ইবাদত।
মাহবুবুর ব্র্যাক কর্মীদের সঙ্গে মিলে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করেছিলেন। এই পরিবারগুলোর সবচেয়ে বেশি টয়লেটের প্রয়োজন ছিল। মাহবুবুর র্যালির নেতৃত্ব দিতেন, লিফলেট বিতরণ করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নলকূপ ও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে স্থানীয় কর্মকর্তাদের রাজি করান। প্রতিটি নতুন টয়লেট স্থাপন ছিল মানবিক মর্যাদা ও স্বাস্থ্যের দিক থেকে মাহবুবুরের জন্য সাফল্য।
এসব পরিবর্তন সহজসাধ্য ছিল না। স্যানিটেশনের প্রতি মাহবুবুরের মনোযোগকে ধর্ম থেকে বিচ্যুতি বলে কিছু রক্ষণশীল গ্রামবাসী বলাবলি করছিল। অন্যরা ধর্মীয় বয়ানে টয়লেট বিষয়ে কথা বলায় তাকে নিয়ে উপহাস করেছিল। এমনকি মাহবুবুর সময় নষ্ট করছেন বলে তার বাবাকেও সতর্ক করা হয়েছিল।
তবুও মাহবুবুর দমে যাননি। যখন গ্রামে অসুস্থতা কমে গেল এবং শিশুদের ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া বন্ধ হয়ে গেল, তখন এই সমালোচনাকারীরাই সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসলেন। সংশয় সমর্থনে পরিণত হল এবং পরিষ্কার পানি ও পরিচ্ছন্ন হাতের প্রতি লোকজন আস্থা খুঁজে পেল।
দীর্ঘ সময় ধরে একজন ইমাম হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মাহবুবুর মসজিদ ও কমিউনিটির মধ্যে সেতুবন্ধন হয়ে ওঠেন। কলেরা এবং টাইফয়েডের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে লড়াইয়ের জন্য তিনি ইমাম, চিকিৎসক ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে একত্রিত করেন। তিনি ছোট ব্যবসা উন্নয়নের ওপর প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন, যাতে পরিবারগুলোর আয় বাড়ে এবং স্যানিটেশন খাতে খরচ করতে পারে। মাহবুবুর বলেন, শুধু বিশ্বাসে পেট ভরে না। তবে এটি ক্ষুধার্তদের প্রতি যত্নশীল হতে শেখাতে পারে।
চল্লিশ বছর বয়সী মাহবুবুর এখনও রামপালে থাকেন। তার কাজ মসজিদের সীমানার বাইরেও বিস্তৃত। তিনি উপজেলা জুড়ে স্বাস্থ্যবিধি দেখভালে সাহায্য করেন, ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন এবং তরুণ ইমামদের পরামর্শ দান অব্যাহত রেখেছেন, যারা তাদের নিজ নিজ গ্রামে মাহবুবুরের মতো পরিচ্ছন্নতার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন।
মাঝে মাঝে ইউনিয়ন পরিষদের কক্ষগুলোর চাবি তাকে দেওয়া হয়। তখন তার মনে পড়ে সেই ছেলেটির কথা, যে একসময় কেবল ধর্মপ্রচারের স্বপ্ন দেখত। সে বুঝতে পারে, সেই স্বপ্ন এমনভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, যা সে কখনও কল্পনাও করেনি। মাহবুবুর বলেন, মানুষ প্রথমে আমার ওপর আস্থা রেখেছিল। তারপর তারা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর আস্থা রেখেছিল। সেই আস্থাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
ধর্মীয় উপদেশ, কমিটিকে কাজ এবং ধারাবাহিকতার মাধ্যমে মাহবুবুর রহমান বিশ্বাসকে কর্মে রূপান্তরিত করেছিলেন। একসময় রোগ-বালাইয়ের জন্য পরিচিত জায়গাকে তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও আস্থা উভয়ই পুনরুদ্ধার করতে সহায়তা করেছেন।
