অস্ত্রের মজুতে টান, রেশনিং করে ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করছে ইসরায়েল—লক্ষ্যভেদ করছে ইরানের মিসাইল
চার সপ্তাহ ধরে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের পাল্টা জবাবে প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল ছুড়ছে ইরান। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের ভান্ডারে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক মিসাইল-প্রতিরোধী অস্ত্র বা 'ইন্টারসেপ্টর' ব্যবহারে রেশনিং শুরু করেছে ইসরায়েল। সেগুলোর মজুত ধরে রাখতেই ব্যবহারে রাশ টেনেছে তারা।
সম্প্রতি দিমোনা ও আরাদ শহরে সরাসরি আঘাত হেনেছে ইরানের দুটি ব্যালিস্টিক মিসাইল। তুলনায় কিছুটা কম শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ওই হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল ইসরায়েল। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
বৃহস্পতিবারও ইসরায়েলজুড়ে হামলা হয়েছে। একাধিক জায়গায় আছড়ে পড়েছে মিসাইল, যা স্থানীয়দের মধ্যে যথেষ্ট আতঙ্ক তৈরি করেছে।
চলমান যুদ্ধে এবং গত বছরের জুনে ইরানের সঙ্গে সঙ্ঘাতের সময়ে ব্যালিস্টিক মিসাইল রুখতে নিজেদের সেরা 'অ্যারো' ইন্টারসেপ্টরের ব্যাপক ব্যবহার করেছিল ইসরায়েল। কিন্তু সম্প্রতি তারা ডেভিডস স্লিং-এর মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নত সংস্করণের উপর নির্ভর করছে। মূলত রকেট ও স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংস করতেই এটি তৈরি হয়েছিল। এখন অপেক্ষাকৃত বড় ও দূরপাল্লার মিসাইল ঠেকাতে সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এতে সব ক্ষেত্রে সাফল্য মিলছে না।
ইরানের ড্রোন ও মিসাইল বিপুল পরিমাণে তৈরি করা যায়। সেগুলোর হামলা ঠেকাতে গিয়ে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ও মূল্যবান অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে। এসবের উৎপাদনও সময়সাপেক্ষ। কম ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র ব্যবহারের এই সিদ্ধান্ত বুঝিয়ে দিচ্ছে, এ অঞ্চলে সামরিক বাহিনীগুলো কার্যত কতখানি চাপের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের মিসাইল ছোড়ার ক্ষমতা কিছুটা কমেছে। তবে তা পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে এ যুদ্ধ এখন একপ্রকার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে দেখার বিষয় হলো—কার সমরাস্ত্র আগে ফুরিয়ে যায়।
মার্কিন সংস্থা মিসাইল ডিফেন্স অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্স-এর সিনিয়র বিশ্লেষক তাল ইনবার বলেন, 'সব ধরনের ইন্টারসেপ্টরের সংখ্যাই সীমিত। লড়াই যত এগোচ্ছে, মজুত অস্ত্রের পরিমাণ ততই কমছে। ফলে আগামী দিনে কোন অস্ত্র কোথায় ব্যবহার করা হবে, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হিসাব করতে হচ্ছে।'
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের দিকে ৪০০-রও বেশি মিসাইল ও শয়ে শয়ে ড্রোন ছুড়েছে ইরান। প্রথমদিকে হামলার তীব্রতা বেশি থাকলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিজবুল্লাহর আক্রমণ। রোজই ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ডজনখানেক গোলাবর্ষণ করছে তারা।
ধেয়ে আসা প্রতিটি মিসাইলের ক্ষেত্রেই ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে—মিসাইলটি কোনো ফাঁকা জায়গায় পড়তে দেওয়া হবে, নাকি মাঝপথে ধ্বংস করা হবে। ধ্বংস করতে হলে কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজে লাগানো হবে? আগামী দিনের সম্ভাব্য বড় বিপদের মোকাবিলায় ভান্ডারে যথেষ্ট অস্ত্র মজুত থাকছে কি না, তা-ও প্রতিনিয়ত মাথায় রাখতে হচ্ছে তাদের।
ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহুমাত্রিক। আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি এই ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের হামলা রুখতে ভিন্ন ভিন্ন অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়।
এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একদম প্রাথমিক স্তরে রয়েছে আয়রন ডোম। স্বল্প পাল্লার রকেট ধ্বংস করতে এটি ব্যবহৃত হয়। এর এক-একটি ইন্টারসেপ্টরের পেছনে খরচ হাজার হাজার ডলার। এর পরেই রয়েছে ডেভিডস স্লিং। দূরপাল্লার রকেট, ট্যাকটিকাল ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল ঠেকাতে এটি ব্যবহৃত হয়।
প্রতিরক্ষা বলয়ের উপরের স্তরে রয়েছে অ্যারো থ্রি। বায়ুমণ্ডলের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলকে ধ্বংস করতে পারে এটি। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা মিসাইল-প্রতিরোধী অস্ত্র হিসেবে এটি পরিচিত। মাঝারি থেকে দূরপাল্লার মিসাইল হামলা রুখতে এর আগের সংস্করণ অ্যারো টু-ও এখনও ব্যবহার করছে ইসরায়েলি সেনা।
গত জুনের যুদ্ধে অ্যারো ইন্টারসেপ্টরের মজুতে টান পড়েছিল। সেই ঘাটতি নিয়েই বর্তমান আগ্রাসনের নেমেছে ইসরায়েল।
রাডারসহ বিভিন্ন সেন্সরের মাধ্যমে ধেয়ে আসা গোলা বা মিসাইলের গতিপথ আগে থেকেই আন্দাজ করতে পারে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো। সেই অনুযায়ী কোন ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা উচিত, সেনাকে সেই পরামর্শও দেয় এই ব্যবস্থা।
ইসরায়েল এখন নিজেদের বিকল্প বাড়াতে চাইছে। তাই সফটওয়্যর আপডেটের মতো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রাথমিক স্তরের ইন্টারসেপ্টরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে, যাতে সেগুলোও দূরপাল্লার মিসাইলের মোকাবিলা করতে পারে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করার ঠিক আগেই ডেভিডস স্লিংয়ের পাল্লা বাড়াতে দফায় দফায় তার পরীক্ষানিরীক্ষা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করা হয়েছিল।
ইসরায়েলের বিমান ও মিসাইল প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক কমান্ডার ও বর্তমানে রিজার্ভ ফোর্সের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রান কোচাভ বলেন, 'আমরা এই প্রতিরক্ষাকে আরও উচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। লক্ষ্য হলো, মাটি থেকে যতটা সম্ভব উঁচুতে হামলা প্রতিহত করা। কিছু ক্ষেত্রে এটি ভাল কাজ করছে ঠিকই। কিন্তু অন্য কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে।'
প্রায় ৪৫ মাইল পাল্লার রকেট ধ্বংস করার জন্য প্রথম তৈরি হয়েছিল আয়রন ডোম। বর্তমানে তারও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে। এখন দূরপাল্লার রকেট, ড্রোন ও মিসাইল ধ্বংস করতেও সেটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
কোচাভ বলেন, 'এখন এটি কয়েকশো কিলোমিটার দূরের রকেট এবং ইউএভিও আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম।'
অস্ত্রের মজুত নিয়ে ইসরায়েলের মতো একই ধরনের চাপে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোও। তারা আমেরিকার কাছে ইন্টারসেপ্টর চেয়েছে। অস্ত্র-ঘাটতির এই আশঙ্কা দূর করতে আমেরিকা ওই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক ড্রোন-প্রতিরোধী ব্যবস্থা পাঠিয়েছে। এই ব্যবস্থা ইরানের শাহেদ ড্রোনের মতো ধীর গতির ও নিচু দিয়ে উড়ে আসা বিপদকে ধ্বংস করতে পারে।
কিন্তু বিশ্বজুড়েই এখন অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। মিত্র দেশগুলোর সুরক্ষায় ব্যবহৃত আমেরিকার থাড ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরের মজুত ভান্ডারেও টান পড়েছে। একদিকে বিশ্বজুড়ে মজুত অস্ত্রের ঘাটতি, অন্যদিকে দীর্ঘ উৎপাদন-প্রক্রিয়াই এর মূল কারণ। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, জর্ডানে মোতায়েন করা অন্তত একটি থাড ব্যবস্থা ইরানের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্ট-এর পরিচালক টম কারাকো বলেন, 'গত কয়েক সপ্তাহে আমরা এমন পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করেছি, যা তৈরি করতে বহু বছর সময় লাগে। আসন্ন অভিযানগুলোর কথা মাথায় রেখে আমরা যদি অস্ত্রের উৎপাদন সর্বোচ্চ মাত্রায়ও বাড়িয়ে দিই, তবু এই কদিনে যা খরচ হয়েছে, তা পূরণ করতে বহু বছর লেগে যাবে।'
বিশ্লেষকরা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এই মডেল টেকসই নয়। বর্তমানে যেভাবে অস্ত্রের ঘাটতি বাড়ছে, তার প্রভাব ইউক্রেনের মতো অন্যান্য রণাঙ্গনে লড়াইরত দেশগুলোর উপরেও পড়তে বাধ্য।
কারাকো বলেন, 'এগুলো অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য জাতীয় সম্পদ। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের জন্যও আমাদের এসবের প্রয়োজন রয়েছে। তাই এভাবে যথেচ্ছ অস্ত্র খরচ আমরা কিছুতেই চালিয়ে যেতে পারি না।'
