ইরানের হামলায় ‘বসবাসের অযোগ্য’ ১৩ মার্কিন ঘাঁটি; হোটেল, অস্থায়ী আবাসে সেনারা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা বোমা হামলা চালিয়েছে ইরান। এর ফলে অনেক মার্কিন সেনাকে তাদের নির্ধারিত ঘাঁটি ছেড়ে এই অঞ্চলের বিভিন্ন হোটেল ও অফিস ভবনে আশ্রয় নিতে হয়েছে। সামরিক বাহিনীর সদস্য ও মার্কিন কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমানের পাইলট এবং বিমান পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ক্রুরা ছাড়া স্থলবাহিনীর বড় একটি অংশ মূলত দূরবর্তী অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই ছড়িয়ে পড়া মার্কিন সেনাদের খুঁজে বের করার ঘোষণা দিয়েছে এবং তাদের নতুন অবস্থানগুলোর খবর জানাতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এই হুমকি সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে পেন্টাগনের সামরিক অভিযান থেমে নেই। ইরান যুদ্ধ এখন চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করেছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ঘোষণা করেছেন, 'এ পর্যন্ত আমরা ইরানজুড়ে তাদের সামরিক অবকাঠামোর ৭ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছি।' সংবাদ সম্মেলনে নিজের নিয়মিত বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে তিনি বলেন, 'গতকালের মতো আজকেও আমরা এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় হামলাটি চালাব।'
তবে সেনাদের এভাবে অস্থায়ী বা বিকল্প অবস্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি ইরান যুদ্ধের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। কেন্দ্রীয় কমান্ড তাদের মধ্যে কয়েক হাজার সেনাকে বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নিয়েছে, এমনকি অনেককে ইউরোপেও পাঠানো হয়েছে। তবে বিশাল একটি অংশ এখনও মধ্যপ্রাচ্যেই অবস্থান করছেন, যদিও তারা তাদের মূল ঘাঁটিগুলোতে নেই।
বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলে যুদ্ধ পরিচালনা করা এখন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর বিশেষ অভিযানের অবসরপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ মাস্টার সার্জেন্ট ওয়েস জে. ব্রায়ান্ট বলেন, 'হ্যাঁ, আমাদের দ্রুত ও অস্থায়ী অপারেশন সেন্টার তৈরি করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু এতে নিশ্চিতভাবেই সক্ষমতা কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি চাইলেই একটি হোটেলের ছাদে সব ধরণের ভারী সরঞ্জাম স্থাপন করতে পারবেন না। এগুলোর অনেকগুলোই বহন করা বা পরিচালনা করা বেশ জটিল।'
তবে একজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেনারা বেসামরিক হোটেলের ছাদে বসে কাজ করছেন না।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইরান অত্যন্ত কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তারা কেবল মার্কিন ঘাঁটি নয়, বরং এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত দূতাবাস এবং তেল ও গ্যাস অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
নিজেদের সর্বোচ্চ নেতা ও ডজনখানেক শীর্ষ নেতা নিহত হওয়ার পর ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। একই সঙ্গে তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, যাতে এই যুদ্ধের প্রভাব পুরো বিশ্বের মানুষ অনুভব করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান সৈন্যদের ব্যবহৃত ১৩টি সামরিক ঘাঁটির অনেকগুলোই এখন বসবাসের প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ইরানের প্রতিবেশী দেশ কুয়েতের ঘাঁটিগুলো সম্ভবত সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শোয়াইবা বন্দরে একটি হামলায় সেনাবাহিনীর একটি কৌশলগত অপারেশন সেন্টার ধ্বংস হয়েছে এবং সেখানে ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটিতেও আঘাত হেনেছে, যার ফলে বিমানের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন সেনা সদস্য আহত হয়েছেন। এছাড়া ক্যাম্প বুহরিং-এর রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাতারে অবস্থিত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের আঞ্চলিক বিমান সদর দপ্তর আল উদাইদ ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে ইরান, এতে একটি আগাম সতর্কবার্তা প্রদানকারী রাডার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাহরাইনে ইরানের একটি 'অ্যাটাক ড্রোন' মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরের যোগাযোগ সরঞ্জামে আঘাত হেনেছে।
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বেশ কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরাকের এরবিলে একটি বিলাসবহুল হোটেলে একঝাঁক ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছিল ইরান-সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। ইরানি কর্মকর্তারা এখন মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে এই বলে অভিযোগ তুলছেন যে, আমেরিকান সেনাদের হোটেলে রেখে তারা বেসামরিক সাধারণ মানুষকে 'মানব ঢাল' হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখা ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে একটি বার্তা দিয়েছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, ওই বার্তায় বলা হয়েছে, 'আমরা আমেরিকানদের শনাক্ত করতে এবং তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে বাধ্য হচ্ছি। তাই তাদের হোটেলে আশ্রয় না দেওয়া এবং তাদের অবস্থান থেকে দূরে থাকাই মঙ্গলজনক।'
বার্তায় আরও বলা হয়, 'আমেরিকান সন্ত্রাসীদের লুকানোর জায়গাগুলো সঠিকভাবে আমাদের জানানো এবং টেলিগ্রামের মাধ্যমে সেই তথ্য পাঠানো আপনাদের ইসলামি দায়িত্ব।'
গত সপ্তাহে পেন্টাগনের এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বীকার করেছেন যে, ব্যাপক বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরানিদের 'এখনো কিছু সক্ষমতা অবশিষ্ট আছে।'
জেনারেল কেইন জানান, পুরো অঞ্চলজুড়ে মোতায়েন করা 'বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা'র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সৈন্য ও স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে, তবে পেন্টাগন এ অঞ্চলের প্রতিরক্ষা আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে।
পেন্টাগনের জন্য একটি বড় সমস্যা হলো ইরাক ও আফগানিস্তানে গত দুই দশকের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। ওই যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত আকাশপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল এবং বর্তমান সংঘাতের ফ্রন্ট লাইনের খুব কাছাকাছি অনেক ঘাঁটি ও সদর দপ্তর তৈরি করেছিল।
আফগানিস্তানের বাগরাম বিমান ঘাঁটি বা বাগদাদের মার্কিন দূতাবাস অতীতেও অনেকবার আত্মঘাতী হামলা বা রকেট হামলার শিকার হয়েছে। কিন্তু তালেবান বা ইরাকি মিলিশিয়াদের কারোরই ইরানের মতো শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা ছিল না।
বিশেষ করে ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র সেখানে এবং কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব ও কাতারে বড় বড় ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের সঙ্গে চলমান এই যুদ্ধ এখন সেই সব ঘাঁটিগুলোকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে—যার ফলে মার্কিন সেনারা সেখানে এখন আর দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে বা কাজ করতে পারছেন না।
কিছু সামরিক কর্মকর্তার মতে, উন্নত পরিকল্পনার এই অভাব মূলত ইরানের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভুল হিসাব-নিকাশেরই প্রতিফলন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন দূতাবাসগুলোতে কর্মী সংখ্যা কমায়নি কিংবা জরুরি নয় এমন সরকারি কর্মীদের পরিবারসহ সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেয়নি।
এমনকি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের নাগরিকদের এই অঞ্চল এড়িয়ে চলার কোনো সতর্কবার্তাও দেয়নি।
সামরিক অভিযানের বিষয়ে অবগত দুই সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির কমান্ড সেন্টারগুলোর ছাদ যথেষ্ট শক্তিশালী বা সুরক্ষিত ছিল না। সেখানে এক হামলায় একজন মার্কিন সেনা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন।
সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এই অঞ্চলে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি বা অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়ার আগেই মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানগুলোকে তড়িঘড়ি করে দিন-রাত চলমান এই যুদ্ধে নামানো হয়েছিল। চলতি মাসে দুটি মার্কিন কেসি-১৩৫ ট্যাংকার বিমানের সংঘর্ষে ছয়জন সেনা সদস্য নিহত হন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই দুর্ঘটনাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
বিমানবাহিনীর সাবেক বিশেষ বিশেষজ্ঞ সার্জেন্ট ব্রায়ান্ট উল্লেখ করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি বড় দক্ষতা হলো 'ডিসেন্ট্রালাইজড এক্সিকিউশন' [কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে ভিন্ন জায়গা থেকে কাজ সম্পাদন করা], অর্থাৎ অনেক দূর থেকে বা প্রধান কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা অবস্থায়ও কাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা।
তিনি বলেন, 'আপনি যদি সাপের মাথা কেটে ফেলেন, তবুও আমাদের শেষ সৈন্য পর্যন্ত অপারেশন চালিয়ে যাবে।' তবে তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, এমন পরিস্থিতিতে নিশ্চিতভাবেই কিছু না কিছু সক্ষমতা হারিয়ে যায়।
