একাত্তর: কার্টুন যখন হাতিয়ার
একাত্তরের এক নম্বর ভিলেন ইয়াহিয়া খান। তারপরের অবস্থান জুলফিকার আলি ভুট্টোর। তাদের মদদ দেওয়ায় আমেরিকার কিসিঞ্জার, নিক্সন কিংবা চীনের মাও সে তুংয়ের নামও ওঠে খলনায়কের খাতায়। সে সময় কার্টুনিস্টদের হাসি-তামাশার পাত্র হয়েছিল জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা তথা বিশ্ববিবেকও। কারণ, তারা আর্তের চিৎকার শুনেও শোনেনি, মৃতের মিছিল দেখেও দেখেনি; শরণার্থীদের কষ্ট তাদের স্পর্শ করেনি। রাজনৈতিক কার্টুন সাধারণত বিদ্রুপাত্মক বা হাস্যরসাত্মক হয়। খলনায়ক ও তার দোসররাই এর প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠেন।
কার্টুনের ধাক্কা
কার্টুনও হয়ে উঠেছিল একাত্তরের হাতিয়ার। ভারত যেহেতু আমাদের প্রধান মিত্রদেশ ছিল, তাই সে দেশের পত্রপত্রিকায় কার্টুন প্রকাশিত হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে আছে দৈনিক আনন্দবাজার, অমৃতবাজার, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য স্টেটসম্যান, হিন্দুস্তান টাইমস, হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড, দৈনিক যুগান্তর, সাপ্তাহিক দেশ, ব্লিৎজ, হিম্মত ও দ্য পাইওনিয়ার। এ ছাড়া মুক্তিকামী বাঙালিদের প্রকাশিত বিপ্লবী বাংলাদেশ, জাগ্রত বাংলা, জয় বাংলা এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসীদের প্রকাশিত 'বাংলাদেশ নিউজলেটার'-এও বেশ কিছু কার্টুন প্রকাশিত হয়।
কার্টুন শব্দের অর্থ ব্যঙ্গচিত্র। ক্ষমতাবানের চরিত্র বা সমাজের অসংগতি অল্প কথায় ফুটিয়ে তুলতে কার্টুন দারুণ কার্যকর। বড়সড় একটি সম্পাদকীয় লেখা যতটা ধাক্কা দিতে পারে, কখনো কখনো একটি কার্টুন তার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। ১৯৭১ সালের মে মাসে সাপ্তাহিক 'জয়বাংলা'য় প্রকাশিত 'এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে' শিরোনামে শিল্পী কামরুল হাসানের আঁকা দানবীয় ইয়াহিয়ার সেই প্রতিকৃতি তখন রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। আজও সেই ক্যারিকেচার যে কোনো দুঃশাসনবিরোধী আন্দোলনে সাহস সঞ্চার করে।
বিদ্রুপাত্মক ব্রিটিশ সাপ্তাহিকী 'পাঞ্চ'-এর সূচনাকাল ১৮৪১ সাল। পরের দশ বছরের মধ্যে কার্টুন শব্দটিকে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তোলে এই ম্যাগাজিন। ২০০২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬০ বছর আয়ু পেয়েছিল পাঞ্চ। এরও আগে ১৮৩২ সালে ফ্রান্সে কার্টুন ম্যাগাজিন 'লে সারিভারি' প্রথম প্রকাশিত হয়, যা টিকে ছিল ১০০ বছরের বেশি। এই দুটিরই ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল 'ইন্ডিয়ান পাঞ্চ' ও 'ইন্ডিয়ান সারিভারি' নামে।
ইয়াহিয়া: একাত্তরের হিটলার
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পত্রপত্রিকার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। কার্টুনের জনপ্রিয়তাও বাড়ে পাল্লা দিয়ে। তবে এর ব্যাপক প্রসার ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। এর প্রয়োজনীয়তা তখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভূত হয়। স্বাভাবিকভাবেই তখন কার্টুনের প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠেন হিটলার। হিটলার মানুষের হাড় চিবোচ্ছেন বা অগণিত কবরের সামনে দাঁড়িয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন—এমন অনেক কার্টুন ইংল্যান্ড ও আমেরিকার পত্রপত্রিকায় আঁকা হয়েছে। একাত্তরে ইয়াহিয়াকেও একাধিকবার হিটলারের মতো করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমসের সুধীর দারের একটি কার্টুনের কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। সেখানে দেখা যায়, ইয়াহিয়া অগণিত লাশের এক বিরাট স্তূপের ওপর বসে মাইকে ঘোষণা দিচ্ছেন—'বাংলাদেশ এখন স্বাধীন, সবাইকে স্বাগতম।'
১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত সুধীর দারের আরেকটি কার্টুনে দেখা যায়, ইয়াহিয়া বাঙালির রক্ত-মাংস দিয়ে ভুরিভোজ সেরে পাইপ টানতে টানতে বলছেন, 'হ্যাঁ, এখন ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসা যেতে পারে।' পীর আলির আঁকা কার্টুনেও দেখা গেছে, মানুষের হাড় দিয়ে উঁচু ঢিবি তৈরি করে তার ওপর টেলিস্কোপ বসিয়ে ইয়াহিয়া প্রতিপক্ষকে খুঁজছেন। এই কার্টুনটি ১৯৭১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সাপ্তাহিক 'জয় বাংলা'য় প্রকাশিত হয়েছিল।
ইয়াহিয়া ছিলেন এক জাদরেল পাঠান। দিল্লি বিজয়ী পারস্য সম্রাট নাদির শাহের এক সেনাপতির উত্তরপুরুষ ছিলেন তিনি। তার অনেক বান্ধবী ছিল; তিনি শেকসপিয়ার আর বায়রনের ভক্তও ছিলেন। অথচ তার আদেশে একাত্তরে লাখ লাখ বাঙালি প্রাণ হারায়। এমনকি যখন পাকিস্তানের ভাঙন নিশ্চিত, তখনও তিনি ছিলেন মদমত্ত। এমন উন্মত্ত জীবনধারার অধিকারী ব্যক্তি কার্টুনিস্টদের সহজ লক্ষ্যবস্তু হওয়াটাই স্বাভাবিক, যেমনটি হিটলারের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল।
ক্ষমতা হাতে নিয়ে ইয়াহিয়া বলেছিলেন, 'কোনো অরাজকতা সইব না, যে যার জায়গায় ফিরে যাও।' উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের চাপ সইতে না পেরে আইয়ুব খান কার্যত ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়েছিলেন। উত্তরাধিকারী হিসেবে ইয়াহিয়া পেয়েছিলেন এক 'আগুনের সিংহাসন', যেহেতু পূর্ব পাকিস্তান তখন প্রতিবাদ আর প্রতিরোধে ছিল অগ্নিগর্ভ। এই উত্তাপ সইতে পারছিলেন না ইয়াহিয়া। ফলে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সমগ্র পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬২টি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে, যার মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টোর দল পিপিপি (পাকিস্তান পিপলস পার্টি) পায় ৮৬টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫১টি আসন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানোর কথা ছিল। কিন্তু ভুট্টো তা হতে দিতে রাজি ছিলেন না।
ইধার হাম, উধার তুম
পিপিপি যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল, তাই ভুট্টো বারবার বলছিলেন, 'ইধার হাম, উধার তুম'। অর্থাৎ পশ্চিমে আমি আর পুবে তুমি। কিন্তু তার এই অন্যায় দাবি বাঙালি মানবে কেন? ইয়াহিয়াও তার পূর্বসূরিদের মতো ক্ষমতা পূর্ব পাকিস্তানিদের হাতে ছাড়তে চাইছিলেন না, তার ওপর ছিল ভুট্টোর চাপ। একাত্তরের ১৩ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া ঘোষণা করেন, ঢাকায় সংসদের অধিবেশন বসবে ৩ মার্চ। তবে একই মাসের ২২ তারিখে ইয়াহিয়া তার সিনিয়র জেনারেলদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান—বাঙালির কাছে কোনোভাবেই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না।
পূর্বঘোষিত অধিবেশনও স্থগিত করা হয়। এর মধ্যেই ইয়াহিয়া ঢাকায় সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে থাকেন এবং গণহত্যার নকশা তৈরি করেন। মার্চ মাসে ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিবের শেষ মুহূর্তের সংলাপ যেন ফলপ্রসূ না হয়, সে জন্য ভুট্টো তার কূটচাল চালিয়ে যান। ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক ভেঙে যাওয়ার পরপরই ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেও জুলফিকার আলি ভুট্টো ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত চালিয়ে গেছেন বিরতিহীনভাবে।
সিন্ধুর বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন শাহনেওয়াজ ভুট্টো। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ আমলের নামী রাজনীতিবিদ। তার বড় ছেলে এই জুলফিকার আলি ভুট্টো। তিনি বার্কলের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে পড়েছেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জীবন ও কর্ম তাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করত; নেপোলিয়নই ছিল তার আদর্শ। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষে তিনি ইংল্যান্ডে অক্সফোর্ড থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানে ফিরে করাচিতে আইন পেশা শুরু করেন।
উচ্চাভিলাষী ভুট্টো পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আসনে বসার স্বপ্ন কখনো ছাড়েননি। একাত্তরে সেই সুযোগ তার সামনে আসে এবং ইয়াহিয়ার পতন ত্বরান্বিত করে তিনি তা কাজে লাগান। পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ মানুষের মাথার খুলি দিয়ে তৈরি করেন নিজের মসনদ। তাই ইয়াহিয়ার সঙ্গে ভুট্টোও কার্টুনিস্টদের সহজ নিশানায় পরিণত হন।
যেমন 'ভুট্টোর ঢাকায় আগমন' শীর্ষক কার্টুনে দেখা যায়, শেখ মুজিবের সামনে ইয়াহিয়া পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আর তার পেছনে ভুট্টো পিস্তল উঁচিয়ে ইয়াহিয়াকে বলছেন, 'বেফাঁস কিছু বলবেন না।' ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ 'দ্য স্টেটসম্যান'-এ প্রকাশিত এই কার্টুনটি এঁকেছিলেন অমল চক্রবর্তী।
আবু অন বাংলাদেশ
আবু আব্রাহামের একটি কার্টুন 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এ প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল। এতে দেখা যায়, ভুট্টোকে ইয়াহিয়া বলছেন, 'এবার একটি আদমশুমারি হয়ে যাক, বাজি ধরে বলতে পারি এখন পশ্চিম পাকিস্তানিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।'
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে ৩০ নভেম্বর আবু আব্রাহামের আঁকা আরেকটি কার্টুন প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায়, ভুট্টো একটি পাম্পার দিয়ে ইয়াহিয়াকে বেলুনের মতো ফোলাচ্ছেন আর বলছেন, 'আমি তো ঠিক কাজটিই করছি, ইয়াহিয়াকে চাপ দিচ্ছি।'
আবু আব্রাহামের আসল নাম আত্তুপুরাথু ম্যাথিউ আব্রাহাম। তবে 'আবু' নামেই তিনি বেশি পরিচিত। ১৯২৪ সালে ভারতের কেরালায় তার জন্ম। তিনি একাধারে লেখক, কার্টুনিস্ট ও সাংবাদিক। তিনি দ্য বোম্বে ক্রনিকল, শংকর'স উইকলি, ব্লিৎজ, ট্রিবিউন, দ্য অবজারভার, দ্য গার্ডিয়ান এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রে কাজ করেছেন।
১৯৫৩ সালে তিনি লন্ডনে যান। সে সময় 'পাঞ্চ' ম্যাগাজিন ও 'ডেইলি স্কেচ' ট্যাবলয়েড নিয়মিত তাঁর কার্টুন কিনত। ১৯৬৯ সালে ভারতে ফিরে তিনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট হিসেবে যোগ দেন। একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, পশ্চিমা বিশ্বের উদাসীনতা ও বিশ্বনেতাদের মন্তব্যকে উপজীব্য করে তিনি অসংখ্য কার্টুন এঁকেছেন। সে সময় 'গার্ডিয়ান'-এ এক নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, 'যে পরিস্থিতিতে এক কোটি শরণার্থী তৈরি হয়, সেখানে হস্তক্ষেপ না করাটা কাপুরুষতা।'
আবু আব্রাহামের আঁকা ১০০টি কার্টুন নিয়ে ১৯৭২ সালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটি সংকলন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল 'আবু অন বাংলাদেশ'।
একাত্তর: কার্টুন যখন হাতিয়ার
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রকাশিত রিয়াজ আহমেদের 'কার্টুনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ' বইটি একটি বড় তথ্যভাণ্ডার। এতে তিন শতাধিক কার্টুন স্থান পেয়েছে। বইটিতে ১১ জন ভারতীয় কার্টুনিস্টের কাজ রয়েছে। এর মধ্যে অমল চক্রবর্তীর ৭৫টি, আবু আব্রাহামের ৬২টি, নরেন রায় সুফির ৪৮টি, চণ্ডী লাহিড়ীর ৪৩টি, পি কে এস কুট্টির ২৭টি, রেবতী ভূষণের ১২টি, আর কে লক্ষ্মণের ৮টি, সুধীর দারের ৫টি এবং বিজয় নারায়ণ ভিনস ও রবীন্দ্রনের কয়েকটি কার্টুন রয়েছে। এ ছাড়া এনভার আহমদের আঁকা কিছু কার্টুনও আছে।
কার্টুনিস্ট এনভার আহমদের জন্ম ১৯০৯ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে। লাহোর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি লক্ষ্ণৌর ইংরেজি দৈনিক 'দ্য পাইওনিয়ার'-এ যোগ দেন। সম্পাদক ডেসমন্ড ইয়ং তার প্রতিভা আবিষ্কার করেন এবং তাকে কার্টুনিস্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। পরে তিনি 'দ্য ডন' এবং সবশেষে ১৯৪৬ সালে 'হিন্দুস্তান টাইমস'-এ যোগ দেন।
১৯৯২ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেখানে তিনি প্রায় ১৬ হাজার কার্টুন এঁকেছেন। পাকিস্তান সৃষ্টির অল্পকাল পরেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বুঝতে পেরেছিল, পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাদের নিচু জাত মনে করে। এর বহিঃপ্রকাশ ছিল সাংস্কৃতিক দমন ও অর্থনৈতিক শোষণ। আহমেদের আঁকা 'মধুচন্দ্রিমার পর' (আফটার দ্য হানিমুন) কার্টুনটিতে দেখা যায়, ঠেলাগাড়িতে চড়া এক স্থূলকায় চাবুকধারী পশ্চিম পাকিস্তানিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক শীর্ণকায় পূর্ব পাকিস্তানি।
কলকাতার যুগান্তর
পূর্ববঙ্গে পাকিস্তানি নিগ্রহের বিরুদ্ধে পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকেই সরাসরি অবস্থান নিয়েছিল কলকাতার পত্রিকা 'যুগান্তর'। আব্দুল গাফফার চৌধুরী এক স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, 'বাংলাদেশ তখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছয় দফার আন্দোলনে উত্তাল। পাকিস্তান সরকার কলকাতার কোনো কাগজ বা বইপত্র তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসতে দিত না। তা সত্ত্বেও যুগান্তর চোরাগোপ্তা পথে আসত। তাতে ছয় দফা আন্দোলনের বিস্তারিত খবর ও সমর্থন থাকত।'
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে পত্রিকাটির অবস্থান ছিল অনড়। ৩০ মার্চের যুগান্তরের শিরোনাম ছিল—'ঢাকা মুক্তিফৌজ-এর দখলে'। বোঝা যায়, পত্রিকাটি প্রবলভাবে মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে ছিল। জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব আর্টসে শহীদ কাদের চৌধুরী ও সহুল আহমদ 'যুগান্তর-এর রাজনৈতিক কার্টুনে মুক্তিযুদ্ধের উপস্থাপন' শীর্ষক এক প্রবন্ধে জানান, একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বরে যুগান্তরে ১০৬টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি কার্টুন ছাপা হয়েছে এপ্রিল মাসে। এর সিংহভাগ এঁকেছেন নরেন রায় সুফি ও অমল চক্রবর্তী।
অমলের গোলা
অমল চক্রবর্তীর জন্ম ১৯৩৪ সালে। দীর্ঘ ৭০ বছর তিনি কার্টুন এঁকেছেন। অমিতাভ চৌধুরীর আমন্ত্রণে তিনি 'যুগান্তর'-এ যোগ দেন। পকেট কার্টুনের মাধ্যমে তিনি জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুগুলোকে সরল ও হাস্যরসাত্মকভাবে তুলে ধরতেন। আনন্দবাজার পত্রিকার ২৯ মে ১৯৭১ সংখ্যায় তিনি আঁকেন 'ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণ'। কার্টুনটিতে দেখা যায়, রেডিও মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ইয়াহিয়া কামানের গোলা ছুড়ছেন। গোলাগুলিই যে ইয়াহিয়ার প্রকৃত ভাষা, তা এতে চমৎকার ফুটে উঠেছে।
যুগান্তরের ১৯ এপ্রিল ১৯৭১ সংখ্যায় তার আঁকা 'মুক্তিফৌজ' শিরোনামের কার্টুনে দেখা যায়, ডাইনোসর সদৃশ ইয়াহিয়ার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করছে এক মুক্তিসেনা। ১১ ডিসেম্বর 'অমৃতবাজার' পত্রিকায় তার আরেকটি কার্টুনে দেখা যায়, দুটি সাপ বলাবলি করছে—'পালা! ইয়াহিয়া এদিকেই আসছে, ও বেশি বিষাক্ত।' এপ্রিলের ১১ তারিখে অমলের আরেকটি অসাধারণ কার্টুন প্রকাশিত হয়, যেখানে ইয়াহিয়া মাও সে তুংকে বলছেন 'ইস্ট ইজ রেড', আর তাদের পেছনে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের রক্তাক্ত মানচিত্র।
অমূল্য সব রতন
একাত্তরের রণাঙ্গনের দিনগুলোতে বিশ্বগণমাধ্যমে মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে অনন্য সব কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে। হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ডের 'বাংলাদেশ ছাড়া সকলের জন্য স্বাধীনতা', টাইমস ও বাংলাদেশ সংবাদ পরিক্রমা 'হিটলার তুমি কোন ছার', দি এজ-এর 'বিতর্ক চলছে', দ্য স্টেটসম্যানের 'ও তুমি প্রমোশন পেয়েছ', সাপ্তাহিক দেশের 'প্রিয় সান্টা', টাইমস অব ইন্ডিয়ার 'ডাউন দ্য যমুনা', উইকলি ব্লিৎজ-এর 'দ্য ডেলিভারার', দ্য ভ্যানকুভার সান-এর 'ইস্ট পাকিস্তান রিফিউজি', সাপ্তাহিক দর্পন 'সবটা শেষ করে দিস না', টাইমস অব ইন্ডিয়ার 'ইন্ডিয়ান অ্যাফেয়ার' ইত্যাদি কার্টুন বাঙালির অমূল্য রতন। তবে নতুন প্রজন্মের কাছে এগুলোর খুব সামান্যই পৌঁছাতে পেরেছে। অনেক কার্টুন হয়তো চিরতরে হারিয়ে গেছে। যেগুলো টিকে আছে, সময় থাকতে সেগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা জরুরি।
