উপসাগরীয় যুদ্ধের অস্থিরতায় ৬৩ বিলিয়ন ডলার বাড়তি মুনাফার পথে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যেভাবে বাড়ছে, তা অব্যাহত থাকলে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো এ বছর ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অতিরিক্ত মুনাফা পেতে যাচ্ছে।
বিনিয়োগ ব্যাংক 'জেফরিস'-এর এক মডেলিং অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম প্রায় ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে কেবল এই মার্চ মাসেই মার্কিন তেল উৎপাদকরা বাড়তি ৫ বিলিয়ন ডলারের নগদ অর্থপ্রবাহ তৈরি করবে।
জ্বালানি গবেষণা সংস্থা 'রাইস্টাড' জানিয়েছে, যদি এ বছর তেলের দাম গড়ে ১০০ ডলারের আশেপাশে থাকে, তবে কোম্পানিগুলো তেল উৎপাদন থেকে মোট ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি রাজস্ব পাবে।
গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ গর্বভরেই এর কৃতিত্ব নেন। তিনি লিখেছেন, 'যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ, অনেক ব্যবধানে আমরা এগিয়ে। তাই তেলের দাম যখন বাড়ে, আমরা অনেক টাকা আয় করি।'
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার মার্কিন তেলের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট প্রতি ব্যারেল ৯৮.৭১ ডলারে থিতু হয়েছে।
এই পরিস্থিতির সুফল মূলত মার্কিন 'শেল' তেল কোম্পানিগুলো পাবে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। তবে বড় আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর জন্য সমীকরণটি ভিন্ন ও জটিল। এক্সনমোবিল, শেভরন এবং ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী বিপি, শেল ও টোটালএনার্জিসের উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক সম্পদ ও বিনিয়োগ রয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় এই কোম্পানিগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
পাঁচটি 'সুপারমেজর' তেল কোম্পানির মধ্যে কয়েকটির অংশীদারিত্ব থাকা একাধিক স্থাপনায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। যার ফলে 'শেল' কোম্পানি কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে 'ফোর্স মেজার' (অনিবার্য কারণে চুক্তি পালনে অক্ষমতা) ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম তেল পরিষেবা সংস্থা এসএলবি ইতিমধ্যে তাদের মুনাফা কমার আশঙ্কা জানিয়ে সতর্কতা জারি করেছে।
ওমেগা অয়েল অ্যান্ড গ্যাসের চেয়ারম্যান এবং তেল খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব মার্টিন হিউস্টন বলেন, 'এই পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই লাভবান নয়—আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো তো নয়ই। সাময়িকভাবে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয় এমন কোনো সংকটের চেয়ে তারা বরং দুই সপ্তাহ আগের স্বাভাবিক পরিস্থিতিকেই বেশি পছন্দ করত।'
তিনি আরও বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যের জাতীয় তেল কোম্পানি ও তাদের অংশীদারদের ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো আবার গড়ে তুলতে হবে। তবে প্রকৃত উদ্বেগের বিষয় হলো… প্রণালিটি নজিরবিহীনভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া—যদিও তা স্বল্প সময়ের জন্যও হয়।'
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটের দ্রুত সমাধানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বৃহস্পতিবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা পেতে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখবেন। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর গবেষণা অনুযায়ী, এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল যাতায়াত করলেও বর্তমানে ১৮ মিলিয়ন ব্যারেলই অবরুদ্ধ হয়ে আছে। বিশ্বব্যাপী এলএনজি উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটস ধারণা করছে, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং আগামী তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ১২৮ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
রিস্টাডের থমাস লাইলস বলেন, 'প্রণালিটি বন্ধ হয়ে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের জাতীয় তেল কোম্পানিগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে [পশ্চিমা] বড় তেল কোম্পানিগুলোও প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। কারণ কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক এবং নিউট্রাল জোনে [সৌদি আরব ও কুয়েতের মধ্যবর্তী এলাকা] মোট আপস্ট্রিম তেল উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশই এসব কোম্পানির হাতে।'
রিস্টাডের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বিপি ও এক্সন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে তাদের বৈশ্বিক তেল ও এলএনজি কার্যক্রম থেকে যে ফ্রি ক্যাশ ফ্লো আসবে, তার এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি এই অঞ্চলের কার্যক্রম থেকে আসার কথা ছিল।
একই হিসাবে টোটালএনার্জিসের ক্ষেত্রে এই হার ১৪ শতাংশ। শেল ও শেভরনের জন্য তা যথাক্রমে ১৩ শতাংশ এবং ৫ শতাংশ।
সাম্প্রতিক সময়ে 'সুপারমেজর' তেল কোম্পানিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে তাদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। তেল মজুত বাড়ানো ও উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নিয়ে তারা সিরিয়া, লিবিয়া এবং আরও কয়েকটি দেশে নতুন চুক্তি করেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত এক ট্রেডিং আপডেটে টোটাল জানায়, তেলের উচ্চ দাম 'মধ্যপ্রাচ্যে উৎপাদন ক্ষতির প্রভাবের চেয়েও বেশি ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে'।
এদিকে মঙ্গলবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে এক্সনের প্রধান নির্বাহী ড্যারেন উডস বলেন, বিশ্বে জ্বালানির 'প্রধান সরবরাহ উৎস' হিসেবে পরিচিত অঞ্চলটির বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতির সঙ্গে কোম্পানিটি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এতে পুরো শিল্পখাতের সব কোম্পানিই প্রভাবিত হবে।
তিনি বলেন, 'আমাদের আকার ও সক্ষমতা আমাদের কিছু বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের কার্যক্রমের সমন্বয় করছি।'
