রমজানের তৃতীয় সপ্তাহে জমে উঠেছে পাঞ্জাবির বাজার
উৎসবের ঐতিহ্যে জড়িয়ে থাকা অন্যতম পোশাক পাঞ্জাবি। শপিংমল থেকে ফুটপাত—সবখানেই পুরুষদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পাঞ্জাবি-পায়জামা।এবারও রমজানের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে রাজধানীজুড়ে জমে উঠেছে কেনাকাটা। রোজার শেষ দশকে বিক্রি আরও কয়েকগুণ বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সারা বছর যত পাঞ্জাবি বিক্রি হয়, তার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বিক্রি হয় রমজান ও ঈদকে ঘিরে। পহেলা বৈশাখ ও বিয়ের মৌসুম যুক্ত হলে বছরের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ লেনদেন কয়েকটি নির্দিষ্ট সময়েই সম্পন্ন হয়। ফলে উৎপাদন পরিকল্পনাও মৌসুমভিত্তিক করা হয়।
দেশে পাঞ্জাবির বার্ষিক বাজারের আকার ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা। ব্যবসায়ীরা জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতায় গত বছর বাজারে মন্দা ছিল। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক। তাই অনেকে গত বছরের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি বিক্রির আশা করছেন।
নিউ মার্কেটের রহমান ফ্যাশনের মালিক মো. ইয়াসিন বলেন, 'গত বছর ৮ হাজার পাঞ্জাবি বিক্রি হয়েছিল। এ বছর ১২ থেকে ১৪ হাজার পিস বিক্রির লক্ষ্য ধরেছি।'
পাঞ্জাবি উৎপাদনের মূল কেন্দ্র ঢাকা। রাজধানীর ইসলামপুর, চকবাজার, গাউছিয়া ও আশপাশের এলাকায় ঈদ মৌসুমে শত শত ছোট ও মাঝারি কারখানা ব্যস্ত থাকে। নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে আসে সুতি ও খাদি কাপড়। আর গাজীপুরে হয় কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিংয়ের কাজ।
মাঝারি মানের একটি পাঞ্জাবি তৈরিতে খরচ পড়ে ৫০০ থেকে ৯০০ টাকা। এর মধ্যে কাপড়, সেলাই, বোতাম, লেবেল, প্যাকেজিং ও শ্রমের খরচ অন্তর্ভুক্ত। উন্নত মানের কাপড় ও সূচিশিল্প থাকলে ব্যয় ১ হাজার টাকার বেশি হয়।
পাইকারি বাজারে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায় কেনা পণ্য খুচরা বাজারে ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ব্র্যান্ডভেদে দাম ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা বা তার বেশি হতে পারে।
রাজধানীর শপিংমলগুলোতে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি। তবে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার পণ্যও উল্লেখযোগ্য হারে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। কেউ দাম বাড়ার কথা বলছেন, আবার কেউ বলছেন মানের তুলনায় দাম সহনীয়।
ঈদের কেনাকাটায় পছন্দের তালিকায় প্রথমে পাঞ্জাবি রেখেছেন শাফায়েত ইসলাম। পুরান ঢাকার শরীফ মার্কেটে তিনি বলেন, 'প্রতিবছর ঈদে একটা পাঞ্জাবি অবশ্যই কিনি। ঈদের নামাজে পাঞ্জাবি আমাদের ঐতিহ্য। এবার পাঞ্জাবির বাজেট রেখেছি ১-২ হাজার টাকার মধ্যে।'
শরীফ মার্কেটের রহমান পাঞ্জাবি হাউজের বিক্রেতা বলেন, 'এবার পাইকারি ও খুচরা দুইভাবেই পাঞ্জাবি বিক্রি ভালো হচ্ছে। ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪-৫ হাজার দামের পাঞ্জাবিও বিক্রি হয়েছে।'
রাজধানীর নিউ মার্কেট, চন্দ্রিমা, সায়েন্সল্যাব, শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেট ও কাঁটাবন এলাকার শপিংমল ঘুরে দেখা যায়, সুতির পাশাপাশি সফট লিলেন, কাবুলি ও প্রিন্টের পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি। ক্রেতারা জানান, গত বছরের চেয়ে এ বছর পাঞ্জাবির ডিজাইনে নতুনত্ব এসেছে। আবহাওয়া বিবেচনায় আকর্ষণীয় ও আরামদায়ক পাঞ্জাবিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা।
এসব মার্কেটে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের পাঞ্জাবি পাওয়া যায়। মানভেদে ৩০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পায়জামা বিক্রি হয়। এছাড়া নয়াপল্টনের পলওয়েল, চায়না টাউন ও সিটি হার্টের বড় দোকানগুলোতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবি পাওয়া যায়।
ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদসংলগ্ন এলাকায় পায়জামা-পাঞ্জাবির অস্থায়ী বাজার বসেছে। বিশেষ করে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সামনে ফুটপাতজুড়ে সাশ্রয়ী মূল্যের পাঞ্জাবির বিক্রি চোখে পড়ার মতো।
সেখানে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে নানা রঙের পাঞ্জাবি। দরদাম করলে কিছুটা কমেও পাওয়া যাচ্ছে। শিশুদের পাঞ্জাবি-পায়জামা সেট মিলছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়। ইফতারের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে ভিড় বাড়ে। নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে যারা কেনাকাটা করতে চান, তাদের কাছে এসব বাজারই ভরসা।
বাজারে সুতি কাপড় এখনও সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। তবে খাদি, লিলেন ও সিল্ক-ব্লেন্ড কাপড়ের চাহিদাও বাড়ছে। ডিজাইনে এবার মিনিমাল লুক এবং ঐতিহ্যনির্ভর সূচিশিল্প—দুই ধারাই জনপ্রিয়। কলারে হালকা কাজ, বুকের অংশে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি যেমন আছে, তেমনি ব্লক প্রিন্ট ও নকশিকাঁথা অনুপ্রাণিত কাজও রয়েছে। কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, তরুণদের মধ্যে 'কাবুলি' ও সেমি-শর্ট কাটের পাঞ্জাবি ভালো সাড়া ফেলেছে।
দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো ঈদ উপলক্ষে বিশেষ সংগ্রহ এনেছে। সঙ্গে যুক্ত করেছে বিভিন্ন ছাড় কিংবা অফার। আড়ং, ইল্লিয়্যিন, রঙ বাংলাদেশ, লা রিভ, টুয়েলভ ক্লথিং ও কে ক্র্যাফট–এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গরম উপযোগী কাপড় ও আধুনিক কাটে জোর দিয়েছে। তবে মোট বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশ এখনো পাইকারি বাজার ও স্থানীয় দোকাননির্ভর।
অনলাইন বিক্রি বাজারের অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ দখল করেছে। অনেক উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে মোট বিক্রির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে অনলাইন থেকে।
অনলাইনে পাঞ্জাবি বিক্রি করেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, 'আমাদের দেশে ঈদ উপলক্ষে পায়জামা-পাঞ্জাবি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। আমাদের অনলাইনভিত্তিক বেচাকেনার ধরন ওঠানামা করে। এটি বিশ্ব পরিস্থিতি, অনলাইন ট্রেন্ড ও মানুষের প্রবৃত্তির ওপর নির্ভর করে। ঈদ বাজারে অনলাইনে বেচাকেনা সাধারণত ১০ থেকে ২৫ রোজায় হয়। তার মধ্যে ১৫ থেকে ২০ রোজায় বিক্রি বেশি হয়।'
ব্যবসায়ীদের মতে, মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক বিপণন ও প্রণোদনা সহায়তা পেলে পাঞ্জাবিকে ঐতিহ্যভিত্তিক বিশেষায়িত রপ্তানি পণ্যে রূপ দেওয়া সম্ভব।
