চলমান সংঘাতকে কেন ধর্মযুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল?
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আজ বুধবার পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে। এরমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে ধর্মীয় ভাষ্য ব্যবহার করছেন—যা এই যুদ্ধকে এক ধরনের 'ধর্মযুদ্ধ' হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা।
গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন–কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন্স (সিএআইআর) পেন্টাগনের এই ভাষ্যকে "বিপজ্জনক" ও "ইসলামবিদ্বেষী" বলে নিন্দা জানায়।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরু করে এবং ধারাবাহিকভাবে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। পাল্টা জবাব দিতে ইরান ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এবং বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও সাইপ্রাসে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
একটি মার্কিন পর্যবেক্ষক সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের বলা হয়েছে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য "বাইবেলের শেষ সময়ের সূচনা ঘটানো"। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও সম্প্রতি বলেছেন, "উগ্র ধর্মীয় উন্মাদরা" ইরানকে চালাচ্ছে।
কী বলছেন মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতারা?
মার্কিন পর্যবেক্ষক সংস্থা- মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) জানিয়েছে, তারা ইমেইলে অভিযোগ পেয়েছে—মার্কিন সেনাদের বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ "আর্মাগেডন" বা বাইবেলের 'শেষ সময়' ডেকে আনবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নন-কমিশন কর্মকর্তা এমআরএফএফ-কে পাঠানো ইমেইলে দাবি করেন, এক কমান্ডার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন সেনাদের জানাতে যে এই যুদ্ধ "ঈশ্বরের মহাপরিকল্পনার অংশ" এবং তিনি 'বুক অব রিভেলেশন' থেকে আর্মাগেডন ও যিশুখ্রিষ্টের প্রত্যাবর্তন সংক্রান্ত উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন।
এমআরএফএফ একটি অলাভজনক সংস্থা, যা মার্কিন সেনাসদস্যদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করে।
ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, ওই কমান্ডার তার ইউনিটকে বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে "যিশু অভিষিক্ত করেছেন ইরানে সংকেতের আগুন (সিগনাল ফায়ার) জ্বালাতে, যাতে আর্মাগেডন শুরু হয় এবং তাঁর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন চিহ্নিত হয়।"
ইসরায়েলি ও মার্কিন নেতারাও প্রকাশ্যে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করেছেন।
গত মাসে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এক সাক্ষাৎকারে রক্ষণশীল ভাষ্যকার টাকার কার্লসনকে বলেন, ইসরায়েল যদি "প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য" নিয়েও নেয়, তাতেও সমস্যা নেই—কারণ বাইবেলে এই ভূমি তাদের প্রতিশ্রুত। অবশ্য ইসরায়েল তা করতে চায় না বলেও তিনি দাবি করেন।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও বলেন, "ইরান উন্মাদদের দ্বারা পরিচালিত—ধর্মীয় উগ্র উন্মাদরা। তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।"
এর আগের দিন পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, "ইরানের মতো উন্মাদ শাসনব্যবস্থা, যারা ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইসলামী বিভ্রমে আচ্ছন্ন, তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না।"
মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন–সিএআইআর তাদের বিবৃতিতে দাবি করে, হেগসেথের মন্তব্য শিয়াদের ধর্মীয় বিশ্বাসে উল্লেখ করা 'শেষ সময়' সংক্রান্ত ধারণার প্রতি ইঙ্গিত করেই দেওয়া হয়েছে।
রোববার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহ তোরাহ ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানকে প্রাচীন বাইবেলীয় শত্রু 'আমালেক'-এর সঙ্গে তুলনা করেন। ইহুদি ঐতিহ্যে 'আমালেক'কে "সম্পূর্ণ অশুভের" প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নেতানিয়াহু বলেন, "এই সপ্তাহের তোরাহ থেকে আমরা পড়েছি—'আমালেক তোমাদের সঙ্গে যা করেছিল তা স্মরণ কর।' আমরা স্মরণ করি—এবং আমরা (সেই অনুযায়ী) কাজ করি।"
সিএআইআর তাদের বিবৃতিতে বলে, "আমরা অবাক নই যে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবারও আমালেকের বাইবেলীয় কাহিনি ব্যবহার করছেন—যেখানে ঈশ্বর ইসরায়েলিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন এক পৌত্তলিক জাতির পুরুষ, নারী, শিশু ও পশু হত্যা করতে। ইরানে বেসামরিক নাগরিকদের গণহত্যাকে ন্যায্যতা দিতে এটা বলা হচ্ছে, যেভাবে গাজার ক্ষেত্রেও বলা হয়েছিল।"
তারা আরও বলে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ন্যায্যতা দিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী, হেগসেথ ও নেতানিয়াহুর ছড়ানো 'পবিত্র যুদ্ধ' ভাষ্য নিয়ে প্রতিটি আমেরিকানের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।
কেন ধর্মযুদ্ধের ফ্রেমে উপস্থাপন?
যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোলিয়ন মিচেল আল জাজিরাকে বলেন, সংঘাতকে 'পবিত্র যুদ্ধ' হিসেবে উপস্থাপন করে নেতারা ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসকে ব্যবহার করছেন "তাদের পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দিতে, (যুদ্ধের পক্ষে) জনমত সংগঠিত করতে এবং সমর্থন আদায়ে।"
তিনি বলেন, "এই সংঘাতে জড়িত উভয় পক্ষের অনেকেই বিশ্বাস করেন ঈশ্বর তাদের পক্ষে। তাই সহিংসতার পক্ষে সমর্থন জোগাতে ঈশ্বরকে আহ্বান করা হচ্ছে। কিন্তু, এভাবে শত্রুকে অমানবিক ও দানবীয় করে তোলা পরবর্তী সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে আরও কঠিন করে তোলে।"
কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ইব্রাহিম আবুশরিফ বলেন, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে—নিজ দেশের জনমতকে যুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত করা, সভ্যতাভিত্তিক সংঘাতের কাঠামো তৈরি করা এবং কৌশলগত বয়ান নির্মাণ করা।
নিজ দেশের জনমত সংগঠনের ক্ষেত্রে নেতারা যেকোনো সংঘাতকে নৈতিকভাবে স্বচ্ছ ও জরুরি হিসেবে তুলে ধরতে পারেন—যা জনসমর্থন জোগাড়ে সহায়ক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে মার্কিন খ্রিস্টান জায়নিস্ট যাজক জন হাগিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণের পক্ষে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, রাশিয়া, তুরস্ক, "ইরানের যা বাকি আছে" এবং "ইসলামি গোষ্ঠীগুলো" ইসরায়েলে অগ্রসর হবে, আর ঈশ্বর "ইসরায়েলের শত্রুদের ধ্বংস করবেন।"
আবুশরিফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ধর্মীয় ভাষা ইভানজেলিক্যাল ও খ্রিস্টান জায়নিস্টদের মনোজগতে গভীর সাড়া ফেলে, কারণ তারা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে 'শেষ সময়'-এর কাহিনির অংশ হিসেবে দেখেন।
সভ্যতাভিত্তিক ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে 'আমরা বনাম তারা' বিভাজন তৈরি করা হয়—যেখানে সংঘাতকে সীমান্ত বা নীতিগত বিরোধ নয়, বরং জীবনযাপন বা বিশ্বাসের সংঘর্ষ হিসেবে দেখানো হয়।
"যুদ্ধকে কেবল কৌশলগত ভাষায় ন্যায্যতা দেওয়া কঠিন," বলেন আবুশারিফ। "কিন্তু 'সভ্যতা বনাম উগ্রবাদ' বা বাইবেলে বর্ণিত 'সৎ বনাম অসৎ' হিসেবে তুলে ধরলে জটিল আঞ্চলিক সংঘাত সাধারণ মানুষের কাছে সহজ নৈতিক বিভ্রমে পরিণত হয়।"
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলি রাজনৈতিক ভাষ্যে বাইবেলীয় উল্লেখ দীর্ঘদিনের অংশ, যা সমসাময়িক সংঘাতকে ইহুদি জাতির ঐতিহাসিক টিকে থাকার বৃহত্তর বয়ানের অংশ করে। এই বয়ান ইহুদি জাতির অস্তিত্বের গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়।
মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতারা কি আগেও ধর্মীয় বয়ানের আশ্রয় নিয়েছেন?
নেতানিয়াহু ও অন্য ইসরায়েলি কর্মকর্তারা গাজায় যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের প্রসঙ্গে 'আমালেক' শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।
ইতিহাসে মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও সামরিক অভিযানে বাইবেলীয় ভাষা ব্যবহার করেছেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ "ক্রুসেড" শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। যদিও পরে হোয়াইট হাউস ব্যাখ্যা দেয়, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বোঝাতে তিনি সেটি ব্যবহার করেননি।
১১ থেকে ১৩ শতকে কয়েক দফায় মধ্যপ্রাচ্যে মুসলামনদের থেকে ভূমি দখলের লড়াইকে ধর্মীয় রূপ দিয়ে ক্রুসেড নামে পরিচালনা করা হয়।
আবুশরিফ বলেন, ইরান যুদ্ধ মূলত ভূরাজনৈতিক; তবে ধর্মীয় ভাষা সমর্থকদের উজ্জীবিত করে এবং সংঘাতকে নৈতিক রূপ দেয়।
তিনি বলেন, "যেকোনো যুদ্ধ নিজস্বতায় ধর্মতাত্ত্বিক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক ঘটনা। কিন্তু এর চারপাশের ভাষা ক্রমেই পবিত্র প্রতীক ও সভ্যতাভিত্তিক বয়ান ব্যবহার করছে। এতে সমর্থন জোগাড় সহজ হয়, কিন্তু ঝুঁকিও আছে—যখন যুদ্ধ পবিত্র ভাষায় রূপ পায়, তখন রাজনৈতিক আপস কঠিন হয়ে পড়ে, প্রত্যাশা বেড়ে যায় এবং কূটনীতিক সমাধান জটিল হয়ে ওঠে।"
