ইরানের জ্বালানি তেল ও খারগ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাই: ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইরানের তেল সম্পদ কবজা করতে চান এবং দেশটির প্রধান জ্বালানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখল করার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, 'সত্যি বলতে কি, আমার সবথেকে প্রিয় কাজ হলো ইরানের তেল দখল করা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কিছু নির্বোধ লোক আছে যারা প্রশ্ন তোলে—কেন আমি এমনটা করছি? তারা আসলে বোকা লোক।'
ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, এই তেল দখলের জন্য খারগ দ্বীপ সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হতে পারে। তিনি বলেন, 'হয়তো আমরা খারগ দ্বীপ দখল করব, আবার হয়তো করব না। আমাদের সামনে অনেক পথ খোলা আছে। তবে এর মানে হলো আমাদের সেখানে (খারগ দ্বীপে) কিছু সময়ের জন্য অবস্থান করতে হবে।'
দ্বীপটিতে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেমন—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প তা তুচ্ছ করে বলেন, 'আমার মনে হয় না তাদের কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে। আমরা খুব সহজেই এটি দখল করতে পারব।'
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যে আরও ৩,৫০০ মার্কিন সেনা পৌঁছেছে। সংঘাত আরও বাড়লে মার্কিন সেনারা ইরানি হামলার সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে বড় ধরনের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প আরও জানান, পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা বেশ ভালোভাবে এগোচ্ছে। তবে শিগগিরই কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কিছু বলেননি। তিনি শুধু বলেন, 'খুব দ্রুতই একটি সমঝোতা হতে পারে।'
উল্লেখ্য, পারস্য উপসাগরের উত্তর প্রান্তে ইরানি উপকূল থেকে মাত্র ২৬ কিলোমিটার (১৬ মাইল) দূরে এই দ্বীপের অবস্থান। এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী থেকে প্রায় ৪৮৩ কিলোমিটার (৩০০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।
দ্বীপটির চারপাশের পানি অত্যন্ত গভীর হওয়ায় এখানে বড় বড় তেলবাহী ট্যাংকার নোঙর করতে পারে, যা ইরানের মূল ভূখণ্ডের অগভীর উপকূলীয় এলাকায় সম্ভব নয়।
ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে এই দ্বীপটি দখল করতে পারলে ইরানের জ্বালানি বাণিজ্যে বড় ধরণের বিপর্যয় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। এতে তেহরানের অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে।
গত মার্চের মাঝামাঝিতে মার্কিন বাহিনী খারগ দ্বীপে হামলা চালিয়েছিল। ট্রাম্প দাবি করেছেন। তারা সেখানকার সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু 'পুরোপুরি ধ্বংস' করে দিয়েছেন এবং এরপর তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রশাসন এই দ্বীপে স্থল সেনা পাঠানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। এই মাসের শেষের দিকে নৌসেনাদের (মেরিন) দুটি দল ওই অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প যদি স্থল অভিযানের নির্দেশ দেন, তবে তার হাতে আরও বেশি বিকল্প রাখতে পেন্টাগন সেখানে হাজার হাজার বিমানবাহী সৈন্য বা প্যারাট্রুপার পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
'ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্র্যাসিস'-এর গবেষক রায়ান ব্রবস্ট এবং ক্যামেরন ম্যাকমিলান লিখেছেন, 'খারগ দ্বীপ দখল এবং সেখানে অবস্থান করা কোনো চূড়ান্ত বিজয় দেওয়ার চেয়ে বরং যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘায়িত করার সম্ভাবনাই বেশি।'
তাদের মতে, সেখানে মোতায়েন করা হলে মার্কিন সেনারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়বে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত ছোট কিন্তু প্রাণঘাতী 'ফার্স্ট-পারসন ভিউ' ড্রোনের মুখে পড়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।
তারা আরও সতর্ক করে বলেন, 'কোনো সফল হামলার পর ইরানি কর্তৃপক্ষ সম্ভবত সেসব ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে দেবে এবং মার্কিন সেনাদের করুণ মৃত্যুর চিত্রকে নিজেদের প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার কাজে ব্যবহার করবে।'
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প আশা করছেন খারগ দ্বীপ দখল করলে ইরানকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে বাধ্য করা যাবে, যা ভবিষ্যতের আলোচনায় তাকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে।
তবে, তেহরান এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সমুদ্রে আরও বেশি মাইন স্থাপন করতে পারে। বিশেষ করে উপকূল থেকে ভাসমান মাইন ছড়িয়ে দিলে এই অঞ্চল জাহাজ চলাচলের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে, যা সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
