জ্বালানি সংকটে ভরা মৌসুমেও মোটরসাইকেল বিক্রিতে ভাটা
ঈদুল ফিতরকে বিক্রির সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম মনে করেন দেশের মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতারা। সারা বছর মোটামুটি বিক্রি হলেও ঈদের আগে বিশেষ অফার ও ছাড়ের কারণে মোটরসাইকেলের চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যায়।
তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার এই শিল্পের ব্যবসায় চিত্র অপ্রত্যাশিতভাবে মন্থর। সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে আশানুরূপ বিক্রি হয়নি।
কিছু ব্র্যান্ড ব্যাপক মার্কেটিং ক্যাম্পেইন ও বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে কোনো কোনো ব্রান্ডের বিক্রি স্বাভাবিক থাকলেও কারও কারও মতে, আশানুরূপ বিক্রি হয়নি।
খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে এপ্রিলে মোটরসাইকেল বিক্রি অনেক কমে যেতে পারে। সাধারণত ঈদ-পরবর্তী এই সময় বিক্রির জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের ফলে এই সংকটের সূত্রপাত। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশে জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদামাফিক মিলছে না মোটরসাইকেলের জ্বালানি।
ফুয়েল স্টেশনগুলোতে প্রায়ই মোটরসাইকেল চালকদের তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ জ্বালানির কোনো সংকট নেই বলে বারবার আশ্বাস দিলেও বাস্তবের চিত্র একেবারেই ভিন্ন।
বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব কুমার রায় জানান, দেশে প্রতি মাসে গড়ে ৩০-৩৫ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। ঈদের মৌসুমে এই চাহিদা অনেকটাই বেড়ে যায়।
'তবে মার্চ মাসে সমন্বিতভাবে উদ্যোক্তারা প্রায় ৪৫ হাজার মোটর সাইকেল বিক্রি করেছেন—যা পূর্বের ঈদ মৌসুমে বিক্রির তুলনায় বেশ কম। গত বছরের ঈদ মৌসুমে প্রায় ৬০ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়,' বলেন তিনি।
বিপ্লব মনে করেন, বাজারে তেল সরবরাহের অস্বাভাবিকতা না থাকলে মোটরসাইকেল বিক্রি ৫০ হাজারের বেশি হতো বলে মনে করেন ।
বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক কাউসার আহমেদ বলেন, 'তেল সংকটের কারণে মোটরসাইকেল বিক্রি হ্রাস পেয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে অটোমোবাইল সেক্টর ভালো নেই।'
বাংলাদেশে জংশেন ও হুন্দাই ব্র্যান্ডের একমাত্র পরিবেশক রূপসা ট্রেডিং কর্পোরেশনের সিইও কাউসার বলেন, জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এপ্রিলে বিক্রি আরও কমে যেতে পারে। এটি পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির কারণে মোটরসাইকেল শিল্পও নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।
নির্বাচনের পর নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ ও ঈদ মৌসুমকে ঘিরে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করেছিলেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু জ্বালানি সংকট এই শিল্পে নতুন করে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই সংকটের প্রভাব কেবল বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরো অটোমোবাইল খাতই এখন চাপের মুখে রয়েছে, কারণ জ্বালানির প্রাপ্যতা সরাসরি গ্রাহকদের পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত ও আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে।
কোনো কোনো পরিবেশক তাদের ব্র্যান্ডের বিক্রিতে উল্লেখযোগ্য হ্রাসের কথা জানিয়েছেন। তারা সতর্ক করে বলেন, জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে লোকসানের পাল্লা আরও ভারী হতে পারে।
এসিআই মোটরসের মহাব্যবস্থাপক হোসেন মোহাম্মদ বলেন, 'এবারের ঈদের মৌসুমে অন্তত ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা ছিল। ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় না কমলেও প্রত্যাশার চেয়ে অন্তত ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে।'
২০১৬ সাল থেকে এসিআই মোটরস বাংলাদেশে ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের পরিবেশক হিসেবে কাজ করছে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট বর্তমান বিক্রির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি বাজারের প্রতি গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থাও নষ্ট করে দিতে পারে।
বাংলাদেশের মোটরসাইকেল শিল্প সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত বিকশিত হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা সংযোজিত পণ্য দিয়েই অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৯ শতাংশ মেটানো যাচ্ছে।
দেশি-বিদেশি বড় ব্র্যান্ডগুলো বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী বৈচিত্র্যময় সব মডেল বাজারে এনেছে।
সাধারণত ঈদের সময় গ্রাহকদের বাড়তি খরচ করার প্রবণতাকে কাজে লাগাতে কোম্পানিগুলো বিশেষ অফার নিয়ে আসে। এ বছর অনেক কোম্পানি অন্তত ৩০-৩৫ শতাংশ বিক্রি বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। কিছু ব্র্যান্ড তাদের স্বাভাবিক পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারলেও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি।
বাজারের সব সেগমেন্টে অবশ্য এই মন্দার প্রভাব সমানভাবে পড়েনি। কিছু কোম্পানি জানাচ্ছে, তাদের মোটরসাইকেল বিক্রি এখনো স্বাভাবিক রয়েছে। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যবহারকারীরা আগের চেয়ে কম মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন; ফলে বিক্রয়োত্তর সেবা থেকে আয় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
এদিকে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলস এই সংকটে বেশ বড় ধাক্কা খেয়েছে। সাধারণত প্রতিষ্ঠানটির মাসে প্রায় ২ হাজার ইউনিট মোটরসাইকেল বিক্রি হলেও মার্চ মাসে তা কমে মাত্র ৫০০ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। তবে গ্রাহকদের পছন্দের ক্ষেত্রে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে—বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
রানার অটোমোবাইলসের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) সনৎ দত্ত জানান, গত মাসে তাদের ইভি বিক্রি দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৫০০ ইউনিটে পৌঁছেছে, যা তাদের গত মাসের মোটরসাইকেল বিক্রির সমান। অথচ এর আগের ছয় মাস মিলিয়েও ইভি বিক্রির সংখ্যা এই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
তিনি আরও বলেন, বিক্রির এই উল্লম্ফন বলছে, চলমান জ্বালানি সংকটে ক্রেতারা বিকল্পের দিকে মনোযোগী হয়েছেন।
শিল্প বিশ্লেষকদের হিসাবে, বাংলাদেশের মোটরসাইকেলের বাজারের আকার ৭-৮ হাজার টাকা। বাজারটি বছরে ১৬-১৭ শতাংশ হারে বাড়ছে।
গত এক দশকে মোটরসাইকেলের বার্ষিক বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৫ সালে বছরে ২ লাখ ইউনিটের কম বিক্রি হতো। বর্তমানে তা বেড়ে বছরে প্রায় ৪ লাখ ইউনিটে পৌঁছেছে।
তবে বর্তমান জ্বালানি সংকট এই প্রবৃদ্ধির ধারাকে ব্যাহত করার হুমকি তৈরি করেছে।
এই সংকটের প্রভাব পড়ছে দেশের পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাইড শেয়ারিং চালকদের ওপরও।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে পাঠাওয়ে রাইড শেয়ারিং করছেন সোহেল। তিনি জানান, ঈদের এই মৌসুমে তার আয় অনেকটা কমে গেছে।
সোহেল বলেন, তেল নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তিনি ট্রিপ কমাতে বাধ্য হয়েছেন। এ কারণে অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বে যাত্রী নিচ্ছেন। দূরের যাত্রী হলে ভাড়া একটু বেশি চান।
তার ভাষ্য, দূরের যাত্রী নিলে তেল খরচ হয় বেশি। ভাড়া পান ঠিকই, কিন্তু আবার তেলের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়, যা খুবই বিড়ম্বনার। তেল নিতেই কয়েক ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়; এতে সময় নষ্ট হয়। এই কারণে ট্রিপ কমিয়ে দিয়েছেন। শুধু সকালবেলা অফিসগামী লোকজনকে টার্গেট করে যাত্রী নেওয়ার প্রস্তুতি থাকে।
কীভাবে তেল সংগ্রহ করেন—এমন সোহেল তিনি বলেন, দিনভর বিভিন্ন পাম্পে তেলের জন্য লম্বা লাইন থাকে। তবে ভোরের দিকে পাম্পে অপেক্ষাকৃত ভিড় কম থাকে, তখন তিনি তেল নেন। তবে এতেও আধাঘণ্টার মতো লেগে যায় বলে জানান এই রাইডার।
