যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইউক্রেনকেই ছাড় দিতে বলে, রাশিয়াকে নয়: জেলেনস্কি
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী সপ্তাহে জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হতে যাওয়া শান্তি আলোচনা ফলপ্রসূ হবে। তবে তিনি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র 'খুব বেশি' বার শুধু ইউক্রেনকেই ছাড় দেওয়ার কথা বলে, রাশিয়াকে নয়।
তিনি মস্কোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, তারা প্রধান আলোচক পরিবর্তন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৯৪৫ সালের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় এই যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে আগামী মঙ্গল ও বুধবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইউক্রেন, রাশিয়া ও আমেরিকার প্রতিনিধিদল বৈঠকে বসবে।
মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে দেওয়া ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, 'আমরা সত্যিই আশা করি আগামী সপ্তাহের ত্রিপাক্ষিক বৈঠকটি গুরুতর, অর্থবহ এবং সবার জন্য সহায়ক হবে। কিন্তু সত্যি বলতে মাঝে মাঝে মনে হয়, পক্ষগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছে।'
আরও নিষেধাজ্ঞা ও অস্ত্র চান জেলেনস্কি
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে হামলা চালায় রাশিয়া। সম্প্রতি আবুধাবিতে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় দুই দফা আলোচনা হয়েছে। উভয় পক্ষই একে গঠনমূলক বললেও বড় কোনো সাফল্য আসেনি।
জেলেনস্কি ইউক্রেনের মিত্রদের রাশিয়ার ওপর আরও চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং অস্ত্র সরবরাহ বাড়ানোর দাবি করেছেন।
চার বছর আগে একই সম্মেলনে দেওয়া ভাষণের কথা স্মরণ করে জেলেনস্কি বলেন, তখন রুশ বাহিনী ইউক্রেনে ঢোকার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমা কর্মকর্তারা তখন কাজের চেয়ে কথাই বেশি বলেছিলেন।
জেলেনস্কি বলেন, ট্রাম্পের ক্ষমতা আছে পুতিনকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করার এবং তাঁর সেটা করা উচিত। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলছেন, যেকোনো শান্তি চুক্তির জন্য গণভোট আয়োজন করতে হলে আগে যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন। এই গণভোট জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গেই আয়োজন করা হবে।
সাবেক টেলিভিশন তারকা জেলেনস্কি স্বীকার করেছেন যে তিনি ট্রাম্পের কাছ থেকে 'কিছুটা' চাপ অনুভব করছেন। ট্রাম্প গত শুক্রবার বলেছিলেন, জেলেনস্কির উচিত দ্রুত শান্তি প্রতিষ্ঠার 'সুযোগ' হাতছাড়া না করা এবং তাকে 'এগিয়ে যাওয়ার' তাগিদ দিয়েছিলেন।
জেলেনস্কি বলেন, 'আমেরিকানরা প্রায়ই ছাড় দেওয়ার প্রসঙ্গ তোলে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ছাড়ের আলোচনা শুধু ইউক্রেনের ক্ষেত্রেই হয়, রাশিয়ার ক্ষেত্রে নয়।'
তিনি বলেন, তিনি জানতে চান মস্কো কী ছাড় দিতে প্রস্তুত। কারণ ইউক্রেন ইতিমধ্যে অনেক ছাড় দিয়েছে।
রাশিয়া জানিয়েছে, জেনেভায় তাদের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পুতিনের উপদেষ্টা ভ্লাদিমির মেদিনস্কি। আবুধাবিতে তাদের দলের নেতৃত্বে ছিলেন সামরিক গোয়েন্দা প্রধান ইগর কস্তিউকভ।
শনিবার সাংবাদিকদের জেলেনস্কি বলেন, এই পরিবর্তন ইউক্রেনের জন্য 'বিস্ময়কর'। তাঁর ধারণা, রাশিয়া কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে দেরি করতে চায়।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এর আগে মেদিনস্কির আলোচনার সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, তিনি গঠনমূলক আলোচনার বদলে ইউক্রেনীয় দলকে ইতিহাসের পাঠ দেন।
অমীমাংসিত ভূখণ্ড
আলোচনায় প্রধান বাধা হয়ে আছে ভূখণ্ড বা জমি। রাশিয়া দাবি করছে, ইউক্রেনকে দোনেৎস্কের বাকি ২০ শতাংশ এলাকা ছেড়ে দিতে হবে, যা মস্কো এখনো দখল করতে পারেনি। কিন্তু কিয়েভ এই দাবি মানতে নারাজ।
শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেন, মার্কিন আলোচকরা ইউক্রেনকে জানিয়েছে যে—ইউক্রেনীয় বাহিনী যদি দোনেৎস্কের তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অংশ থেকে সরে যায়, তবে রাশিয়া দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এর আগে জেলেনস্কি বলেছিলেন, তিনি বরং ওই অঞ্চলে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের মার্কিন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে রাজি আছেন। তবে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্রন্টলাইনের বাকি অংশ যেমন আছে তেমনই থাকবে।
ইউক্রেনের প্রধান আলোচক রুস্তেম উমেরভ জানান, এখন দুটি পথ খোলা আছে—হয় ইউক্রেন বর্তমান নিয়ন্ত্রণ রেখাতেই অটল থাকবে, অথবা একটি মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করা হবে।
রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের জাতীয় ভূখণ্ডের প্রায় ২০ শতাংশ দখল করে আছে। এর মধ্যে ক্রিমিয়া এবং ২০২২ সালের হামলার আগে দখল করা দোনবাসের কিছু অংশও রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের শুরু থেকে মস্কো আরও ১.৫ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করেছে। সম্প্রতি ইউক্রেনের শহর ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে রাশিয়ার বিমান হামলায় লাখ লাখ মানুষ এই শীতে বিদ্যুৎ ও হিটিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় গ্রীষ্মের পর ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই বেশি মনোযোগ দেবে।
জেলেনস্কি আশা করেন যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় যুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, ইউরোপ বর্তমানে একপাশে পড়ে আছে, তাদের আরও বড় ভূমিকা পালনের সুযোগ থাকা উচিত। তিনি বলেন, 'টেবিলে ইউরোপের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। আমার মতে এটি একটি বড় ভুল।'
জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়াকে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ মিশন এবং যুদ্ধবন্দি বিনিময়ে রাজি হতে হবে। তাঁর হিসাবে, রাশিয়ার কাছে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার ইউক্রেনীয় সৈন্য বন্দি আছে, আর কিয়েভের কাছে আছে ৪ হাজারেরও বেশি রুশ সৈন্য।
যুদ্ধের পর ইউক্রেনে ফরাসি ও ব্রিটিশ সেনা মোতায়েনের বিষয়ে মস্কো বিরোধিতা করছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন জেলেনস্কি। প্যারিস ও লন্ডন অবশ্য এ বিষয়ে তাদের সম্মতির কথা জানিয়েছে। জেলেনস্কির মতে, পুতিন বিরোধিতা করছেন কারণ তিনি 'আবার ফিরে আসার সুযোগ রাখতে চান'।
