৬৬ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিচ্ছেন ট্রাম্প
জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট সংস্থাসহ মোট ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, শান্তি এবং গণতন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সহযোগিতা সংস্থাগুলোও রয়েছে।
হোয়াইট হাউস বুধবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত এক প্রেসিডেনশিয়াল স্মারকলিপিতে জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এমন একটি পর্যালোচনার পরে যেখানে দেখানো হয়েছে, 'সংস্থা, চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বিরোধী'।
ট্রাম্প বলেন, এই পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে অংশগ্রহণ বন্ধ করবে এবং একই সঙ্গে সেগুলোতে দেওয়া সমস্ত অর্থায়নও বাতিল করবে।
হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত তালিকায় জাতিসংঘের বাইরে ৩৫টি সংস্থা আছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি), ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (আইইউসিএন)।
যদিও হোয়াইট হাউস আইপিসিসি-কে অ-জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, আসলে এটি একটি জাতিসংঘ ভিত্তিক সংস্থা। সংস্থাটি জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্রমাণগুলো মূল্যায়ন করতে এবং রাজনৈতিক নেতাদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য শীর্ষ বিজ্ঞানীদের একত্রিত করে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন প্রদান করে।
এর পাশাপাশি, হোয়াইট হাউস জানিয়েছে যে তারা ৩১টি জাতিসংঘ সংস্থা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতিসংঘের শীর্ষ চুক্তি সংস্থা (ইউএনএফসিসিসি), জাতিসংঘ গণতন্ত্র তহবিল এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ইউএনএফপিএ।
লক্ষ্যবস্তু করা জাতিসংঘের এই সংস্থাগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধের সময় ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোকে সহিংসতা থেকে রক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেয়, যার মধ্যে জাতিসংঘের সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের সুরক্ষায় নিয়োজিত জাতিসংঘের শিশুদের সশস্ত্র সংঘর্ষে সুরক্ষা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধির দপ্তরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের পাঠানো এক বার্তায় জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, জাতিসংঘ বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়া জানাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ কমানোর প্রকাশ্য দাবি করা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে ট্রাম্প মোটেও পিছপা হননি।
গত বছরের অক্টোবরে, ট্রাম্প সেইসব কূটনীতিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন যারা দূষণকারী জাহাজের জ্বালানির ওপর একটি শুল্ক আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের পক্ষে ছিলেন। অথচ এই বিষয়টি আগের একটি সভায় আগেই অনুমোদিত হয়েছিল। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ কার্যকরভাবে চুক্তিটিকে ১২ মাসের জন্য স্থগিত বা ডুবিয়ে দেয়।
ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেস্কা আলবানিজের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আলবানিজে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে আন্তর্জাতিক ও মার্কিন কোম্পানিগুলোর ভূমিকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
২০১৭ সালে, ট্রাম্প সেই দেশগুলোর সাহায্য বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিলেন যারা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের খসড়া প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। মাত্র পাঁচটি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একটি, যারা তাদের অপছন্দের যেকোনো সিদ্ধান্তে 'ভেটো' দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। গত বছরের শেষের দিকে একটি যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করার আগ পর্যন্ত, গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধ বন্ধের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাগুলোকে নস্যাৎ করতে যুক্তরাষ্ট্র বারবার এই ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করেছে।
গত বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করার পর থেকে, ট্রাম্প ইতোমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও), প্যারিস জলবায়ু চুক্তি এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
ট্রাম্প তার প্রথম প্রশাসনের সময়ও এই তিনটি সংস্থা ত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীকালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন সেই সিদ্ধান্তগুলো পরিবর্তন করে পুনরায় সেগুলোতে যোগ দেয়।
হোয়াইট হাউস থেকে আদেশ জারির এক বছর পর, ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রত্যাহার কার্যকর হতে চলেছে।
২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় (ডাব্লিউএইচও) ২৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করেছে, যা যক্ষ্মা এবং কোভিড-১৯ এর মতো মহামারির ন্যায় বিভিন্ন জরুরি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় সংস্থাটির মোট তহবিলের প্রায় ১৮ শতাংশ। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য নিয়োজিত জাতিসংঘ সংস্থার (ইউএনআরডাব্লিউএ) ওপর মার্কিন অর্থায়নের নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে, যা মূলত বাইডেন প্রশাসনের সময় শুরু হয়েছিল।
