মাদুরোর ট্র্যাকস্যুট আর হাতকড়া পরা ‘ঝাপসা’ ছবি যেভাবে সাড়া ফেললো
ছবিটির প্রতিটি কোণেই 'মিম' হয়ে ওঠার সব উপাদান মজুত ছিল। বাজে ফ্রেমিং, ঘোলাটে রেজল্যুশন, পরিচিত এক ব্র্যান্ডের পোশাক এবং অদ্ভুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ছবিটি শেয়ার করে লিখেছিলেন, 'ইউএসএস ইও জিমায় নিকোলাস মাদুরো।'
মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায় ছবিটি। ভেনেজুয়েলার নেতা যে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দি, তার চাক্ষুষ প্রমাণ ছিল এটি। ছবিটি ঐতিহাসিক সন্দেহ নেই, কিন্তু মোটেও নির্দোষ নয়।
ধূসর রঙের নাইকি ট্র্যাকস্যুট পরা মাদুরো দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে হাতকড়া। চোখে কালো কাপড় আর কানে নয়েজ-ক্যানসেলিং ইয়ারপ্লাগ থাকায় তিনি কিছু দেখতে বা শুনতে পাচ্ছেন না। ভেনেজুয়েলার নেতার এই অসহায় ও দুর্বল ভঙ্গি ইন্টারনেটের যুগে অন্যান্য বন্দি নেতার ভাইরাল ছবির কথাই মনে করিয়ে দেয়। ক্ষমতাচ্যুত মানুষ, দুর্বল মানুষ—যাদের সব ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
মাদুরোর এই ছবি ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের আটকের কথা মনে করিয়ে দেয়। উষ্কখুষ্ক চুল, ধুলোমাখা দাড়ি, মাটিতে শুয়ে থাকা সাদ্দামকে মার্কিন সৈন্যরা শিকারের ট্রফি হিসেবে প্রদর্শন করেছিল। সেই ছবিও ছিল অপেশাদার এবং বাজে ফ্রেমের।
কিংবা ২০১১ সালের মে মাসে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেনের বাড়িতে অভিযানের পর রয়টার্স প্রকাশিত পিক্সেলযুক্ত, রক্তাক্ত ছবির কথা ভাবা যাক। লাদেনের তিন দেহরক্ষীর সেই ছবিই ছিল অভিযানের একমাত্র দৃশ্যমান প্রমাণ। ওবামা তখন আল-কায়েদা নেতার লাশের ছবি রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহার করতে চাননি। তিনি বলেছিলেন, 'গোল দেওয়ার মতো করে এটি উদযাপনের বিষয় নয়; আমরা এমন নই।'
২০২৫ সালে এসে ট্র্যাকস্যুট বা স্পোর্টসওয়্যার হয়তো দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু হাতকড়া পরা মাদুরোর এই ছবি ট্রাম্পীয় ক্ষমতার পুরুষতান্ত্রিক ও প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শের এক নিখুঁত প্রকাশ। কার্ল ল্যাগারফেল্ডের সেই কুখ্যাত উক্তিটির যেন এক মূর্ত প্রতীক—'আপনি জীবনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন, তাই একজোড়া সোয়েটপ্যান্ট কিনেছেন।'
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নাইকি লোগোসহ সেই পোশাক সংবাদের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। বিদ্রূপাত্মক মিম তৈরি হতে থাকে অগণিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে বিখ্যাত অভিনেতাদের ওই পোশাকে দেখানো হয়। কিছু ওয়েবসাইট ট্রাফিক বাড়ানোর লোভে শিরোনাম দেয়—'গ্রেপ্তারের সময় মাদুরো যে ট্র্যাকস্যুট পরেছিলেন, তা কোথায় কিনবেন।'
ইনস্টাগ্রামে আর্জেন্টিনার প্রকাশনা সংস্থা 'কাজা নেগ্রা' তাদের ক্যাটালগের লেখক গাই ডেবোর্ডের উদ্ধৃতি দিয়ে এই ট্র্যাকস্যুট উন্মাদনার ব্যাখ্যা দিয়েছে—'চমকপ্রদ দৃশ্যের আড়ালে আধুনিক সমাজজুড়ে তুচ্ছতাই রাজত্ব করছে। পণ্য ভোগের এই যুগে মনে হতে পারে বেছে নেওয়ার মতো অনেক ভূমিকা ও বস্তু আছে, কিন্তু আসলে সবখানেই একঘেয়েমি।'
ভিডিও আর্টিস্ট ও তাত্ত্বিক হিতো স্টেয়ার্ল তাঁর 'ইন ডিফেন্স অব দ্য পুওর ইমেজ' প্রবন্ধে ব্যাখ্যা করেছেন, কেন ডিজিটাল দুনিয়ায় বাজে বা অমার্জিত ছবি এত দ্রুত ছড়ায়। ইন্টারনেটের কাছে অগোছালো ছবির চেয়ে প্রিয় আর কিছু নেই, যা বারবার কপি করা যায় এবং ব্যবচ্ছেদ করা যায়। যুদ্ধের সময় যখন বিশৃঙ্খলা ও প্রেক্ষাপটহীনতাই আসল, তখন প্রচারণার জন্য এমন 'দরিদ্র ছবি' বা পুওর ইমেজই সবচেয়ে কার্যকর। আর সঙ্গে যদি থাকে ২০০ ডলারের এক ট্র্যাকস্যুট, তবে তো কথাই নেই।
