অধ্যাদেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাদ: হোঁচট খেল দুদক সংস্কারের উদ্যোগ
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল বড় প্রত্যাশা নিয়ে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যেই গঠিত হয় দুদক সংস্কার কমিশন। রাজনীতি ও আমলানির্ভরতা কমিয়ে দুদককে শক্তিশালী করতে কমিশন মোট ৪৭টি সুপারিশ দেয়। কিন্তু এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দুদক আইন সংশোধন অধ্যাদেশে স্থান পায়নি।
ফলে দুদক আদৌ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে কি না, সে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দুদক সংস্কার কমিশন গঠন করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশনের অন্যতম সুপারিশের মধ্যে ছিল—দুদকের বিতর্কিত চাকরিবিধির ধারা বাতিল (বিধিমালার ৫৪(২)), কমিশনের মেয়াদ কমিয়ে চার বছর করা, পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন, নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট প্রতিষ্ঠা, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজস্ব জনবল নিয়োগ, প্রতি জেলায় দুদকের কার্যালয় চালু এবং বিদ্যমান বাছাই কমিটির পরিবর্তে বাছাই ও পর্যবেক্ষক কমিটি গঠন।
এছাড়া অভ্যন্তরীণ ইন্টিগ্রিটি ইউনিট চালু, বাজেট অনুমোদন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরতা কমানো, অভিযোগ গ্রহণ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সময়াবদ্ধ করা, কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং দুদকের কার্যক্রমে জনআস্থা ফেরানোর বিষয়েও কমিশন গুরুত্ব দেয়।
গত নভেম্বরে উপদেষ্টা পরিষদ দুদক আইন সংশোধন অধ্যাদেশ অনুমোদন করে। যদিও সরকার এখনো অধ্যাদেশের পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ করেনি। তবে প্রাপ্ত তথ্য ও সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংস্কার কমিশনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ সেখানে বাদ পড়েছে বা দুর্বলভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সরকার কমিশন গঠন করলেও এর আশু ও মৌলিক সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। বরং অধ্যাদেশের মাধ্যমে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলো সংস্কারের মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, খসড়া অধ্যাদেশটি বিদ্যমান আইনের চেয়ে কিছুটা উন্নত সংস্করণ এবং এতে দুদক সংস্কার কমিশনের কোনো কোনো সুপারিশের প্রতিফলন ঘটেছে। তবে সংস্কার কমিশনের বেশ কিছু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ খসড়ায় বাদ দেওয়া বা অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, যা হতাশাজনক।
কমিশনার নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও কমিশনের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংস্কার কমিশন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছিল বলে উল্লেখ করেন ইফতেখারুজ্জামান। কিন্তু সরকার পর্যালোচনা অংশটি বা দুদকের দায়িত্ব পালনে সাফল্য-ব্যর্থতার ষাণ্মাসিক পর্যালোচনার সুপারিশটি প্রত্যাখ্যান করেছে বলে জানান তিনি।
'অর্থাৎ যে কারণে জন্মলগ্ন থেকে দুদক ক্ষমতাসীনদের সুরক্ষা আর প্রতিপক্ষের হয়রানির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, সরকার সে অবস্থার পরিবর্তন চাইছে না,' বলেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার বাছাই কমিটিতে সদস্য হিসেবে সংসদে বিরোধী দলের প্রতিনিধি মনোনয়নের এখতিয়ার বিরোধী দলের নেতার পরিবর্তে অযাচিতভাবে স্পিকারের হাতে দেওয়া হয়েছে; যা বাস্তবে সরকারি দলের প্রভাব জোরদার করারই প্রয়াস। 'একইসঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী ও সুশাসনের কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন বাংলাদেশি নাগরিককে কমিটির সদস্য হিসেবে মনোনয়নের দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু তা রাষ্ট্রপতির হাতে অর্পণ করা হয়েছে। তাছাড়া প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত নামের তালিকা প্রকাশের প্রস্তাবিত বিধানটিও বাদ দিয়ে সরকার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।'
অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুদক আইনের সংশোধন, দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালার মধ্যে আশু করণীয় হিসেবে নির্ধারিত বিষয়ের অংশবিশেষ মাত্র বলে উল্লেখ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
অধ্যাদেশে যেভাবে ছাঁটাই হলো দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ
দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ছিল কেবল কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বরং একটি স্বাধীন কিন্তু জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার রূপরেখা। কিন্তু পরবর্তীতে অনুমোদিত অধ্যাদেশে সেই দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বাদ পড়ে যায় বা দুর্বল হয়ে যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে, তা হলো দুদকের জবাবদিহির স্বাধীন কাঠামো। কমিশন প্রস্তাব করেছিল, দুদকের কর্মকাণ্ড তদারকির জন্য বিচার বিভাগ, সংসদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বসহ একটি বহুপক্ষীয় ওভারসাইট মেকানিজম থাকবে। কিন্তু অধ্যাদেশে এমন কোনো কাঠামো রাখা হয়নি।
একইভাবে, দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার সুপারিশও অধ্যাদেশে কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে। শক্তিশালী ও অংশগ্রহণমূলক সার্চ কমিটির বদলে আগের মতোই নির্বাহী ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণাধীন কাঠামো বহাল রাখা হয়েছে।
দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি মোকাবিলায় স্বতন্ত্র 'ইন্টিগ্রিটি ইউনিট', আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন, ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে আইনি সুরক্ষা এবং মামলা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ মানদণ্ড নির্ধারণ—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও অধ্যাদেশে প্রতিফলিত হয়নি।
ফলে দুদক সংস্কার কার্যত এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে স্বাধীনতা আছে কিন্তু জবাবদিহি নেই, ক্ষমতা আছে কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।
শঙ্কা যেখানে
দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোকে 'কসমেটিক' সুপারিশ মনে করছেন দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মো. মইদুল ইসলাম। তিনি টিবিএসকে বলেন, 'সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোতে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের কথা বলা হয়নি। শুধু একটি সুপারিশ কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। সেটি হলো—বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি।'
তিনি আরও বলেন, 'যদিও এ কমিটিতেও সরকারি প্রতিনিধির আধিক্যই বেশি থাকবে, তবু বর্তমানের চেয়ে কিছুটা প্রভাবমুক্ত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এটা অধ্যাদেশে রাখা হয়েছে। তবে এ কমিটির সুপারভাইজিং করার ক্ষমতা রাখা হয়নি।'
মইদুল বলেন, 'সংস্কার কমিশনের কিছু বিষয়ে সিরিয়াসলি অ্যাড্রেস করার দরকার ছিল। সংস্কার কমিশন দুদকের কমিশনার বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল এবং অধ্যাদেশেও সেটা অনুমোদন করা হয়েছে। অথচ প্রয়োজন ছিল দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কর্মকর্তা বাড়ানোর।
'দুদকের জনবল ২ হাজার, এরমধ্যে তা-ও আবার ১ হাজার শূন্য। যারা আছেন, তারমধ্যে সবাই অনুসন্ধান ও তদন্ত কর্মকর্তা নন। এত বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য এটা খুবই নগণ্য। কমিশনের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর তুলনায় দুদকের জনবল বাড়ানোর সুপারিশ জরুরি ছিল।'
তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যদি কারও বিরুদ্ধে থাকে বা কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়, তাহলে তিনি অব্যাহতি না পাওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না—এমন সুপারিশ করা দরকার ছিল। 'কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় দুর্নীতির সাজা হলে আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ নিয়েই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে।'
মইদুল মনে করেন, দ্রুত বিচারের জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা প্রয়োজন ছিল। 'প্রতি বিভাগে অন্তত একটি বিচারিক ও একটি আপিল ট্রাইব্যুনাল থাকলে দ্রুত বিচার সম্ভব হতো। বর্তমানে সব মামলা হাইকোর্টে গিয়ে আটকে থাকে, ফলে দুর্নীতির মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।'
দুদকের সাবেক এই মহাপরিচালক বলেন, অধ্যাদেশে যেসব বিষয় আছে তা বাস্তবায়ন হলেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন না তিনি। কারণ যে বিষয়গুলো সবচেয়ে জরুরি ছিল, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
