ভ্যাকসিন পাসপোর্ট: ভ্রমণে গতি আনলেও, তুলে দেবে বিভেদের দেওয়াল
প্রাণঘাতী কোভিড অবসানের চেষ্টায় দেশে দেশে গতিশীল হচ্ছে টিকাদানের উদ্যোগ। তারমধ্যেই অন্যরকম এক ভ্যাকসিনের কথা উঠেছে, প্রকৃতপক্ষে তা হলো; ভ্যাকসিন পাসপোর্ট।
গেল সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) তাদের নতুন ডিজিটাল ভ্রমণ পাস চালু করে। এসময় সংস্থাটি জানায়, এ পদক্ষেপ কোয়ারেন্টিনের ঝামেলা মুক্ত পূর্ণদ্যমে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সচলের পথে অগ্রগামী ভূমিকা রাখবে।
ডিজিটাল এই পাস হলো; একটি মোবাইল অ্যাপ। ৩০টি এয়ারলাইন্স এটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখেছে। এর সহায়তায় নানান দেশের সরকার এবং এয়ারলাইন্সগুলো ভ্রমণের আগেই যাত্রীদের কোভিড-১৯ টেস্ট এবং টিকাগ্রহণ সম্পর্কিত তথ্য সহজে জানতে পারবে।
একই ধরনের অ্যাপ চালু করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এবং ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স। যাত্রীদের স্বাস্থ্যগত তথ্য এর মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা থাকবে। ডেনমার্ক এবং সুইডেনের মতো দেশও নিজেদের মতো করে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাসপোর্ট চালু করছে। নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা দেখে এনিয়ে তীব্র উৎসাহী প্রযুক্তি খাতের জায়ান্টরাও।
প্রশ্ন হলো; ডিজিটাল হেলথ পাসপোর্ট আসলে কী এবং দেশ-বিদেশ ভ্রমণে এর প্রভাব কেমন হবে?
ডিজিটাল হেলথ পাস- নামেই বেশি পরিচিত এ পদ্ধতিটি হলো ভ্যাকসিন গ্রহণের ডিজিটাল নথি। করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকা যিনি নিয়েছেন, তার সরকারি স্বীকৃতি এখানে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ফোন বা ডিজিটাল ওয়ালেটে থাকা এমন অ্যাপ পরীক্ষায় ব্যবহৃত হবে বিশেষ কিউআর কোড। ভ্যাকসিন না নিলেও কেউ যদি ভ্রমণের আগে করা স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কোভিড-১৯ নেগেটিভ প্রমাণিত হন- সেই তথ্যও জানা যাবে।
এধরনের নথি আসলে নজিরবিহীন কিছু নয়। কয়েক দশক ধরে কলেরা, পীতজ্বর এবং রুবেলার মতো রোগের টিকার ক্ষেত্রে এমন একটি 'হলুদ কার্ড' বহন করেছেন আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীরা। ১৯৭০ এর দশকে কিছু দেশ ভ্রমণে যা ছিল বাধ্যতামূলক।
তবে এবারই প্রথমবারের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছে এয়ারলাইন্স শিল্প। যুগের বিবেচনায় তা খুবই প্রাসঙ্গিক। ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় জাতীয় ডাটাবেজের সাহায্যে সহজেই জানা যাবে; কারো প্রকৃত স্বাস্থ্যগত অবস্থা, তিনি কোন কোম্পানির তৈরি টিকা নিয়েছেন বা কবে নিয়েছেন। সেক্ষেত্রে কমবে দীর্ঘমেয়াদি কাগজপত্র পরীক্ষার সমস্যা আর জাল নথির বিড়ম্বনা।
আয়ারল্যান্ড ভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা অ্যাক্সেনশিওর- ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইক ট্যানসি কোভিড-পূর্ব সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরের দৈনিক যাত্রী সংখ্যার উল্লেখ করে বলেন, "একবার ভাবুন দৈনিক আপনাকে ১,৮০,০০০ জনের স্বাস্থ্য বিষয়ক কাগজের নথি পরীক্ষা করা এবং সেগুলো সত্যায়নের কাজ করতে হচ্ছে। নির্ভুলভাবে ও দ্রুতগতিতে- তা করা প্রায় অসম্ভব। একারণেই ডিজিটাল ব্যবস্থা অনেক বেশি ভ্রমণ সহযোগী।"
তবে এনিয়ে বিতর্কও কম হচ্ছে না। এমন পরিচয়পত্র বৈষম্যের নতুন দেওয়াল জন্ম দেবে- এমন সমালোচনাও হচ্ছে। তারমধ্যেই, ইউরোপিয় কমিশন 'ডিজিটাল গ্রিন পাস' নামের পদক্ষেপের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করে। এটি থাকলে পুরো মহাদেশটির যেকোনো দেশে ভ্রমণ করা যাবে।
তবে বিদেশীদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে তৎপর হলেও, ইইউ কিন্তু তার সদস্য ২৭টি দেশে সমানভাবে টিকাদান নিশ্চিত করতে পারেনি। এই যেমন; ৩ মার্চ নাগাদ ফ্রান্সে টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ, সার্বিয়ায় ২২.৫ শতাংশ, মাল্টায় ১৯ শতাংশ এবং ডেনমার্কে ১১ শতাংশ।
অর্থাৎ, টিকাপ্রাপ্তির বিবেচনায় ইইউ নাগরিকদের মধ্যেই হবে প্রথম বৈষম্য। উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে তার মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই বেশি হবে। জন্ম নেবে টিকা প্রাপ্তির সুযোগের ভিত্তিতে দুই ধরনের সামাজিক শ্রেণি। নিজ দেশে সুশাসনের অভাবে ও দুর্নীতির কারণে যারা টিকাগ্রহণের সুযোগ পাননি, তারা উন্নত দেশে গিয়ে নতুন জীবন শুরুর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগটাও হারাবেন।
শুরু থেকেই তাই এ ধরনের ইম্যিউনিটি পাসপোর্ট চালুর বিরোধিতা করে আসছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। ভ্যাকসিন আসার অনেক আগে মহামারির প্রথমদিকে বা গেল বছরের এপ্রিলে জাতিসংঘের সংস্থাটি জানায়, যারা ইতোমধ্যেই সংক্রমিত হয়ে সেরে উঠেছেন, তারা যে দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হবেন না- এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এমন পাসপোর্ট বিভেদ তৈরি করারও কোনো অর্থ নেই। টিকা আসার পর এখনও এই পদক্ষেপের বিরোধী হু। অবশ্য, এখন তাদের কারণ আরও যৌক্তিক ও মানবিক।
হু'র নির্বাহী পরিচালক ডা. মাইকেল রায়ান গত সোমবার জেনেভা থেকে এক ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে জানান, "পৃথিবীজুড়ে পর্যাপ্ত টিকার ডোজ সরবরাহ নেই। বিশেষত নেই সমতার ভিত্তিতে সকল দেশের জন্য বন্টনের ব্যবস্থা। এজন্যই আমরা ভ্যাকসিন সনদ চালু করার পরামর্শ দিচ্ছি না।"
হু'র ইম্যিউনাইজেশন, ভ্যাকসিন অ্যান্ড বায়োলজিক্যালস বিভাগের পরিচালক ক্যাথারিন ও'ব্রায়ান বলেন, "ইলেট্রনিক ভ্যাকসিন সনদ চালু হলে ভ্রমণের জন্যে টিকাগ্রহণের গুরুত্ব মানুষ নতুন করে উপলদ্ধি করবে, তৈরি হবে টিকা নেওয়ার ইতিবাচক মনোভাব- এই সত্যিটি আমরা জানি। তাতে নিরাপত্তা যেমন বাড়বে তেমনি ভ্রমণের ক্ষেত্রে এটি থাকা হবে বাধ্যতামূলক। আর এই দ্বিতীয় ঘটনাই আমাদের আপত্তির প্রধান কারণ।"
- সূত্র: সিএনএন ও সিএনবিসি