সংকটে বন্ধকির ব্যবসা; স্বর্ণ বিক্রি করে পরিশোধ করছে ঋণ
পুরান ঢাকার ৪০০টি বন্ধকি দোকান ঋণ দিয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
রোজিনা আক্তার (৩০) পেশায় একজন গৃহিণী। স্বামীর ভ্রাম্যমান দোকানে হালিম বিক্রির টাকায় তাদের সংসার চলে। মহামারির সময় স্বামীর দোকান বন্ধ থাকায় বাসাভাড়া ও পরিবারের খরচ মেটাতে বিয়ের সময়ে স্বামীর দেওয়া ২ ভরি স্বর্ণের গহনা স্বর্ণের বন্ধক রেখে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন মাসিক ৪ শতাংশ হার সুদে।
রোজিনা আক্তার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "অভাবের সময় কোন উপায় না পেয়ে বন্ধকি দোকানে তিন মাসের জন্য স্বর্ণ রেখে টাকা ঋণ নেই। কিন্তু, নয় মাস হয়ে গেলেও, টাকার অভাবে এখনও স্বর্ণ ছাড়াতে পারিনি, দুই মাসের সুদের টাকাও পরিশোধ করা হয়নি এখনও। ভাবছি স্বর্ণ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করে দেব।"
শুধু রোজিনাই নয়, মহামারির সময় অর্থ সংকটে পড়ে স্বর্ণ বন্ধক রাখা অধিকাংশ মানুষই তাদের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। অনেকে ঋণ এবং সুদের টাকা পরিশোধের জন্য বন্ধক রাখা স্বর্ণ বিক্রি করে দিচ্ছেন ঋণদাতার কাছেই।
পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারের অমিত জুয়েলার্সে প্রায় ৩১ বছর ধরে স্বর্ণের ব্যবসা করছে। স্বর্ণালংকার তৈরি, বিক্রি ছাড়াও বেশ কয়েক বছর ধরেই স্বর্ণালংকার জমা রেখে বন্ধকির ব্যবসা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
মহামারির আগে বন্ধকি ব্যবসা মোটামুটি সচল থাকলেও- বর্তমান সময়ে তাদের গ্রাহক প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গিয়েছে। তবে সেই অনুপাতে স্বর্ণালংকার বিক্রয়কারী গ্রাহক আগের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানান অমিত জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী দিপু সরকার।
দিপু সরকার টিবিএসকে বলেন, "করোনার শুরুতে আমাদের দোকানগুলো প্রায় ৩ মাস বন্ধ থাকে। তবে যারা বন্ধক রেখে যেত, তাদের প্রতি সপ্তাহে একদিন সময় দিয়ে ওই দিনই লেনদেন হতো। লকডাউনের সময় স্বাভাবিক অবস্থার চেয়েও আমাদের বন্ধকি গ্রাহক বেড়ে যায়। আর যারা আগে টাকা নিয়েছে, তারাও এসে তাদের সুদ দিয়ে যেত।"
কিন্তু, মহামারির পরিস্থিতি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হলে এ ব্যবসা কমতে শুরু করে। এখন দিনে ২/১ জন গ্রাহক আসে তাদের স্বর্ণালংকার বন্ধক রাখতে।
অংকন গোল্ড হাউসের মালিক পাপন দাস বলেন, "গত কয়েক দিনে আমার দোকানে কোন ক্রয়-বিক্রয়, এমনকি একটি বন্ধক পর্যন্ত হয়নি। লকডাউনের মধ্যে এবং লকডাউন পরবর্তী কয়েকদিনের মধ্যে প্রচুর স্বর্ণ বন্ধক রেখে মানুষ ঋণ নিয়ে গেছে। লকডাউন পরবর্তী সময়ে দিনে ১৫-২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে গেছে গহনা বন্ধক রেখে। এখন মানুষের কাছে তেমন অবশিষ্ট স্বর্ণ নেই- যা বন্ধক রাখতে আসবে এবং হাতে টাকাও নেই যে স্বর্ণ কিনবে।"
তার ছোট পরিসরের দোকান থেকেই স্বর্ণ বন্ধক রেখে ৭০ লাখ টাকার ঋণ নিয়েছে উল্লেখ করে পাপন বলেন, "নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও অধিকাংশ গ্রাহক, প্রায় ৯০ শতাংশই টাকার অভাবে স্বর্ণ ফেরত নিচ্ছেন না। তার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ গ্রাহক সুদ পর্যন্ত পরিশোধ করছেন না, বারবার শুধু সময় চেয়ে নিচ্ছেন।"
সম্প্রতি ঢাকার তাঁতীবাজার, শাখারি বাজার, ইসলামপুর, নিউমার্কেট, গাউসিয়া, বাড্ডা, বাইতুল মোকাররম-সহ বেশ কয়েকটি এলাকার জুয়েলারি দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় সব দোকানেই স্বর্ণ কেনা-বেচার পাশাপাশি বন্ধকও রাখা হয়। তবে তাঁতীবাজার ও শাখারিবাজার এলাকায় বেশি সংখ্যক দোকানে বন্ধকি কারবার চলে। বিশেষ করে, তাঁতীবাজার ও শাখারিবাজারের বন্ধকি দোকানগুলোতে মহামারির সময় প্রায় প্রতিটি দোকানেই ৪০-৫০ লাখ টাকার স্বর্ণ বন্ধকের চড়া সুদের ঋণ পড়ে আছে গ্রাহকদের কাছে।
কিছুদিন আগে স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়ায়; স্বর্ণালংকার বিক্রি করা গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে জানিয়ে অমিত জুয়েলার্সের দিপু সরকার বলেন, "যে অনুপাতে বন্ধকি গ্রাহক কমেছে সেই অনুপাতে বিক্রির গ্রাহক বেড়েছে। তবে আমাদের বন্ধকি ব্যবসাতেই লাভ বেশি। স্বর্ণালংকার কিনে রাখলে আমাদের লাভ কম হয়। আবার স্বর্ণের দাম কমে গেলে, আমরা তো মাঠে মারা যাবো।"
স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে যাওয়া অনেক গ্রাহক তাদের ঋণ পরিশোধের জন্য বিক্রি করে দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারেই স্বর্ণ কারবারির প্রায় ১০ হাজার দোকান রয়েছে। যেগুলোর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার দোকানে স্বর্ণালংকার ক্রয়-বিক্রি-বন্ধকির কাজ চলে। তাঁতীবাজারে প্রায় ২৫০ টি স্বর্ণের দোকানে বন্ধকি কারবার হয়। এছাড়া শাখারিবাজারে এ সংখ্যা ১৫০ এর মতো।
তবে খোঁজ নিয়ে এবং ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দোকানগুলোর প্রায় সবগুলোতেই বন্ধকি কারবার চলে। এদের মধ্যে অনেকেই- তা প্রকাশ করেন না। তাদের নিজস্ব গ্রাহকদের মধ্যে এ লেনদেন চলে বলেও জানান অনেকে।
পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে প্রায় চারশো বছর ধরে স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে তার বিপরীতে উচ্চ সুদে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ঋণ দেওয়া এবং তা সুদসহ পরিশোধের পর গ্রাহকদের স্বর্ণালংকার ফেরত দেওয়ার এ ব্যবসা চলমান রয়েছে। ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শুধু তাঁতীবাজারেই নয় দেশের বিভিন্ন স্থানেই প্রকাশ্যে কিংবা নীরবে চলছে এ ব্যবসা। বন্ধকি ঋণের বিপরীতে মাসে ৩-৫ শতাংশ এবং বছরে ৩৬- ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হয়। এমনকি অনেক গ্রাহকের ঋণের টাকার কয়েকগুণ পর্যন্ত সুদ গুনতে হয়। যদিও, এ ব্যবসার বৈধতার বিষয়ে সঠিক কোন নির্দেশনাও নেই।
দু-তিন বছর ধরেই ব্যবসায় মন্দা:
শুধু মহামারির কারণেই নয়, গত ২/৩ বছর ধরেই বন্ধকির ব্যবসা কমে যাচ্ছে উল্লেখ করে আরেক দোকান মালিক নারায়ণ ঘোষ বলেন, আগে তাঁতীবাজারে হাতে গোনা কয়েকটি দোকানে বন্ধকির ব্যবসা হত, কিন্তু এখন স্বর্ণের প্রতিটি দোকানই প্রত্যক্ষভাবে কিংবা লুকিয়ে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের গ্রাহক কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) কোষাধ্যক্ষ ও তাঁতীবাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পবিত্র চন্দ্র ঘোষ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করোনার মধ্যে লকডাউনের সময় তো বলা যায় পুরোপুরি বন্ধই ছিল। গেল বছরের শেষের দিকে বিক্রি স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। বর্তমানে ব্যবসা (স্বর্ণালংকার বিক্রি) আগের মতো কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।"
বন্ধকির গ্রাহক প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গিয়েছে উল্লেখ করে পবিত্র ঘোষ বলেন, "অনেকেই অল্প পুঁজি দিয়ে এ ব্যবসাটি শুরু করে, তাদের জন্য কঠিন সময় যাচ্ছে। গ্রাহক কমে যাওয়ার কারণে এবং গ্রাহকরা তাদের সময় অনুযায়ী স্বর্ণ ছাড়িয়ে না নেওয়ার কারণে, অনেকেরই ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। যাদের মূলধন বেশি শুধু তারাই হয়তো টিকে যাবেন।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা টিবিএসকে বলেন, "স্বর্ণ বন্ধকির ব্যবসা ঘিরে নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। তাই এ ব্যবস্থায় গ্রাহকদের অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হন। যদি নিয়মানুযায়ী ফিনানশিয়াল ইনক্লুয়েশন্স এর মধ্যে গ্রাহকদের আনা যায়, কিংবা ব্যাংকে টাকা রাখা, ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া এ ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত করা যায়- তাহলে তাদের ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব।"
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি কিংবা কমানোর নির্দিষ্ট নীতিমালা করা উচিৎ, উল্লেখ করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, "করোনা মহামারির সময় স্বর্ণের দাম বেড়ে গিয়েছে। তাই অনেকেই তাদের ঋণ পরিশোধের জন্য বিক্রি করে দিচ্ছেন।"
সাধারণত মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষ স্বর্ণকে এক ধরনের সঞ্চয় সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করেন এবং তাদের প্রয়োজনে বন্ধক রেখে ঋণ নিয়ে থাকেন। আর মহামারির মধ্যে মানুষের সঞ্চয় ভাঙ্গানোর কৌশলের সাথে স্বর্ণ বন্ধকের বিষয়টি জড়িত ছিল। যারা আয় পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন, তারা হয়তো ঋণ পরিশোধ করেছেন। তবে, যারা এখনও মহামারির ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেননি, তারা হয়তো স্বর্ণ বিক্রি করেই ঋণ পরিশোধ করছেন।
