জোহরান মামদানির নাগরিকত্ব বাতিলের রিপাবলিকানদের চেষ্টা কি সফল হবে?
জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর, শহরের প্রথম মুসলিম এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় মেয়র-নির্বাচিত হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু ওয়াশিংটনে তার রিপাবলিকান বিরোধীরা জানিয়েছেন, তারা তাকে এই পদে বসতে দেবেন না।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি মামদানি জিতলে নিউইয়র্ক সিটির জন্য ফেডারেল তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি মামদানির নাগরিকত্ব নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রশ্নগুলোকে আরও উস্কে দিয়েছেন এবং উগান্ডায় জন্মগ্রহণকারী এই ৩৪ বছর বয়সী নেতাকে একজন কমিউনিস্ট বলে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।
কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা মামদানির নাগরিকত্ব অর্জনের প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্তের দাবি তুলেছেন এবং তার মার্কিন নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা কোনো প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ করেছেন যে, মামদানি কমিউনিস্ট এবং 'সন্ত্রাসবাদী' কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন।
রিপাবলিকান দলের প্রতিনিধি অ্যান্ডি ওগলস ২৯ অক্টোবর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, 'মামদানি যদি তার নাগরিকত্বের নথিতে মিথ্যা বলে থাকেন, তবে তিনি নাগরিক হওয়ার অধিকার রাখেন না, এবং নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। একটি মহান আমেরিকান শহর একজন কমিউনিস্টের দ্বারা শাসিত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে, যিনি সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন।' তিনি আরও বলেন, 'আমেরিকার নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় কমিউনিস্ট বা সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকলে তা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক। আমার সন্দেহ, তিনি তা করেননি। যদি এটি প্রমাণিত হয়, তবে উগান্ডাগামী প্রথম ফ্লাইটেই তাকে তুলে দিন।'
ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি র্যান্ডি ফাইন নিউজম্যাক্স-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মামদানির আমেরিকায় বসবাসের সময়কাল নিয়ে ভুল তথ্য দিয়ে বলেন, 'বর্বররা আর ফটকের বাইরে নেই, তারা ভেতরে ঢুকে পড়েছে... আর মাত্র আট বছর আগে এখানে আসা মামদানি তার এক দারুণ উদাহরণ। আমার পড়াশোনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিনি নাগরিকত্ব পাওয়ার শর্ত পূরণ করেননি।'
তবে, পলিটিফ্যাক্ট-এর অনুসন্ধানে মামদানির নাগরিকত্বের আবেদনে মিথ্যাচারের কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
উগান্ডায় জন্মগ্রহণকারী মামদানি ১৯৯৮ সালে মাত্র ৭ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং ২০১৮ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মার্কিন নাগরিক হতে হলে সাধারণত একজন আইনসম্মত স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে পাঁচ বছর একটানা দেশে বসবাস করতে হয়, অথবা কোনো মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করলে তিন বছর।
নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া, যাকে বলা হয় 'ডিন্যাচারালাইজেশন', শুধুমাত্র আদালতের আদেশের মাধ্যমেই করা সম্ভব। এটি খুব কমই ব্যবহার করা হয়েছে, যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে আসা নাৎসিদের বিতাড়ন বা ' সন্ত্রাসবাদে' দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে।
অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তারা ওগলস এবং ফাইনের অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেখেননি।
অভিবাসন আইনজীবী জেরেমি ম্যাককিনি বলেন, 'নাগরিকত্ব বাতিল একটি চরম এবং বিরল প্রতিকার, যার জন্য সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে আবেদনকারী বেআইনিভাবে নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন। আমি এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেখিনি যে তিনি শপথ নেওয়ার সময় অযোগ্য ছিলেন।'
অভিযোগগুলোর ভিত্তি কতটা শক্ত?
মামদানির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার এই চেষ্টা শুরু হয়েছিল আরও আগে, যখন তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন। ওগলস অভিযোগ করেছেন, মামদানি ২০১৭ সালে তার লেখা একটি র্যাপ গানে 'হোলি ল্যান্ড ফাইভ'-কে সমর্থন করেছিলেন। এটি ছিল একটি মুসলিম দাতব্য সংস্থার পাঁচজন সদস্যের প্রতি ইঙ্গিত, যারা ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে ২০০৮ সালে দোষী সাব্যস্ত হন।
ওগলস ও ফাইনের আরেকটি অভিযোগ হলো, মামদানি তার নাগরিকত্বের আবেদনপত্রে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকা (ডিএসএ)-র সদস্যপদের কথা উল্লেখ করেননি; তাদের মতে এটি একটি কমিউনিস্ট সংগঠন।
কিন্তু ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকা কোনো কমিউনিস্ট পার্টি নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কমিউনিজমের বিকল্প হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছিল। আইনজীবী ম্যাককিনির মতে, 'ডিএসএ-র সদস্যপদ নাগরিকত্বের পথে কোনো বাধা নয়; এবং হোলি ল্যান্ড ফাইভ নিয়ে লেখা গানটি বাকস্বাধীনতার অংশ।'
এই ধরনের মুসলিম-বিরোধী বক্তব্য প্রচারণার সময় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। মুসলিম অ্যাডভোকেসি গ্রুপ কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস এই নাগরিকত্ব বাতিলের দাবিকে 'বর্ণবাদী এবং ইসলামবিদ্বেষী' বলে অভিহিত করেছে।
মামদানি নিজেও অক্টোবরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'ইসলামভীতি এই দেশের রাজনীতিতে একটি রোগের মতো... মুসলমানরা যে এই শহরেরই অংশ, তা মেনে নিতে না চাওয়ার মানসিকতা থেকেই এর জন্ম।'
মামদানিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার ভিন্ন কৌশল
নিউইয়র্ক ইয়ং রিপাবলিকান ক্লাব এখন ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। তারা সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর কথা বলছে, যা কোনো বিদ্রোহে জড়িত বা দেশের শত্রুদের সাহায্যকারী ব্যক্তিকে পদে বসতে বাধা দেয়। তাদের অভিযোগ, মামদানি 'হামাস-পন্থী' গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করে শত্রুদের সাহায্য করেছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি সুদূরপ্রসারী চেষ্টা, কারণ এর জন্য কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হবে এবং সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে।
বিচার বিভাগ ফৌজদারি মামলা বা দেওয়ানি মামলার মাধ্যমে নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই, সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে আবেদনকারী কোনো মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন যা আবেদনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারত।
কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক ক্যাসান্ড্রা বার্ক রবার্টসন বলেন, 'মামদানির বিরুদ্ধে কোনো মামলা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।' তিনি আরও বলেন, 'এর বড় ঝুঁকি হলো, এর ফলে সাধারণ মানুষ, যাদের সম্পদ কম, তারা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পেতে পারে।'
যদিও যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব বাতিলের ঘটনা বিরল, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে এর সংখ্যা বেড়েছে।
যদি কোনোভাবে মামদানির নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়, তবে তিনি তার পূর্ববর্তী অভিবাসন স্থিতি অর্থাৎ আইনসম্মত স্থায়ী বাসিন্দা—হিসেবে গণ্য হবেন। আর ফলে তিনি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করার যোগ্যতা হারাবেন।
