আগামী ৫ বছরে ব্র্যান্ড ইমেজের ওপর আরও গুরুত্ব দেবে পূবালী ব্যাংক: এমডি

ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল সার্ভিসে এগিয়ে থাকা পূবালী ব্যাংক সামনের দিনে সার্ভিসগুলো আরও বাড়াতে পুরোদমে কাজ শুরু করেছে। তবে ব্যাংকটির অপারেটিং প্রোফিট, ক্লাসিফাইড লোনসহ ফাইন্যান্সিয়াল পারফর্মেন্স সবক্ষেত্রে ভালো হলেও সে অনুযায়ী ব্র্যান্ড ইমেজ নির্মাণ হয়নি এখনও।
এর পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ৫ বছরে ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরিতে মনযোগ দিতে যাচ্ছে পূবালী ব্যাংক।
এসব নিয়েই পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলী কথা বলেছেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ন্ডের সঙ্গে।
কেমন চলছে পূবালী ব্যাংক?
১৯৫৯ সালে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর আমাদের ব্যাংকের অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক ছিল না। ক্লাসিফাইড লোন ছিল অনেক বেশি। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে ব্যাংকটিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। তখন বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরপরে ২০০৭ সাল থেকে আমরা বেশ ভালো পারফর্ম করছি। এর অন্যতম কারণ হলো কর্পোরেট গভর্নেন্স। পরিচালনা পর্ষদ থেকে আমাদের কাজে কোনো হস্তক্ষেপ করা হয় না।
এছাড়া, কোর ব্যাংকিং এর মতো নতুন প্রযুক্তি ব্যাংকিং খাতে নিয়ে আসতে আমরা দেশিয় প্রযুক্তিবিদদের ওপর ভরসা রেখেছি। আমাদের দেশের প্রযুক্তিবিদরাই ২০১৪ সালে আমাদের সবগুলো ব্রাঞ্চকে কোর ব্যাংকিং এর আওতায় নিয়ে আসতে মূল ভূমিকা রেখেছে। আমরা চেয়েছিলাম, এই কাজ সম্পন্ন করতে কোনো ডলার দেশের বাইরে পাঠাবো না। এ লক্ষ্যে আমরা সফল হয়েছি।
২০০৭ সালে আমরা ২২তম ব্যাংক ছিলাম। এখন অপারেশনাল প্রোফিটে আমরা বাংলাদেশের এক নম্বর। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আমরা ৬৯৩ কোটি টাকা প্রোফিট করেছি। একই সময়ে আর্নিং পার শেয়ারেও আমরা সবার চেয়ে এগিয়ে আছি।
এছাড়া, আমরা ক্লাসিফাইড লোন আরও কমিয়ে ২.৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে এনেছি। অনেক ব্যাংকই ডিপোজিট ক্রাইসিসে পড়েছে, সেখানে আমাদের ডিপোজিট দিনদিন বাড়ছে।
আমাদের একটা বড় ভিশন ছিল, আমরা 'প্রোভাইডিং কাস্টমার সেন্ট্রিক লাইফ লং ব্যাংকিং সার্ভিস' দেবো। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় অনেক কাস্টমারের সাথে ২০-৩০ বছর বা জেনারেশন টু জেনারেশন সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছি।
ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে আমরা আমাদের সব ডিজিটাল সার্ভিস ফ্রি করে দিয়েছি। এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাংকেই এটি ফ্রি নয়। এটি নিয়ে আমরা সামনে প্রচারণা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি।
সর্বশেষ বছর শেষে পূবালী ব্যাংক তার কর্মীদের বেশ কয়েকটি ইন্সেনটিভ বোনাস দিয়েছে। এই বোনাস কর্মীদের ওপর কেমন প্রভাব ফেলেছে?
গত বছর আমরা ৬টা ইন্সেনটিভ বোনাস দিয়েছি। তার আগের বছর ৫টি দিয়েছিলাম। কোভিডের সময়ও আমরা সাড়ে ৪টি দিয়েছি। এছাড়া, এই মহামারির সময়ে অনেকে যখন কর্মী ছাটাই করেছে, তখন আমরা স্যালারি স্কেল ৩০ শতাংশ বাড়িয়েছি।
বৈশাখী ভাতাও আমরা অব্যাহত রেখেছি। এসব কারণে বছরে আমাদের প্রায় ২০০ কোটি টাকা খরচ বেড়েছে; এরসঙ্গে আমাদের প্রোফিটও কিন্তু বেড়েছে।
কর্মীদের আর্থিকভাবে ঠিকঠাক মূল্যায়ন না করলে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে না। আর তাদের মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না থাকলে সেটি কাস্টমার সার্ভিসে প্রভাব ফেলে।
১০ বছর আগে আমার যা কর্মী নিতাম, তাদের অর্ধেক অন্য জায়গায় চলে যেতো। এখন অন্য ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা আমাদের ব্যাংকে আসতে চায়। আগে একটা সময় আমরা বড় পদগুলোতে সার্কুলার দিয়ে উপযুক্ত কর্মী পেতাম না, ভালো প্রার্থীরা আবেদন করতেন না। এখন সার্কুলার দিলে একটি পদের বিপরীতে অনেক বেশি প্রার্থী আবেদন করেন।
কাজের পরিবেশ, স্বাধীনতা, বেতন কাঠামোসহ অনেকগুলো বিষয়ের ওপর কর্মীদের কোনো প্রতিষ্ঠানে আসার আগ্রহ তৈরি হবে কি না, তা নির্ভর করে।
পূবালী ব্যাংকে 'ডিফল্ট লোন' (খেলাপি ঋণ) অনেক কম। সেটি কীভাবে সম্ভব হলো?
আপনি যদি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভালো গ্রাহক নির্বাচন করতে পারেন, তাহলে আপনার খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ কমে যাবে। ঋণ দেওয়ার আগেই সবচেয়ে বেশি কোয়ালিটি চেক করা দরকার।
এখানে বিভিন্ন ধরনের চাপ থাকবে। সেটাকে ওভারকাম করতে হবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যে সকল ইউনিট অফিসগুলো কাজ করবে, সবাইকেই স্বাধীনতা দিতে হবে। ঠিকভাবে যাচাই করে ঋণ দেওয়া হলে সাধারণত তাদের ক্লাসিফিকেশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না বেশি।
সেইসঙ্গে ধারাবাহিকভাবে ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের ট্রানজেকশন মনিটরিং করাও জরুরি। এছাড়া, কর্মীদের এই আত্মবিশ্বাস দেওয়া যে, তারা যদি সঠিকভাবে কাজ করে তাহলে তাদের কোনো ধরনের ক্ষতি হবে না। এগুলো টপ ম্যানেজমেন্ট এবং বোর্ড- এই দুই জায়গা থেকেই নিশ্চিত করতে হবে।
মোদ্দাকথা, কোনো ব্যাংক কর্পোরেট গভর্নেন্স প্রয়োগ করতে পারলে ক্লাসিফিকেশনও কমিয়ে নিয়ে আসতে পারবে।
কোভিডের পর সব ব্যাংকই ডিজিটাল সার্ভিস নিয়ে আসছে। এছাড়া, নতুন করে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। আপনাদের গুরুত্বের জায়গাটা কীরকম?
আমরা প্রচারবিমুখ হওয়ার কারণে আমাদের উদ্যোগগুলোর কথা জনগণ জানতে পারে না।
ব্যাংকখাতের প্রতিটা ডিজিটাল উদ্যোগে পূবালী ব্যাংক লিডব্যাংক হিসেবে কাজ করেছে। আমাদের যে অনলাইন ট্রানজেকশানটা (লেনদেন) হয়, সেটা অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় অনেক বেশি।
ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং অনলাইন ব্যাংকিং এর গ্রাহক বাড়ছে আমাদের। ঘরে বসে অ্যাকাউন্ট খোলার কাজটিকেও আমরা অনেক এগিয়ে নিয়ে এসেছি। আমরা ডিজিটাল টিম, অল্টারনেট ডেলিভারি চ্যানেল ডিভিশন, মার্কেটিং টিম তৈরি করেছি।
আমাদের লক্ষ্য ২০২৪ সালের মধ্যে ৫০,০০০ পজ মেশিন সার্ভিসে নিয়ে আসা। আমাদের এই টেকনোলজিক্যাল প্রোগ্রেসটা জনগণকে জানাতে এবং সবার দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে আমরা ডিজিটাল মার্কেটিং এ মনযোগ দেবো।
পূবালী ব্যাংক আগামী পাঁচ বছরে কী লক্ষ্য অর্জন করতে চায়?
আমার কাছে মনে হয় যে, মূলত আমাদের ব্র্যান্ড ইমেজটা আরও ভালোভাবে তৈরি করা দরকার। আমাদের ব্র্যান্ডিংটা এমনভাবে হওয়া দরকার, যাতে সবার মানসিকতা থাকে যে, এক নম্বর ব্যাংক হলো পূবালী ব্যাংক।
ফাইন্যান্সিয়াল পারফর্মেন্স ভালো হলেও আমাদের ব্র্যান্ডিংটা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। কাস্টমারদের মনের যেকোনো জায়গা যেমন- টেকনোলজি, কর্পোরেট লোন, রিটেইল ডিপোজিটসহ সবকিছুতেই গ্রাহকদের প্রথম পছন্দ হতে চায় পূবালী ব্যাংক।
আপনি যদি কাস্টমার কেন্দ্রিক হন এবং সেভাবে ব্র্যান্ডিং করতে পারেন, তাহলে কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব।