‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’: ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভে আলোচনায় আসা এই অদ্ভুত স্লোগানের অর্থ কী
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সমর্থনে গত সপ্তাহান্তে লাখো মানুষ রাস্তায় নামেন। এ সময় অনেকের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় অদ্ভুত এক স্লোগান—'বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র'।
ইসলামি অভিবাদন 'বিসমিল্লাহ' অর্থ 'আল্লাহর নামে'। অন্যদিকে, ফরাসি বাক্যাংশ 'সে লে তেনেব্র' অর্থ 'এটি অন্ধকার'। আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্রণে তৈরি এই বাক্যটির সরল অর্থ স্পষ্ট নয়।
তবে ফ্রান্সের তরুণদের কাছে এটি পুলিশি নজরদারি, কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস ও বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ নিয়ে ব্যঙ্গ করার প্রতীক হয়ে উঠেছে। গত মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবের প্রতিবাদে তরুণেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। গত সপ্তাহান্তে সেই বিক্ষোভ ব্যাপক অস্থিরতায় রূপ নেয়।
যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে স্লোগানটি
ধারণা করা হচ্ছে, স্লোগানটি প্রথম ব্যবহার করা হয় স্ন্যাপচ্যাটে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের আয়োজকেরা একটি ব্যক্তিগত চ্যাটরুমে আলোচনা করতেন। সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে এক ব্যক্তি বাক্যাংশটি ব্যবহার করেন।
স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে তিনি লেখেন, 'বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র'। বার্তাটির লেখক এরপর লেখেন, 'আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব।'
ধারণা করা হচ্ছে, ভিন্ন ভিন্ন প্রোফাইল ব্যবহার করে তিনি একাধিকবার একই বার্তা পাঠিয়েছিলেন। এসব প্রোফাইলে মামাদু ও আবদেল্লাহর মতো নাম ছিল। কয়েকটি অ্যাকাউন্টে আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজিও দেখা যায়।
বাক্যাংশটি অন্য স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারকারীদের কাছে মজার মনে হয়। তারা বার্তাগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে বার্তাগুলোর প্রকৃত উৎস যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কী ঘটেছিল এরপর?
অনেক তরুণের ধারণা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঢুকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাদের মতে, এসব বার্তা ছিল আন্দোলনে নজরদারি চালানোর একটি অপরিণত চেষ্টা।
বিক্ষোভকারীরা দ্রুত 'বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র' স্লোগানটি গ্রহণ করেন। কর্তৃপক্ষের আন্দোলন দমনের চেষ্টাকে ব্যঙ্গ করতেই তারা স্লোগানটি ব্যবহার করতে শুরু করেন।
এখন স্লোগানটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও বর্ণগত সংখ্যালঘুদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের সন্তান, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত ফরাসিরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। তাদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ তাদের ভুল বোঝে এবং তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে। আলোচিত বার্তাগুলোতেও সেই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো সদস্য এই বাক্যাংশ ব্যবহার করেছিলেন কি না—সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করেনি। তবে মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, বিক্ষোভের সময় বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনায় জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কখনো কখনো অনলাইনে ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করেন।
মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের পরিস্থিতিতে তদন্তকারীরা ছদ্মনাম ব্যবহার করতে পারেন। এর মাধ্যমে তারা অপরাধে জড়িত থাকতে পারেন এমন ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন। এসব তথ্য পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
স্লোগানটি কেন এত আলোড়ন তুলেছে?
শিক্ষার্থীদের কাছে 'বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র' স্লোগানটি সরকার ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দূরত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের অভিযোগ, সরকার তাদের দাবিগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
ফ্রান্সের একটি প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের মুখপাত্র সাবরিন খারবাখ বলেন, 'কোনো তরুণ এভাবে কথা বলে না।'
তার মতে, তরুণেরা এখন স্লোগানটি ব্যবহার করে পুলিশের নজরদারি ও আন্দোলনে ঢুকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টাকে ব্যঙ্গ করছেন। একই সঙ্গে তারা বোঝাতে চাইছেন, এসব চেষ্টা সত্ত্বেও তারা নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম।
বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদানি সাবাদিও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তার মতে, স্ন্যাপচ্যাটের বার্তাগুলোতে পুলিশের এক ধরনের পূর্বধারণা প্রকাশ পেয়েছে। পুলিশ মনে করেছিল, নির্দিষ্ট কিছু মানুষ অবরোধ তৈরি করছেন বা 'সবকিছু ভেঙে ফেলার' পরিকল্পনা করছেন।
প্যারিসের শিক্ষার্থী ফেদ্র কেমেনের বলেন, 'বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র' এখন ফ্রান্সজুড়ে রসিকতার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ, এতে তরুণদের কথা বলার ধরন অনুকরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা খুবই অস্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, 'এটিকে বর্ণবাদের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যারা সম্পত্তি ভাঙচুর করবে, তারা আরব।'
ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়েছে স্লোগানটি
'বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র' স্লোগানটি বেলজিয়াম ও জার্মানির একই ধরনের বিক্ষোভেও ব্যবহার করা হয়েছে।
সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রকাশিত একটি ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে স্লোগানটি বলেন। ভিডিওতে তাকে তরুণ প্রজন্মের আরও কিছু অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা যায়। এর মধ্যে '৬-৭' নামের একটি মিমের সঙ্গে সম্পর্কিত অঙ্গভঙ্গিও ছিল। অদ্ভুত ও অর্থহীন উপস্থাপনার কারণে মিমটি জনপ্রিয় হয়েছিল।
স্লোগানটির ব্যবহার ভারতের 'ককরোচ আন্দোলনের' কথাও মনে করিয়ে দেয়। সেখানেও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ভারতের প্রধান বিচারপতি তরুণ ও বেকারদের 'পরজীবী' ও 'ককরোচ' বলে মন্তব্য করেছিলেন। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা নিজেদের আন্দোলনের নাম দেন 'ককরোচ আন্দোলন'। অপমানসূচক শব্দটিকেই তারা প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
যেভাবে শুরু হয় বিক্ষোভ
গত মাসে ফ্রান্সের শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার, আরও শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং ব্যস্ততাপূর্ণ সময়সূচি সহজ করার দাবিতে তারা আন্দোলনে নামেন।
বেশিরভাগ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু জায়গায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা অন্তত ২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেন বা ভাঙচুর চালান। এসব ঘটনায় প্রায় ৮ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়ন ও অন্যান্য সংগঠনের কর্মসূচি যুক্ত হয়। এর ফলে গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তবে ব্যাপক দাঙ্গা ও সহিংসতার কারণে শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো আড়ালে পড়ে যায়।
পুলিশের কঠোর পদক্ষেপও বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন আরও জোরালো করেছে।
গত মাস থেকে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অন্তত ৩৪টি অভিযোগ তদন্ত করছে ফ্রান্সের সরকারি পুলিশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা। পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেড কাছ থেকে আঘাত করায় কিশোরটি গুরুতরভাবে আহত হয়।
