‘কুচু পুচু’ থেকে ‘চা মে দেশ ডুব গ্যায়া’: ব্যঙ্গাত্মক পোস্টারে ভারতের জেনজি আন্দোলন
'আমরা মেয়েরা কাউকে ভয় পাই না। তোমরা কি আমাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলবে? চাইলে তা করতে পারো; আমরা ব্যাগে অতিরিক্ত কাপড় নিয়ে এসেছি। আমরা আর ভয় পাই না। এটাই "ভারত কি বেটি" (ভারতের কন্যা)।'
এই কথাগুলো বলেছেন ভারতের এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ছাত্রী সুইটি জয়সওয়াল। ২৫ জুলাই প্রয়াগরাজে তরুণদের বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর আসার কয়েক ঘণ্টা আগে, প্রবল বৃষ্টির মধ্যে এবং কয়েক ডজন পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে প্রয়াগরাজের অল সেন্টস ক্যাথেড্রালের কাছে একটি মাঠে হাজারো তরুণ বিক্ষোভকারী জড়ো হন।
জয়সওয়ালের কণ্ঠে এবং আরও অনেকের কথায় যে দৃঢ় প্রতিবাদী মনোভাব ছিল, সেটিই এই বিক্ষোভের সময় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন থেকেই এই বিক্ষোভ অনুপ্রাণিত হয়েছে।
'আমরা কখনোই ককরোচ হিসেবে পরিচিত হতে চাইনি। আমরা এমন প্রজাপতি হতে চেয়েছিলাম, যারা উড়তে পারে। আমি আগে বিজেপির সমর্থক ছিলাম, এখন আর নই', দ্য ওয়্যারকে এসব কথা বলেন জয়সওয়াল। তিনি আগে নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
যে সরকার তার বিভিন্ন প্রকল্পের প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করে, যার মধ্যে রয়েছে 'বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও' (কন্যা সন্তান বাঁচাও, কন্যা সন্তানকে শিক্ষিত করো) প্রকল্প, সেই সরকারের জন্য একজন তরুণীর মুখে 'কন্যা'কে ঘিরে আরেকটি নতুন স্লোগান শোনা সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।
তবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর বিজেপি নেতৃত্ব যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেখানে তারা সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর প্রশংসায় ব্যস্ত ছিল। কিন্তু মূল সমস্যাটি—দেশের ব্যর্থ শিক্ষাব্যবস্থা—নিয়ে তারা কোনো কথা বলেনি।
ব্যঙ্গাত্মক পোস্টারের বাইরেও
'মেলোডি খান, আমাদের ভবিষ্যৎ নয়'—এই লেখা থেকে শুরু করে 'আপনাদের এখানে হয়তো চায়ে বিস্কুট ডুবে যায়, কিন্তু আমাদের এখানে চায়ের মধ্যে পুরো দেশ ডুবে গেছে'—এমন ব্যঙ্গাত্মক বাক্যগুলো উত্তর প্রদেশের তরুণ প্রজন্মের হাতে থাকা পোস্টারে দেখা গেছে।
এই ব্যঙ্গাত্মক বাক্যগুলো আসলে উত্তর প্রদেশের তরুণদের গভীরে থাকা অনিশ্চয়তা ও ভয়কে প্রকাশ করেছে। উত্তর প্রদেশে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বাধীন উত্তর প্রদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কনস্টেবল পদে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল এবং ২০২৪ সালের মার্চে পর্যালোচনা কর্মকর্তা ও সহকারী পর্যালোচনা কর্মকর্তা পদের শূন্যপদের পরীক্ষা বাতিল।
তবুও ২০২৬ সালের মে মাসে রাজস্ব বিভাগের একটি কেরানি পদ লেখপাল নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর দেখা যায়, রাজ্য সরকার প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। এই ঘটনায় বিশেষ করে সেই কোচিং সেন্টারগুলোকে লক্ষ্য করা হয়, যারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমর্থন করেছিল।
আলোক নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, 'এই আন্দোলন ১৮৫৭ সালের বিপ্লবের মতো ছিল। এখানে প্রত্যেক মানুষের নিজের নিজের দাবি রয়েছে। আমি পর্যালোচনা কর্মকর্তা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম, কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে সেটি বাতিল হয়ে যায়। সরকার আবার পরীক্ষা নেয় এবং আমি পুনরায় অংশ নিই। কিন্তু এখনো সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া আদালতের মামলায় আটকে আছে। কেউ আমাকে বলুক, একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে তিন থেকে পাঁচ বছর এভাবে চলে যায়—এটা কেমন ব্যবস্থা?' অলোক গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রসঙ্গে এ কথা বলেন স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী অপর্ণা বলেন, 'আমাকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় বসতে হবে। যখন প্রতি বছর হওয়া নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হতে পারে, তখন আপনারা কী মনে করেন আমার স্নাতকোত্তর পরীক্ষা কোনো ঝামেলা ছাড়াই হবে? আর রাত ২টার সময় এসে বলবেন, "বন্ধুরা", মোদি জি, দয়া করে আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের অভিনয় বন্ধ করুন।'
নিজেদের আগের কোনো চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিজ্ঞতা কিংবা ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি, শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের খবরে আনন্দিত হওয়া অনেক তরুণের সঙ্গে নিট পরীক্ষার যোগসূত্রও ছিল।
দারোগা (উপপরিদর্শক) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অশোক প্যাটেল। তিনি বলেন, 'আমার ছোট ভাই নিট পরীক্ষায় বসেছিল, যার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। হ্যাঁ, সে আবার পরীক্ষা দিয়েছে। কিন্তু মাঝের যে সময় নষ্ট হলো, তার কী হবে? আমি নিজেও পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষায় বসেছিলাম, সেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছিল। পরে আবার পরীক্ষা হলে আমি মেধাতালিকায় জায়গা করতে পারিনি। আমার বয়স ২৬ বছর। ২১ বছর বয়স থেকে আমি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। একটি মধ্যবিত্ত পরিবার আর কত দিন এভাবে টিকে থাকতে পারে?'
প্রথমবারের মতো কোনো আন্দোলনে অংশ নেওয়া আকাঙ্ক্ষা দ্বিবেদী একটি পোস্টার হাতে নিয়েছিলেন। পোস্টারে লেখা ছিল—'কুচু পুচু, এবার তো পদত্যাগ করুন।'
তার মতে, প্রতিবার কোনো পরীক্ষা পিছিয়ে গেলে একজন শিক্ষার্থীর ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়, সরকারকে সেটি উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ।
দিশা নামের একটি ছাত্র সংগঠন, যারা প্রয়াগরাজের এই যুব আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, তাদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে চন্দ্র প্রকাশ বলেন, 'দিল্লির যন্তর মন্তরের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমন অনেক যন্তর মন্তর তৈরি হতে শুরু করেছিল। সরকার যদি শিক্ষার্থীদের কথা না শুনত, তাহলে এই আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে উঠত। তবে এর শান্তিপূর্ণ চরিত্র বজায় থাকত।'
দিশা সংগঠনের আরেক শিক্ষার্থী প্রিয়াংশু বলেন 'ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানো সংগ্রামী শিক্ষার্থীদের ফল। এটি সেই পরিবারগুলোর ক্ষত কিছুটা হলেও সারিয়ে তুলবে, যারা নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে আত্মহত্যার ঘটনায় কাউকে হারিয়েছে।'
এর আগে কথিত লেখপাল প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের সংগঠন 'সংযুক্ত প্রতিযোগী ছাত্র হুঙ্কার মঞ্চ'-এর পক্ষ থেকেও ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের প্রতিক্রিয়ায় একটি বিবৃতি দেওয়া হয়।
সেখানে বলা হয়, 'শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর সংগ্রাম এবং লাখো তরুণের অংশগ্রহণের কারণেই জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনায় নতুন দিক তৈরি হয়েছে।'
যেদিন ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়, সেদিন সংযুক্ত প্রতিযোগী ছাত্র হুঙ্কার মঞ্চ প্রয়াগরাজের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, 'আমাদের দাবি, লেখপাল প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। প্রাথমিক যোগ্যতা পরীক্ষার মাধ্যমে গ্রুপ বি ও গ্রুপ সি পর্যায়ের সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে "সর্বনিম্ন নম্বরসীমা, সর্বোচ্চ সুযোগ" নীতি অনুসরণ করা হোক। এবং উত্তর প্রদেশ লোকসেবা কমিশনের মাধ্যমে যেসব পদের জন্য পরীক্ষা নেওয়া হয়, সেসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হোক।'
