প্লেগ গবেষণাগারে মৃত্যুর ঘটনায় মহামারির ঝুঁকি নাকচ করল রাশিয়া, স্বচ্ছতা চায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
সাইবেরিয়ার একটি প্লেগ-বিরোধী গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণাগার কর্মীর মৃত্যুর পর কোনো মহামারীর ঝুঁকি নেই বলে বুধবার জানিয়েছে রাশিয়ার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা। যদিও এই উদ্বেগজনক ঘটনার বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
বুধবার এক বিবৃতিতে 'রসপোট্রেবনাদজর' জানায়, গবেষণাগারটি যেখানে অবস্থিত রাশিয়ার ইরকুটস্ক অঞ্চল সেখানে নেওয়া বেশ কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তারা ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনছে। তারা আরও জানায়, মৃত ওই কর্মীর সংস্পর্শে আসা ৯০ শতাংশেরও বেশি ব্যক্তির চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে এবং বিপজ্জনক কোনো জীবাণু পাওয়া যায়নি।
রাশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের 'ইরকুটস্ক রিসার্চ অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউট অব সাইবেরিয়া'-য় কর্মরত ওই ল্যাব টেকনিশিয়ানের মৃত্যু সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এবং তার অসুস্থতার কারণ নিয়ে বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে।
বুধবার দেশটির পর্যবেক্ষণ সংস্থাটি জানায়, '২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত, সংস্পর্শে আসা ৯০ শতাংশেরও বেশি ব্যক্তির চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি সংক্রান্ত কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা শনাক্ত করা যায়নি এবং প্রায় ৫,০০০টি গবেষণাগার পরীক্ষার ফলাফলেও কোনো বিপজ্জনক রোগজীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।'
ইরকুটস্কের স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আগেই রোগ-নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, যা কর্তৃপক্ষ আসলে কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখছে—তা নিয়ে স্থানীয় কিছু বাসিন্দার মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বাড়তি স্বচ্ছতার আহ্বান
তবে রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক বিবৃতি সত্ত্বেও, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখনও সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানাচ্ছেন এবং মস্কোর কাছ থেকে আরও স্বচ্ছতা প্রকাশের দাবি জানাচ্ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) প্রধান ড. তেদ্রোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বুধবার বলেছেন, 'রাশিয়ান কর্মীর মৃত্যুর পর একটি "পূর্ণাঙ্গ ঝুঁকি মূল্যায়ন" করা সম্ভব হয়নি।' তিনি আরও বলেন, 'পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদনগুলো স্পষ্ট করতে এবং সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী সময়োপযোগী, সম্পূর্ণ ও স্বচ্ছ তথ্য আদান-প্রদান অপরিহার্য।'
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরাও ল্যাব কর্মীর মৃত্যুর ঘটনাটি জনস্বাস্থ্যের জন্য "কম" বিপজ্জনক ছিল বলে যে প্রাথমিক মূল্যায়ন করেছিলেন, তা হালনাগাদ (আপডেট) করেছেন। তারা বলেছেন, যেহেতু ওই কর্মী নিউমোনিক প্লেগে (একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ যা মানুষের থেকে মানুষে ছড়াতে পারে, তবে সহজে ছড়ায় না) মারা যাননি বলেই মনে হচ্ছে, তাই এই ঘটনার কারণে সৃষ্ট সামগ্রিক ঝুঁকি এখন অস্পষ্ট বা অনির্ধারিত।
এদিকে, ডব্লিউএইচও-র মহামারী ও অতিমহামারী ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক ড. মারিয়া ভ্যান কারখোভ জানিয়েছেন যে, সংস্থাটি রাশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং তাদের কাছ থেকে "পরবর্তী উত্তর বা স্পষ্টীকরণের" অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, 'ঠিক কী কী পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং সেইসব ল্যাব পরীক্ষার ফলাফল কী ছিল—সে বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তারিত প্রশ্ন নিয়ে আমরা তাদের সাথে যোগাযোগ করছি। মৃত্যুর মূল কারণ এখনো জানা না গিয়ে থাকলে কী ধরনের পরবর্তী বিশ্লেষণ চালানো হচ্ছে, এবং কাদেরকে কোয়ারেন্টাইন বা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে—তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।'
ভ্যান কারখোভ আরও বলেন, 'আমাদের বলা হয়েছে যে ওই অঞ্চলে প্লেগের কোনো কেস নিবন্ধিত হয়নি এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কোনো রোগজীবাণুও শনাক্ত করা যায়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই, ঠিক কী কী ল্যাব পরীক্ষা চালানো হয়েছিল, কোন কোন জীবাণু মূল্যায়ন করা হয়েছিল এবং ওই কর্মী যদি প্লেগে মারা না গিয়ে থাকেন, তবে তার মৃত্যু কীভাবে হলো—তা ভালোভাবে বুঝতে আমরা আরও বিশদ তথ্য পেতে চাই।'
ক্রেমলিন এসব উদ্বেগ খারিজ করে দিয়েছে এবং জানিয়েছে যে তারা "প্রচলিত রীতি অনুযায়ী" বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডাব্লিউএইচও) ধারাবাহিকভাবে অবহিত রেখেছে।
সীমান্ত পেরিয়ে রোগের সংক্রমণ রোধে তৈরি 'আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিধি' (আইএইচআর)-র আওতায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলো "আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হতে পারে এমন কোনো সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা" তৈরি হলে তা সংস্থাকে জানাতে বাধ্য।
ট্রাম্প প্রশাসনও এই ঘটনার বিষয়ে মস্কোর কাছ থেকে স্পষ্ট উত্তর পেতে হিমশিম খাচ্ছে। যদিও ট্রাম্প বুধবার জানান, শিপিলোভা কোনো জৈবাস্ত্রের সংস্পর্শে আসার কারণে মারা গেছেন বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে না। তিনি আরও যোগ করেন, ক্রেমলিন থেকে শুরু থেকেই জোর দিয়ে বলা হচ্ছে যে প্লেগ-বিরোধী গবেষণাগারের পরিস্থিতি "সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে" রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, 'আমরা তা মনে করি না। আমরা খুব শিগগিরই আসল বিষয়টি জানতে পারব, তবে আমরা এমনটা মনে করছি না।'
মঙ্গলবার গভীর রাতে সিএনএন-কে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র তথ্যের অনুরোধ বাড়াতে 'দিমার্শ' নামক একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, 'আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ান সরকারের কাছে অতিরিক্ত তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছি। আমরা তথ্য আদান-প্রদানের জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথেও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছি।'
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার বলেন, 'বিশ্বের সাথে আরও তথ্য শেয়ার করা স্পষ্টতই রাশিয়ার দায়িত্ব। বিষয়টি হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও বড় হতে পারে। আমরা এখনো নিশ্চিত নই, তবে বর্তমানের এই সীমিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো অনুমানের ওপর ভর করাটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ হবে বলে আমি মনে করি।'
ট্রাম্প জানিয়েছেন, রাশিয়া অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও অত্যন্ত বুদ্ধিমান, এবং তারা বলছে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে রাশিয়ান কর্মকর্তারা এ পর্যন্ত খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করেননি।
