‘পক্ষপাতমূলক’ ম্যাচসূচি, ভুল ভেন্যুর বাস: জাপানের এশিয়ান গেমস নিয়ে কেন এত ক্ষুব্ধ অ্যাথলেটরা
জাপানে চলমান এশিয়ান গেমসে মাত্র ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি ম্যাচ খেলতে বাধ্য হয়েছেন ভারতের তারকা ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় পিভি সিন্ধু। তার মতে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়ে সেরাটা দেওয়ার সুযোগ কেড়ে নিয়েছে এই বিতর্কিত সূচি। গত শনিবার সিন্ধুকে দুবার কোর্টে নামতে হয়, যার মধ্যে তৃতীয় রাউন্ডের ম্যাচটি শেষ হয়েছিল মধ্যরাতের পর। এরপর পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়াই রবিবার দুপুরে চেন ইউফেইয়ের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে নামতে হয় তাঁকে এবং ম্যাচে তিনি পরাজিত হন। অলিম্পিকে দুবারের পদকজয়ী এই তারকার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল কোনো বড় আসরে তিনি কখনো একদিনে দুটি ম্যাচ খেলেছেন কি না। জবাবে সিন্ধু বলেন, 'আমার মনে হয় সূচিটি মোটেও ভালোভাবে সাজানো হয়নি।' তিনি আরও যোগ করেন, 'আমরা সত্যিই খুব দেরিতে ঘুমিয়েছিলাম এবং সকালে আবার ফিরে এসেছি, একদিনে দুটি ম্যাচ খেলতে হয়েছে। ক্লান্তি কাটিয়ে ওঠাটাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।'
অব্যবস্থাপনার এখানেই শেষ নয়। পাকিস্তান ভলিবল দলকে ম্যাচের ঠিক আগমুহূর্তে নিয়ে যাওয়া হয় সম্পূর্ণ ভুল এক স্টেডিয়ামে। ফলে বাসের ভেতরেই তাড়াহুড়ো করে পোশাক (কিট) বদলাতে বাধ্য হন খেলোয়াড়েরা। বাসের ভেতর থেকে করা এক ভিডিওতে পাকিস্তান দলের অধিনায়ক মুরাদ জাহান বলেন, 'আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচ রয়েছে এবং বাসচালক নিজেই জানেন না আমরা কোন জিমনেসিয়ামে খেলতে যাচ্ছি। তিনি ভুল পথে এসে ভুল এক জিমনেসিয়ামে গাড়ি ঢুকিয়ে দিয়েছেন এবং আমাদের হাতে এখন একদমই সময় নেই। এটি অত্যন্ত বিব্রতকর একটি পরিস্থিতি। জাপানের কাছ থেকে আমরা এটি প্রত্যাশা করিনি। এমনটা হওয়া উচিত ছিল না।'
১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত জাপানের আইচি-নাগোয়ায় আয়োজিত ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসের সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দেওয়া অসংখ্য ঘটনার মধ্যে এগুলো মাত্র দুটি উদাহরণ। নির্ধারিত বাস না আসায় দক্ষিণ কোরিয়ার বাস্কেটবল দল তাদের অনুশীলন মিস করে এবং তাদের ফুটবল দলকেও একবার ভুল ভেন্যুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
চীনা জিমন্যাস্ট ঝাং বোহেংয়ের ক্ষেত্রে দুর্ভোগের শুরু হয়েছিল জাপানে পা রাখার পর থেকেই। তিনি জানান, নাগোয়ায় নামার পর তিনি ও তাঁর সতীর্থরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন এবং পরবর্তীতে ভারী বৃষ্টির কারণে তাঁরা যে ক্রুজ জাহাজে থাকার কথা ছিল, সেখানে উঠতেই পারেননি। চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা এক ভিডিওতে ঝাং বলেন, 'আমি পুরোপুরি বিধ্বস্ত।' তিনি আরও বলেন, 'আমি ভাবতেই পারিনি সকাল ৭টায় নাশতার পর পরবর্তী খাবার পাওয়ার জন্য সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।'
কেউ কেউ এই আয়োজনের বিরুদ্ধে স্বাগতিক ক্রীড়াবিদদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও তুলেছেন। চীনের অলিম্পিক ব্যাডমিন্টন পদকজয়ী তান নিং বলেন, 'আমার কাছে সূচিটিকে অন্যায্য মনে হয়েছে। আমরা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাতে গিয়েছিলাম, কিন্তু প্রধান রেফারি এ বিষয়ে কিছুই করেননি।' তিনি অভিযোগ করেন, 'জাপান দল অভিযোগ জানালে তারা সত্যিই সময়সূচি পরিবর্তন করে দিয়েছিল।'
বুধবার আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস ও এশিয়ান প্যারা গেমস অর্গানাইজিং কমিটি (আইনাগোক) আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং জানায় যে কর্মীরা ভুলের কারণ চিহ্নিত করতে কাজ করছেন। আয়োজক কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও নাগোয়ার মেয়র ইচিরো হিরোসাওয়া বলেন, 'এই অসুবিধার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ক্রীড়াবিদ এবং অন্যদের কাছে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। যেসব ভুল ব্যবস্থাপনা হয়েছে তা আমাদের আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে।' তিনি আরও স্বীকার করেন যে সেখানে 'মানবসৃষ্ট ভুল এবং জাতীয় দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি ছিল।'
অতীতের আসরগুলোর তুলনায় এবার আইচি-নাগোয়ায় প্রথাগত কোনো 'অ্যাথলেট ভিলেজ' বা ক্রীড়াপল্লী তৈরি করা হয়নি। পরিবর্তে ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তাদের বিভিন্ন হোটেল, অস্থায়ী আবাসন এবং নাগোয়া বন্দরে নোঙর করা 'কোস্টা সেরেনা' ক্রুজ জাহাজে রাখা হয়েছে। খরচ কমাতে এবং গেমস শেষে যাতে বিশাল ক্রীড়াপল্লীটি অব্যবহৃত পড়ে না থাকে, সেজন্য আয়োজকরা এই মডেলটি বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু হাজার হাজার ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তাকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়ায় দেখা দেয় বড় বিশৃঙ্খলা।
কক্ষ বরাদ্দ, চেক-ইন এবং আবাসনের মান নিয়ে বহু প্রতিনিধি দল অভিযোগ জানিয়েছে। কিছু অ্যাথলেট বিছানা অতিরিক্ত ছোট হওয়ার অভিযোগ করেছেন। থাইল্যান্ডের ক্রীড়াবিদদের ক্রুজ জাহাজে ওঠার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেলে রাখা হয় এবং লবির মেঝেতে তাঁদের ঘুমানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আবাসনের বরাদ্দ কমে যাওয়ায় ভারতকে অতিরিক্ত হোটেল কক্ষ বুক করতে হয়। ভারতীয় দলের শেফ দ্য মিশন সহদেব যাদব বলেন, 'আমরা ইতিমধ্যে ১৮টি কক্ষ বুক করেছি এবং আজ আরও ১০টি কক্ষ নেব। আবাসন সংকট নিশ্চিতভাবেই রয়েছে।' ভারতীয় মিক্সড মার্শাল আর্ট অ্যাথলেট বরুণ সান্যাল অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড থাকা সত্ত্বেও থাকার জায়গা পেতে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'তাদের সিস্টেমে আমি যেন সম্পূর্ণ অদৃশ্য ছিলাম।'
আয়োজক কমিটি আইনাগোক দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে এক বিবৃতিতে জানায়, 'প্রতিটি ঘটনার কারণ ভিন্ন ছিল। তবে প্রতিটি সমস্যা সমাধানে দলগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে এবং কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।' তারা বাস ছাড়ার সময়সূচি হোটেলগুলোতে বড় অক্ষরে লিখে দেয় এবং খালি বাস চলে যাওয়ার পরিবর্তে চালকদের ক্রীড়াবিদদের জন্য অপেক্ষা করার নির্দেশ দেয়। এছাড়া শেষ মুহূর্তের বিশৃঙ্খলা এড়াতে আগের দিন বিকেল ৩টার পর আসা পরিবহনের আবেদন গ্রহণ না করার নিয়ম জারি করা হয়।
সংকট কেবল আবাসনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছিল কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরির মতো আনুষ্ঠানিক ভুলও। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার পুরুষ হকি ম্যাচের আগে আয়োজকরা ভুলবশত দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবর্তে উত্তর কোরিয়ার জাতীয় সংগীত বাজিয়ে দেন। আয়োজক কমিটি স্বীকার করেছে যে এটি তাদের কর্মীর ভুল অডিও ফাইল ব্যবহারের কারণে ঘটেছে এবং পরবর্তীতে এটি সংশোধনে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আবার অস্থায়ী ক্রীড়াপল্লী হিসেবে ব্যবহৃত ক্রুজ জাহাজের স্বাগত অনুষ্ঠানে ওদা নোবুনাগা, তোকুগাওয়া ইয়েয়াসু এবং তোয়োতোমি হিদেয়োশির মতো জাপানের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। কিন্তু ১৫৯০-এর দশকে কোরিয়ায় জাপানি আগ্রাসনে নেতৃত্ব দেওয়ায় হিদেয়োশির চরিত্র অন্তর্ভুক্ত করায় দক্ষিণ কোরিয়ায় তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয়। দেশটির শীর্ষ পত্রিকা 'দ্য কোরিয়া টাইমস' লিখেছে, 'তাঁর উপস্থিতি আন্তর্জাতিক এই আয়োজনের ঘোষিত সম্প্রীতি ও বিনিময়ের চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।'
বিমানবন্দরে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড যাচাইয়ের দীর্ঘ লাইনেও ভোগান্তিতে পড়েন অনেক ক্রীড়াবিদ। বাস, রুম বা অ্যাক্রিডিটেশনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপচয় ক্রীড়াবিদদের ঘুম, ডায়েট এবং অনুশীলনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সিন্ধুর মতো ভারতের আরেক শাটলার উন্নতি হুডাও কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়ের পর সূচি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, 'সূচি ব্যবস্থাপনা আরও ভালো হতে পারত।'
এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৈরী আবহাওয়া। টানা বৃষ্টিতে টেনিস, সার্ফিং, ক্রিকেট ও আর্চারি ব্যাহত হয়। পুরুষ ক্রিকেটে পাকিস্তান বনাম হংকং এবং ভারত বনাম আফগানিস্তানের কোয়ার্টার ফাইনাল বৃষ্টিতে ভেসে যায়। বিকল্প কোনো অতিরিক্ত দিন না থাকায় কেবল র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকার সুবাদে পাকিস্তান ও ভারত সেমিফাইনালে উঠে যায়। ২০২৩ সালের হাংঝৌ এশিয়ান গেমসের পর এবারও একইভাবে বাদ পড়ে হতাশ হয় আফগানরা। আফগানিস্তানের ওপেনার মোহাম্মদ আকরাম বলেন, 'বৃষ্টি গতকাল থেকেই শুরু হয়েছিল, আমাদের দুর্ভাগ্য। খেলোয়াড়রা ফর্মে ছিল, কিন্তু বৃষ্টি সবকিছু শেষ করে দিল।'
এর আগে টাইফুন দুজুয়ান টোকিওতে ঘোড়দৌড় ইভেন্ট ব্যাহত করেছিল এবং টাইফুন সুরিগেও মধ্য জাপানের দিকে এগিয়ে এসে নতুন আতঙ্ক তৈরি করে। এতসব জটিলতার মাঝে সাধারণ ক্রীড়াপল্লী না বানানোর সিদ্ধান্তটি সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়ে। তবে অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়া (ওসিএ) এই সিদ্ধান্তের সাফাই গেয়ে বলেছে, ক্রীড়াপল্লী নির্মাণ বাধ্যতামূলক নয় এবং এমন স্থাপনা পরবর্তীতে ব্যয়বহুল 'শ্বেতহস্তী' বা অপ্রয়োজনীয় বোঝায় পরিণত হতে পারে। আইচি-নাগোয়ায় ওসিএ সমন্বয় কমিশনের প্রধান তৈয়ব ইকরাম রয়টার্সকে বলেন, 'রিয়েল এস্টেট মূল্যের বিষয়ে আমাদের কাছে স্পষ্ট পরিসংখ্যান ছিল। আমরা গেমস শেষে এখানে কোনো শ্বেতহস্তী ফেলে রেখে যেতে চাইনি। আলোচনা সহজ ছিল না, তবে এটি কোনো আপসও ছিল না কারণ আমরা একটি অভিনব বিকল্প খুঁজে নিয়েছিলাম।'
২০২৬ এশিয়ান গেমসের এই একের পর এক বিপর্যয় বিশ্বমঞ্চে বড় ক্রীড়া আসর আয়োজনে জাপানের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। টোকিওর বুঙ্কিও গাকুইন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপণন কৌশলের অধ্যাপক শুন্যা হামাদা 'দ্য জাপান টাইমস'-কে বলেন, জাপান দীর্ঘদিন ধরে বড় আন্তর্জাতিক আসর আয়োজনের জন্য মূলত একটি বিজ্ঞাপন সংস্থা 'ডেন্টসু'র ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে আসছিল। তিনি বলেন, 'জাপানের বড় ক্রীড়া আসর আয়োজন ছিল এক পায়ে দাঁড়িয়ে ব্যাটিং করার মতো—একটিমাত্র সংস্থার ওপর নির্ভরশীল।'
২০১৯ সালের রাগবি বিশ্বকাপ ও ২০২১ সালের টোকিও অলিম্পিকের মূল দায়িত্বে ছিল ডেন্টসু। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস একসময় লিখেছিল, ডেন্টসু ছাড়া টোকিও অলিম্পিক সম্ভবই হতো না। কিন্তু টোকিও অলিম্পিককে কেন্দ্র করে ঘুষ ও দরপত্র জালিয়াতির কেলেঙ্কারির কারণে ডেন্টসু সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। এর ফলে আইচি-নাগোয়া গেমসের পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় একটি বিদেশি সংস্থার ওপর। তীব্র বিতর্ক সত্ত্বেও ফরাসি প্রতিষ্ঠান 'জিএল ইভেন্টস'-এর জাপান শাখাকে ৬ হাজার ৩০০ কোটি ইয়েন মূল্যে গেমস পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিয়োদো নিউজের মতে, সংস্থাটি 'অবিশ্বাস্য রকমের সস্তা' প্রস্তাব দেওয়ায় তাদের বেছে নেওয়া হয়েছিল।
অধ্যাপক হামাদা যুক্তি দেন, কোনো একটি একক সংস্থার ওপর নির্ভর না করে আয়োজনের জ্ঞান ও দক্ষতা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও জনবলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া জাপানের জন্য জরুরি ছিল। হামাদা বলেন, 'ক্রীড়া আসর আয়োজন মানে কেবল বিদেশি ক্রীড়াবিদদের জাপানে এসে খেলার আমন্ত্রণ জানানো নয়।'
