এফ-৪৭ বিশ্বের প্রথম ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান: দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, অথচ ইতোমধ্যেই উড়ছে চীনের দুটি
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, ষষ্ঠ প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান 'এফ-৪৭'-এর উৎপাদন লাইন চালুর খুব কাছাকাছি রয়েছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে চীন ইতোমধ্যেই তাদের নিজস্ব দুটি ভিন্ন ধরনের পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন বা ফ্লাইট-টেস্টিং দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে।
তা সত্ত্বেও গত সোমবার মিচেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যারোস্পেস স্টাডিজ–এ আয়োজিত এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে, মার্কিন বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান ও উন্নত বিমান অধিগ্রহণ সংক্রান্ত নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল টিমোথি হেলফ্রিচ দাবি করেন যে, এফ-৪৭ হবে "বিশ্বের প্রথম ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান"।
তিনি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদ ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার আগেই, বিমানটির উড্ডয়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে এর প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকেই চীনে টেইললেস প্রযুক্তির দুটি পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের মডেল—যেগুলো সাধারণত জে-৩৬ এবং জে-৫০ নামে পরিচিত—নিয়মিত পরীক্ষামূলক উড্ডয়নে অংশ নিতে দেখা গেছে।
উভয় দেশের এসব সামরিক কর্মসূচির অতি-গোপনীয়তার কারণে সরাসরি এসব যুদ্ধবিমানের মধ্যে তুলনা করা বেশ কঠিন। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এফ-৪৭ মূলত বছরের পর বছর ধরে চালানো গোপন ডেমোনস্ট্রেটর পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হচ্ছে। অপরদিকে, গত জুনে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত কিছু ভিডিও ফুটেজের বাইরে— বেইজিং তাদের যুদ্ধবিমান দুটি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করেনি।
হেলফ্রিচের মন্তব্যের ঠিক একদিন পর, মার্কিন নৌবাহিনী তাদের বিমানবাহী রণতরীভিত্তিক 'এফ/এ-এক্সএক্স' যুদ্ধবিমান তৈরির জন্য বোয়িংকে বেছে নেয়। বোয়িং ইতোমধ্যে এফ-৪৭ তৈরির কাজ করছে। ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের এই চুক্তি যুক্ত হওয়ার ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ প্রজন্মের উভয় প্রধান যুদ্ধবিমান কর্মসূচির দায়িত্বই এখন একই প্রতিষ্ঠান পেল।
এই চুক্তিটি যুদ্ধবিমান তৈরির উৎপাদন সক্ষমতাকে "কৌশলগত সম্পদ" হিসেবে বর্ণনা করা হেলফ্রিচের বক্তব্যের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কেবল তিনটি সক্রিয় যুদ্ধবিমান উৎপাদন লাইন রয়েছে—যা এফ-৩৫, এফ-১৫ইএক্স এবং এফ-১৬ তৈরির কাজে নিয়োজিত।
তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এবং চীনা বিমানবাহিনী নিয়ে গবেষণাকারী আন্দ্রেয়াস রুপ্রেখট সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, হেলফ্রিচের মন্তব্যের অর্থ এই নয় যে এফ-৪৭ এর "গণউৎপাদন" খুব কাছাকাছি। তিনি জানান, এফ-৪৭-এর প্রথম পরীক্ষামূলক সংস্করণটি তৈরির কাজ এখনও অনেকটাই বাকি রয়েছে।
মার্কিন বিমানবাহিনী অন্তত ১৮৫টি এফ-৪৭ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে, যেগুলোর কমব্যাট রেডিয়াস বা যুদ্ধসীমা ১,০০০ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ১,৮৫০ কিলোমিটার)-এর বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। হেলফ্রিচ বলেন, বর্তমানের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের তুলনায় এই বিমানগুলো শত্রুর হামলার মুখে "অনেক বেশি টিকে থাকতে সক্ষম" হবে।
রুপ্রেখট জানান, চেংদু চেংদু এরোস্পেস কর্পোরেশনের তৈরি জে-৩৬ বিমানের সমকক্ষ কোনো যুদ্ধবিমান বর্তমানে মার্কিন বিমানবাহিনীতে নেই। অন্যদিকে শেনইয়াং-এর তৈরি অপেক্ষাকৃত ছোট যুদ্ধবিমান 'জে-৫০' সার্বিকভাবে আকৃতি এবং গঠন বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অনেকটাই এফ-৪৭-এর কাছাকাছি। তবে এসব বাহ্যিক মিল দেখে পুরো সক্ষমতা সম্পর্কে আন্দাজ করা এই মুহূর্তে ঠিক হবে না।
মার্কিন বিমানবাহিনীর চায়না অ্যারোস্পেস স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ব্রেনডান মুলভেনি এর সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, জে-৫০ আকৃতি ও বাহ্যিক গঠনের দিক থেকে এফ-৪৭-এর কাছাকাছি। তবে তিনি কেবল চেহারার ওপর নির্ভর করে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে দেন। তিনি জানান, রাডার এড়ানোর উপযোগী (লো-অবজারভেবল বা স্টিলথ) নকশার প্রয়োজনেই হয়তো এদের আকৃতি দেখতে একই রকম হয়েছে, কিন্তু তাদের প্রযুক্তি, অস্ত্রশস্ত্র এবং যুদ্ধক্ষেত্রের ভূমিকা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
