পুতিনকে মোকাবিলায় ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বানানোর দৌড়ে ৩ দেশ
রিডিংয়ের এক সাধারণ অফিস ভবনে বসে ব্রিটেন, ইতালি এবং জাপানের প্রতিরক্ষা ঠিকাদাররা বিশ্বের অন্যতম গোপন সামরিক প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। 'গ্লোবাল কমব্যাট এয়ার প্রোগ্রাম' (জিসিপিএ), যা যুক্তরাজ্যে 'টেম্পেস্ট' নামেই বেশি পরিচিত; এর লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতের একটি চালকবাহী স্টিলথ বা রাডার-ফাঁকি দিতে সক্ষম যুদ্ধবিমান তৈরি করা। এটি হবে দীর্ঘ পাল্লার, শত্রুর রাডারে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা অত্যন্ত প্রাণঘাতী এক যুদ্ধবিমান, যা ড্রোনের ঝাঁক পরিচালনা করতেও সক্ষম হবে।
অতীতে এই ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েক দশক সময় লেগে যেত। তবে এখন সময়ের গতিটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। ইউরোপ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয়—উভয় অঞ্চলেই উত্তেজনা বাড়তে থাকায়, টেম্পেস্টের পেছনে থাকা তিন অংশীদার দেশ চায় ২০৩৫ সালের মধ্যেই এই যুদ্ধবিমানটি মোতায়েন করতে। এটি একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, যার জন্য নজিরবিহীন গতিতে কাজ করা প্রয়োজন। আর এই লক্ষ্যই রাতে ঘুম কেড়ে নিয়েছে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা মার্কো জফের।
মার্কো জফ বলেন, 'আমাদের প্রতিশ্রুতি আছে, প্রত্যাশা আছে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে এবং এটি সফল করার সব ধরনের সুযোগও আমাদের রয়েছে। তাই আমাদের এই কাজ সম্পন্ন করার বিষয়ে পুরোপুরি বুঁদ হয়ে থাকতে হবে।'
ব্রিটেন এবং ইতালির জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ আসছে রাশিয়ার হুমকির কারণে। অন্যদিকে, জাপানের মূল উদ্বেগ হচ্ছে সমুদ্রের ওপারে ক্রমশ আগ্রাসী হয়ে ওঠা চীন।
জফ আরও যোগ করেন, 'আমাদের শত্রুরা যেভাবে নিজেদের উন্নত করছে এবং যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশগুলো নজিরবিহীন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই আমাদের মন্ত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে একটি প্রকৃত ও কার্যকরী ষষ্ঠ প্রজন্মের অস্ত্র ব্যবস্থা উপহার দিতে আমরা সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।'
দীর্ঘদেহী ও ধীরস্থির স্বভাবের ইতালীয় নাগরিক জফকে ঠিক এক বছর আগে টেম্পেস্ট তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত যৌথ উদ্যোগ 'এজউইং'-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তবে তার এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না।
জফ যখন এই যৌথ উদ্যোগের মূল অংশীদার—যুক্তরাজ্যের বিএই সিস্টেমস, ইতালির লিওনার্দো এবং জাপানের এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রিয়াল এনহ্যান্সমেন্ট কোম্পানি থেকে হাজার হাজার প্রকৌশলীকে একত্রিত করছিলেন, তখন প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়েও তাকে প্রকল্পটি টেনে নিতে হয়েছে। মাসের পর মাস ধরে গুঞ্জন চলছিল যে, দীর্ঘ বিলম্বিত প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনায় বাজেট মেলাতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হয়তো এই জিসিপিএ প্রকল্প থেকে বাজেট কমিয়ে দেবে বা পুরোপুরি সরে দাঁড়াবে। তবে গত মাসে যখন চূড়ান্ত পরিকল্পনা উন্মোচন করা হয়, তখন কেবল জিসিপিএ-কে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তই করা হয়নি, বরং ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নকশার প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য ৪৬০ কোটি পাউন্ডের একটি চুক্তিও দেওয়া হয়।
এটি জফ এবং তার দলের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। কারণ তারা মূলত গত শরৎকালেই যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং জাপানের মধ্যে এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের আশা করেছিলেন। কিন্তু তার বদলে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত এই যৌথ উদ্যোগকে বাঁচিয়ে রাখতে একটি তিন মাসের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা।
অবশ্য জফ এখন যেকোনো ধরনের অনিশ্চয়তার আশঙ্কাকে কূটনৈতিকভাবে উড়িয়ে দিয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের প্রথম একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি 'দ্য টেলিগ্রাফ'কে বলেন, 'আমরা কখনই কোনো সন্দেহ পোষণ করিনি এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিরও কোনো অভাব ছিল না। বিগত কয়েক বছরে আমাদের দেশগুলোতে কিছু সরকার পরিবর্তন হলেও এই কর্মসূচির প্রতি সমর্থন কখনই কমেনি—কখনই না। স্পষ্টতই, আপনার অর্থায়নের প্রয়োজন হবে। তবে আমরা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি যে, প্রতিটি ধাপের শেষে যখনই অর্থের প্রয়োজন হবে, তিন দেশের সরকার ঠিকই কোনো না কোনো পথ বের করে নেবে।'
জিসিপিএ-এর উন্নয়ন পর্বের জন্য ইতালীয়রা ১ হাজার ৮৬০ কোটি ইউরো বরাদ্দ করেছে। তবে এটি ছাড়া এই কর্মসূচির মোট ব্যয় এখনও অজানা। যদি যুক্তরাজ্য এবং জাপানের ক্ষেত্রেও ইতালির মতো একই রকম বরাদ্দ ধরা হয়, তবে উৎপাদনপূর্ব ব্যয় প্রায় ৫ হাজার কোটি পাউন্ডে পৌঁছাতে পারে।
তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, এই ধরনের বড় অঙ্কের বাজেটগুলো সময়ের সাথে সাথে আরও বেড়ে যাওয়ার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা থাকে। যেমন আমেরিকার পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ কর্মসূচিটি পেন্টাগনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। যেখানে প্রতিটি বিমানের উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ডলার এবং এর সামগ্রিক আয়ুষ্কালের সম্ভাব্য ব্যয় ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এজউইংয়ের প্রধান নির্বাহী জফ অবশ্য দাবি করেছেন যে, প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে এবং বাজেটের মধ্যেই এগিয়ে চলেছে। তিনি যুক্তি দেন, যুদ্ধবিমানটির নকশা যেভাবে করা হচ্ছে, তাতে বাজেট অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, টেম্পেস্ট যুদ্ধবিমানে 'মডুলার' আর্কিটেকচার ব্যবহার করা হবে; যার অর্থ তাত্ত্বিকভাবে, নতুন প্রযুক্তি আসার সাথে সাথে পুরোনো প্রযুক্তির বদলে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করা তুলনামূলক সহজ হবে।
জফ বলেন, 'আমাদের এখানে সৎ এবং স্পষ্ট হতে হবে। কাজটি মোটেও সহজ হবে না। এটি কয়েক শ কোটি ডলারের একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে। তবে এটি ভবিষ্যতের জন্য আমাদের প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি।'
এজউইংয়ের মতে, এই যুদ্ধবিমানটি হবে 'একটি দুর্দান্ত সম্পদ, যা শত্রুর আকাশসীমায় প্রবেশ করতে, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদান করতে এবং প্রতিপক্ষকে আঘাত করতে সক্ষম হবে।' জফের মতে, এর জন্য অত্যন্ত আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন। তিনি যুক্তি দেন যে—ফর্মুলা ওয়ান রেসিংয়ের মতো—এই গবেষণা থেকে এমন কিছু উদ্ভাবন বেরিয়ে আসবে যা সামরিক ক্ষেত্র ছাড়াও বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা যাবে।
জফ বলেন, 'একটি ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এমন অনেক প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, যা আমাদের রাষ্ট্রগুলোর সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।' উদাহরণ হিসেবে তিনি স্টিলথ বৈশিষ্ট্য, সেন্সর, হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত উপাদান এবং পাওয়ার সিস্টেমের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, 'আগামী ১০, ১৫ বা ২০ বছরের জন্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, আমরা ঠিক সেই সক্ষমতাগুলোর কেন্দ্রে অবস্থান করছি। তাই চলুন দৃষ্টিভঙ্গিটা একটু বদলাই; করদাতারা যেটিকে খরচ মনে করছেন, সেটি আসলে দেশের জন্য একটি বড় বিনিয়োগ হিসেবে ফেরত আসবে।'
জফ এবং তার দলের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য সম্পদ হলো সময়। প্রতিরক্ষা শিল্পের মানদণ্ড অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মের ফাইটার জেট তৈরি করা আলোর গতিতে কাজ করার সমান। এই জিসিপিএ জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ২০২২ সালে এবং গত বছর গ্রীষ্মে আনুষ্ঠানিকভাবে এজউইং গঠিত হয়।
সর্বশেষ চুক্তি অনুযায়ী, নকশার প্রাথমিক ধাপ শেষ করার জন্য ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় পেয়েছে কোম্পানিটি। এরপর তাদের চূড়ান্ত নকশা তৈরি করে উৎপাদনে যেতে হবে। এই পুরো সময়জুড়ে জফকে তিনটি দেশে বিস্তৃত একটি বিশাল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। রিডিংয়ে এজউইংয়ের সদর দফতরে যৌথ উদ্যোগে যোগ দিতে প্রেস্টন, তুরিন এবং নাগোয়ার ঘাঁটি থেকে হাজার হাজার প্রকৌশলীকে নিয়ে আসা হয়েছে। অংশীদার তিন দেশের পক্ষ থেকে কোম্পানিটিকে অন্তহীন আলোচনা ছাড়াই দ্রুত উপ-চুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
জফ মনে করেন, এই পদ্ধতিটি সত্যি বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। তিনি বলেন, 'এজউইং কেবল সরবরাহকারী এবং অংশীদার সংস্থাগুলোর কাজ ভাগ করে দেওয়ার একটি কাঠামো নয়। এটি এই অভিযানের প্রকৃত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রধান। তাই দ্রুত ও চটপটে উপায়ে কাজটি করার জন্য আমাদের কাছে সমস্ত লোকবল, সক্ষমতা এবং দক্ষতা রয়েছে।'
জফ আত্মবিশ্বাসী যে যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং জাপানের কর্মীরা যেকোনো ধরনের ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক বাধা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন। রিডিংয়ের সদর দফতরে তিন দেশের কর্মীদের একসঙ্গে কাজ করতে ও বিভিন্ন আলোচনা সভায় অংশ নিতে দেখা যায়। সবার মধ্যে এক দারুণ কাজের উদ্দীপনা বিরাজ করছে। যারা এখানে এসেছেন, তারা কাজের প্রতি সম্পূর্ণ নিবেদিত; অনেকেই তাদের পরিবার নিয়ে ব্রিটেনে চলে এসেছেন।
কর্মীদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য প্রধান নির্বাহী কিছু ঘরোয়া সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থাও করেছেন। ভবনের ভেন্ডিং মেশিনগুলোতে তিন দেশের খাবার রয়েছে এবং প্রতিটি ফ্লোরে ভালো কফি মেশিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে জফ যোগ করেন, এই কর্মসূচির এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—বিভিন্ন মহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কর্মীদের জন্য নিরাপদে এবং সরাসরি (রিয়েল টাইমে) নকশা তৈরির কাজে যুক্ত থাকার জন্য একটি সমন্বিত সিস্টেম তৈরি করা। তিনি বিশ্বাস করেন, এই ব্যবস্থাটি প্রতিরক্ষা শিল্পের অন্যান্য যৌথ উদ্যোগের জন্য একটি নিখুঁত ব্লুপ্রিন্ট হতে পারে।
শত্রুদের নজর থেকে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন প্রযুক্তিগুলোকে সুরক্ষিত রাখার জন্য এই পারস্পরিক আস্থা অত্যন্ত জরুরি।
জফ বলেন, 'আমাদের নেওয়া নিরাপত্তা পদক্ষেপগুলো থেকেই বোঝা যায় যে আমাদের সক্রিয় কিছু শত্রু রয়েছে, যা আমাদের হুমকি দিচ্ছে এবং আমাদের থেকে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছে।'
তিনি আরও বলেন, 'তাদের ঠেকাতে আমরা সব রকমের ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে এই বিষয়ে আমাদের আক্ষরিক অর্থেই বুঁদ হয়ে থাকতে হবে, কারণ আমরা আমাদের সেরা প্রযুক্তিগুলো এখানে ব্যবহার করছি। আমাদের দায়িত্ব হলো অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়ে এগুলোকে রক্ষা করা; অন্যথায় এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের কোনো মানেই থাকে না।'
