নারীদের নিরাপত্তায় দিল্লিতে চালু হলো 'পিংক ফোর্স'
নারী নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে তাদের রাত্রিকালীন টহল জোরদার করেছে এবং জাতীয় রাজধানী অঞ্চল জুড়ে "পিংক পেট্রোল" ও "পিংক স্কুটি" উদ্যোগের আওতায় নারী পুলিশ কর্মকর্তার মোতায়েন বৃদ্ধি করেছে দিল্লি পুলিশ।
রাজধানী জুড়ে স্কুল, কলেজ, মেট্রো স্টেশনসহ অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ 'পিংক ফোর্স' গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দিল্লি পুলিশকে।
লেফটেন্যান্ট গভর্নর তারানজিত সিং সাধু মঙ্গলবার দিল্লি পুলিশকে গোয়া পুলিশের 'পিংক ফোর্স'-এর আদলে এই বাহিনী প্রস্তুত করতে বলেন। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে চিহ্নিত হটস্পটগুলোতে এই নারী পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করা হবে।
সম্প্রতি দিল্লিতে প্রায় ১০ দিনের ব্যবধানে নাবালিকাদের ওপর পৃথক চারটি ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা সামনে আসার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
সর্বশেষ ঘটনায় কালকাজি মন্দিরের কাছের আস্থা কুঞ্জ পার্কে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে তিন ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশ জানায়, অভিযুক্তরা নিজেদের পুলিশ পরিচয়ে প্রথমে মেয়েটিকে তার পুরুষ বন্ধুর কাছ থেকে আলাদা করে।
পরবর্তীতে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির সময় পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানায় পুলিশ।
দিল্লির নতুন 'পিংক ফোর্স' যেসব কাজ করবে
রাজধানীর স্কুল, কলেজ, মেট্রো স্টেশন এবং ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত স্থানগুলোতে টহল দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী পুলিশ সদস্যদের নিয়ে এই বাহিনী।
এর মূল লক্ষ্য পুলিশি উপস্থিতি স্পষ্টভাবে জানান দেওয়া এবং সংবেদনশীল সময়গুলোতে যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
তারানজিত সিং সাধু এই ইউনিটের জন্য গোয়া পুলিশের 'পিংক ফোর্স'-কে মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গোয়ায় এই বাহিনী মূলত নারী ও শিশুদের সুরক্ষা এবং তাদের সংক্রান্ত অপরাধের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে কাজ করে। অবশ্য নারী সদস্যদের দিয়ে টহল দেওয়া দিল্লি পুলিশের জন্য একদম নতুন কিছু নয়।
এর আগেও দিল্লির স্কুল, কলেজ, বাজার, মেট্রো স্টেশন ও অন্যান্য জনবহুল এলাকায় নারী কর্মকর্তাদের স্কুটি এবং বিট পেট্রোলিংয়ে মোতায়েন করা হয়েছে। তবে নতুন প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য হলো এই সমস্ত টহল কার্যক্রমকে একটি সুনির্দিষ্ট 'পিংক ফোর্স' কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা।
এ ছাড়া 'অপারেশন শিষ্টাচার'-এর আওতায় প্রকাশ্য স্থানে নারীদের উত্ত্যক্তকরণ বন্ধে পুলিশকে আইনি অভিযান চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই অপারেশনের অধীনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও গণপরিবহন কেন্দ্রগুলোতে আগে থেকেই টহল জোরদার রয়েছে। প্রস্তাবিত পিংক ফোর্স এই বিদ্যমান পদক্ষেপগুলোর পাশাপাশি কাজ করবে।
১৬ সেপ্টেম্বর সদর বাজারে স্টেশনারি কিনতে গিয়ে দোকানের ভেতর এক নাবালিকা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
এছাড়া মধ্য দিল্লির কিষাণগঞ্জে ছয় বছর বয়সী এক শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। পুলিশ জানায়, স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযুক্তকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে স্বরূপ নগরে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় ১৯ বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেফতার এবং তিন নাবালককে আটক করা হয়।
ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আসছে পুলিশি অভিযোগ
গত ২৪ জুনের পর দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তরে সান্ধুর দ্বিতীয় সফরকালে 'পিংক ফোর্স' গঠনসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এখন থেকে দিল্লি পুলিশের 'জন শুনানি' কর্মসূচিতে পাওয়া অভিযোগগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্র্যাক করা হবে। প্রাপ্ত প্রতিটি অভিযোগের প্রাপ্তিস্বীকার করা হবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যান্য সরকারি দপ্তর সম্পর্কিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট সংস্থায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
গত জুন মাস থেকে বিভিন্ন থানায় এই 'জন শুনানি' কর্মসূচি চলছে। চলতি মাসে পুলিশ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি সেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রায় ১০ হাজার অভিযোগের সমাধান করা হয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যবস্থার অধীনে কতদিনের মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে হবে, সে সময়সীমা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
অপরাধপ্রবণ ও জনবহুল এলাকা—বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, বাজার ও পরিবহন হাবগুলোর আশেপাশে পায়দল (ফুট) ও মোটরসাইকেল টহল বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে থানা ও বিট কর্মকর্তাদের।
প্রতিটি পুলিশ ডিস্ট্রিক্ট একজন নোডাল অফিসার মনোনীত করবে এবং স্কুলে পিওসিএসও আইন, শিশু সুরক্ষা, সাইবার অপরাধ, মাদকের অপব্যবহার ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক সেশনের জন্য একটি ত্রৈমাসিক ক্যালেন্ডার তৈরি করবে।
অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, সাইবার অপরাধ দমন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। থানাগুলোকে সাইবার অপরাধের অভিযোগ সামলানো ও ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণে আরও দক্ষ হতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি পিক আওয়ারে যানজটপ্রবণ প্রধান পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও সিসিটিভি নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে।
পুলিশ সদস্যদের কল্যাণার্থে সাধু বিশেষ করে নিম্নপদস্থ ও নারী সদস্যদের সময়মতো পদোন্নতি দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। একইসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরে নির্দিষ্ট সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষোভ ও অভিযোগ শোনার ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন।
পুলিশ আবাসন কলোনিগুলোকে 'জিরো-ওয়েস্ট' বা বর্জ্যহীন মডেল বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
