জন্মহার বাড়াতে সরকারি কর্মীদের জন্য ‘ঘটকালি সেবা’ চালু করলো সিঙ্গাপুর
দেশে রেকর্ড মাত্রায় কমে যাওয়া জন্মহার নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি ম্যাচমেকিং (সঙ্গী খুঁজে দেওয়ার) সেবা চালু করেছে সিঙ্গাপুর।
চলতি সপ্তাহে ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের জন্য উন্মুক্ত করা 'ফার্স্টডেট' নামের এই সেবাটি ডেটিংয়ের ক্ষেত্রে একটি "ভিন্নধর্মী পদ্ধতি" অনুসরণের দাবি করছে। নোবেলজয়ী একটি অ্যালগরিদমের সাহায্যে এটি ব্যবহারকারীদের একবারে একজন সঙ্গীর সাথে মিলিয়ে দেয়।
অংশগ্রহণকারীরা তাদের জাতীয় ডিজিটাল আইডেন্টিটি সিস্টেম ব্যবহার করে এতে লগ-ইন করেন এবং নিজেদের আগ্রহ, অভ্যাস ও জীবনবোধ সংক্রান্ত একটি জরিপে অংশ নেন।
'ফার্স্টডেট'-এর এই উদ্যোগ সিঙ্গাপুরবাসীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ এটিকে "অমানবিক বা ভীতিকর এক ভবিষ্যতের রূপক" বলে বর্ণনা করেছেন, আবার অনেকেই এটি পরখ করে দেখতে উৎসাহ প্রকাশ করেছেন।
ওয়েবসাইটে জানানো হয়, পুরো কার্যক্রমটি পরিচালিত হচ্ছে 'গেইল-শ্যাপলি স্টেবল ম্যারেজ অ্যালগরিদম'-এর ভিত্তিতে। এই গাণিতিক পদ্ধতির মাধ্যমে দুটি ভিন্ন গ্রুপের ব্যক্তিদের পছন্দের তালিকার ওপর ভিত্তি করে পরস্পরের জুটি তৈরি করা হয়।
প্রয়াত গণিতবিদ লয়েড শ্যাপলি ২০১২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার পান এই অ্যালগরিদম আবিষ্কারের জন্য। সরকারি স্কুলে ভর্তি, চিকিৎসকদের রেসিডেন্সি ম্যাচিং এবং বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপসহ নানা ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
সিঙ্গাপুরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ২৯ বছর বয়সী এলিজাবেথ—যিনি 'ফার্স্টডেট' ব্যবহার করে দেখতে আগ্রহী তিনি বলেন, 'দিনশেষে অ্যাপের মাধ্যমে কারও সাথে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা তো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রায় একই থাকে, তাতে খুব বেশি তফাত হয় না। তবে অন্তত এটুকু জেনে আশ্বস্ত হওয়া যায় যে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি বেশ কম। আমরা সবাই তো জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়া সরকারি কর্মচারী, তাই না?"
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা এই উদ্যোগটি সরকারি চাকরির বাইরে থাকা সাধারণ নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক।
অন্য বয়সসীমার তীব্র সমালোচনা করেছেন। রেডিটে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, 'তারা কেবল জন্মহার বাড়ানোর জন্যই এটি করছে। এছাড়া অন্য কোনো কারণে আমরা জীবনসঙ্গী পেলাম কি না, তাতে তাদের সত্যি কিছু যায়-আসে না। আর ৩৫ বা তার চেয়ে বেশি বয়সে সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি থাকায় সরকার বয়স্ক সিঙ্গেলদের একরকম বাদই দিয়ে দিয়েছে।'
এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পটি ভবিষ্যতে সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এমন সময়ে এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগটি নেওয়া হলো, যখন সিঙ্গাপুরের জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত ৬০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম ২০২৫ সালে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ৩০ হাজারেরও নিচে নেমেছে।
এদিকে দ্রুত বয়োবৃদ্ধের দিকে ঢলে পড়া এই দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, যা ২০২৫ সালে প্রায় ২৬ হাজার ৫০০ ছুঁয়েছে।
গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং পরিবারগুলোকে উন্নত সুবিধা প্রদান এবং দম্পতিদের সন্তান গ্রহণে উৎসাহিত করতে একগুচ্ছ নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি শিশুর বয়স ১৭ বছর হওয়া পর্যন্ত সর্বমোট প্রায় ৭০,০০০ সিঙ্গাপুরি ডলার (প্রায় ৫৪ হাজার মার্কিন ডলার) আর্থিক সহায়তার ঘোষণা।
নিজের নাগরিকদের জন্য ঘটকের ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা সিঙ্গাপুর এবারই প্রথম করছে না, এর আগেও 'ফার্স্টডেট'-এর মতো উদ্যোগ দেখা গেছে।
১৯৮৪ সালে দেশটি 'সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ইউনিট' (এসডিইউ) গঠন করে, যার কাজ ছিল সামাজিক নানা অনুষ্ঠানের আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী সিঙ্গেলদের নিজেদের মধ্যে মেলামেশার সুযোগ করে দেওয়া।
কেবল বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের লক্ষ্য করে গঠিত হওয়ায় এটি অভিজাতদের পক্ষপাতের (এলিটিস্ট) অভিযোগে সমালোচিত হয়। তবে তৎকালীন কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা তুলে ধরে দাবি করেছিল যে, নন-গ্র্যাজুয়েট বা অ-স্নাতকদের সঙ্গী খুঁজে পেতে তেমন কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় না। তবে পরবর্তীতে এসডিইউ-এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরের বছর, স্নাতক ডিগ্রি নেই এমন নাগরিকদের মধ্যে বিবাহে উৎসাহিত করতে সরকার আরেকটি নতুন সংস্থা গঠন করে।
অবশ্য সরকারি উদ্যোগে ম্যাচমেকিং বা ডেটিং সেবা চালু করার ধারণাটি কেবল সিঙ্গাপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়া জন্মহার সামাল দিতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে টোকিও মেট্রোপলিটন সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত একটি ডেটিং অ্যাপ চালু করে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, টোকিও শহরের অধিবাসীদের জন্য উন্মুক্ত এই অ্যাপটির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২৬৫ জোড়া দম্পতি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।
