স্কুলের ৫০ মিটারের মধ্যে চিপস, কোল্ড ড্রিংকস, পিৎজা-বার্গার বিক্রিতে লাগাম; শিশুদের স্থূলতা ঠেকাতে নতুন বিধির পথে ভারত
ভারতে স্কুলের ৫০ মিটারের মধ্যে অতিরিক্ত তেল ও চিনি রয়েছে—এমন খাবার বিক্রি সীমিত করার বিষয়ে নতুন বিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিশুদের মধ্যে বিশেষ করে স্থূলতার হার বাড়তে থাকায় জাঙ্ক ফুড বা অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমাতে এটি ভারতের সর্বশেষ উদ্যোগ।
প্রস্তাবিত এই নিয়ম ভারতের প্রায় ১৫ লাখ স্কুলের আশপাশে থাকা পারিবারিক মালিকানাধীন দোকান, রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে। এসব দোকানে চিনিযুক্ত কোমল পানীয় ও লবণাক্ত চিপস থেকে শুরু করে তেলে ভাজা সমুচা এবং বেশি তেলযুক্ত পিৎজা বা বার্গার—বিভিন্ন ধরনের খাবার বিক্রি হয়।
এটি পেপসিকো, কোকা-কোলা, মন্ডেলিজ ও নেসলের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য আরও একটি বাধা হয়ে উঠতে পারে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত তেল, লবণ ও চিনি রয়েছে—এমন পণ্যের গায়ে লাল সতর্কতামূলক চিহ্ন বসানোর প্রস্তাবও এরই মধ্যে রয়েছে। এর মাধ্যমে ভারত, চিলি ও মেক্সিকোর মতো দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কঠোরতর খাদ্য নিরাপত্তা বিধির দিকে এগোচ্ছে।
ভারতের কিছু ব্যবসায়ী ও স্কুলের আশপাশের মুদি দোকানের মালিকরা ইতিমধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর ভুবনেশ্বরে প্রায় এক ডজন দোকানদার বলেছেন, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তাদের বিক্রি এক-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি কমে যেতে পারে।
ভুবনেশ্বরের একটি দোকানে ১৫ বছর বয়সী প্রিয়াংশু পালেই পেপসিকোর জনপ্রিয় 'আঙ্কেল চিপস'-এর দুটি প্যাকেট কিনে ক্লাসে যাওয়ার সময় সেগুলো তার ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়। সে বলে, 'টিফিনের সময় এগুলো খাব।' মায়ের দেওয়া ভাত ও ডালের ঝোলের বদলে সে এসব খাবারই বেশি পছন্দ করে।
ভারত এই অভ্যাসেরই পরিবর্তন করতে চায়।
পরিবর্তনগুলোর উদ্যোগ নেওয়া ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী রাজিত পুনহানি বলেন, স্কুলকেন্দ্রিক 'নিরাপদ খাবার' পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো ছোটবেলা থেকেই শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস থেকে দূরে রাখা।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, 'আমাদের শিশুদের এসব খাবার খেতে নিরুৎসাহিত করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই তাদের এই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'এতে ব্যবসার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। দোকানিরা অতিরিক্ত তেল, লবণ ও চিনি নেই—এমন খাবার বিক্রি করতে পারবেন।' তার ভাষ্য, এসব বিধির উদ্দেশ্য হলো খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পণ্যের উপাদান ও প্রস্তুতপ্রণালি পরিবর্তন করে আরও স্বাস্থ্যকর করতে উৎসাহিত করা।
২০২০ সালে প্রথম প্রস্তাব করা এই আইন কবে কার্যকর হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। দেশজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর অভিযান চলার মধ্যে কর্তৃপক্ষ গত আগস্টে তেল, লবণ ও চিনির এমন কিছু মাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা অতিক্রম করলে স্কুলের আশপাশে ও স্কুলের ভেতরে এসব পণ্য বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। এ বিষয়ে জনগণের মতামত দেওয়ার সময়সীমা ৬ অক্টোবর পর্যন্ত।
ভারতে শিশুদের স্থূলতা দ্রুত বাড়ছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লে'জের চিপস, ক্যাডবেরি চকোলেট ও ম্যাগি নুডলসের মতো পণ্যের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। নিম্ন আয়ের কিছু ভারতীয় মানুষের কাছে বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য কেনা উন্নত জীবনযাত্রার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে এসব পণ্যের তুলনামূলক কম দামও তাদের আকৃষ্ট করছে।
২০২৩ সালে ডমিনোজ ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে কম দামের পিৎজা বাজারে আনে। এর দাম ছিল মাত্র ৪৯ রুপি, যা প্রায় ৫০ মার্কিন সেন্টের সমান।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত ভারতীয় শিশুর সংখ্যাও বেড়েছে। বিশ্ব স্থূলতা ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৮০ লাখ। ২০২৫ সালে তা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ৪ কোটি ১০ লাখে দাঁড়িয়েছে। ২০৪০ সালে এই সংখ্যা ৫ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় আইনে স্কুলের আশপাশের দোকানগুলোতে অতিরিক্ত তেল, লবণ ও চিনি থাকা পণ্য শুধু স্কুলশিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি ও তাদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন দেওয়া ঠেকানোর কথা বলা হয়েছে। তবে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্র, যেখানে মুম্বাই অবস্থিত, আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
মহারাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তা কমিশনার তুকারাম মুন্ধে রয়টার্সকে বলেন, স্কুলের ৫০ মিটারের মধ্যে কোনো দোকানে এসব পণ্য রাখা যাবে না।
তিনি বলেন, 'স্কুলের আশপাশে এ ধরনের শত শত দোকান থাকবে। তারা স্কুলশিক্ষার্থীদের কাছে এসব পণ্য বিক্রি করছে কি না, তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে? দোকানগুলোতে এসব পণ্য মজুতই করা যাবে না।'
রয়টার্সের হাতে আসা রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পরিদর্শকেরা স্কুলের ৫০ মিটারের মধ্যে থাকা ১৩৩টি দোকানে নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা পেয়েছেন। এর মধ্যে ৫১টি দোকানকে ব্যবসা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
ভারতের খাদ্য বাণিজ্য ও শিল্পের সংগঠন এই প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের মতে, নিয়ম মেনে চলা কঠিন হবে। কারণ অনেক স্কুল এমন ঘনবসতিপূর্ণ বাজারের কাছে অবস্থিত, যেসব বাজারে সাধারণ মানুষও কেনাকাটা করেন।
প্রস্তাবের বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য সংগঠনটির তৈরি একটি গোপন খসড়া নথি রয়টার্স পর্যালোচনা করেছে। তবে সংগঠনটি এ বিষয়ে করা রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
নথিতে বলা হয়েছে, এই আইন কার্যকর হলে 'ব্যবসা ও জীবিকার ক্ষতি' হতে পারে। সংগঠনটি যুক্তি দিয়েছে, বিধিনিষেধ শুধু স্কুলের ভেতরে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
স্কুলকেন্দ্রিক এই প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে চাইলে পেপসিকো, যে প্রতিষ্ঠান লে'জের মালিক, রয়টার্সকে তাদের বৈশ্বিক নীতিমালার কথা জানায়। ওই নীতিমালায় স্কুলে কোন কোন পণ্য বিক্রি করা যাবে, তার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ম্যাগি নুডলসের প্রস্তুতকারক নেসল জানিয়েছে, তারা তাদের বৈশ্বিক নীতিমালা অনুসরণ করে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কেবল নির্দিষ্ট পুষ্টিগত মান পূরণ করে—এমন পণ্য বিক্রি করা যায়।
কোকা-কোলা ও ক্যাডবেরির মালিক মন্ডেলিজ রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
ভারতের আইন প্রতিষ্ঠান আরএকে ল-তে খাদ্যবিধি বিশেষজ্ঞ রাহুল খান্না বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের মধ্যে বিশেষ করে মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার প্রস্তুতকারকদের মধ্যে 'উদ্বেগ' দেখা দিয়েছে। কারণ শিশুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোক্তা শ্রেণি হিসেবে দেখা হয়। তবে তিনি এসব প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের পাঁচটি দেশ স্কুলের আশপাশে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে বা তা বাস্তবায়ন করেছে। এ ছাড়া ৪৮টি দেশ স্কুলের ভেতরে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি সীমিত করেছে।
২০১৬ সালে চিলি সতর্কতামূলক খাদ্য লেবেল ব্যবস্থার পাশাপাশি স্কুলে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি ও প্রচার নিষিদ্ধ করে নতুন নিয়ম চালু করে।
চলতি বছর প্রকাশিত 'দ্য ল্যানসেট'-এর একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ওই আইনের আওতায় ১৮ মাস থাকার পর মেয়েদের অতিরিক্ত ওজনের সম্ভাবনা ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমেছিল। ছেলেদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
আইনটি চিলির খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক পণ্যের উপাদান ও প্রস্তুতপ্রণালিও পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছিল।
চিলির আদোলফো ইবানিয়েস বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক গিয়ের্মো পারাহে বলেন, 'আইনটি যদি কার্যকর না হতো এবং ভোক্তাদের আচরণে পরিবর্তন না আসত, তাহলে উৎপাদনকারীরা এর বিরোধিতা করতেন না।'
তিনি বলেন, 'তারা জানেন, এই আইন তাদের যতটা সম্ভব পণ্যের উপাদান ও প্রস্তুতপ্রণালি পরিবর্তন করতে বাধ্য করবে।'
