জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে জনপ্রিয়তায় ধস; ট্রাম্পের জনসমর্থন নেমে এল ক্যারিয়ারের সর্বনিম্ন ৩২ শতাংশে
ইরান যুদ্ধের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যবস্থাপনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে তার নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকরাই অসন্তোষ প্রকাশ করায় তার জনপ্রিয়তা কমে ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে—যা তার রাজনৈতিক জীবনের সর্বনিম্ন। রয়টার্স/ইপসোসের নতুন এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রবিবার শেষ হওয়া চার দিনব্যাপী এ জরিপটি এমন এক সময়ে পরিচালিত হল, যখন ট্রাম্প তিনটি প্রধান সংবাদ মাধ্যমকে হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দেন। এছাড়া তিনি জানান, ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যবাহী কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টস এর নামের সঙ্গে যদি ট্রাম্পের নিজস্ব নাম যুক্ত করা না যায়, তবে সেটি ভেঙে ফেলা হতে পারে।
জরিপে দেখা গেছে, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটাররা ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের সমর্থন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এ নির্বাচনের মাধ্যমেই আগামী দুই বছরের জন্য মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে তা নির্ধারণ হবে। গত সপ্তাহে রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে ট্রাম্পের সামগ্রিক জনসমর্থন যেখানে ৩৫ শতাংশ ছিল, সেখান থেকে তা আরও কমেছে। এমনকি তার নিজ দল রিপাবলিকানদের মধ্যেও সমর্থন এক সপ্তাহ আগের ৮২ শতাংশ থেকে কমে ৭৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বিদেশি যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প পুনরায় হোয়াইট হাউসে ফিরে আসেন। শপথ গ্রহণের পরপরই পরিচালিত রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে তার সমর্থন ছিল ৪৭ শতাংশ। নতুন এ জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মাত্র ১৭ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তার পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছেন—যা আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে মার্কিনিদের ভোটদানের প্রধান নির্ধারক হতে চলেছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব
ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পর পেট্রোল ও ডিজেলের দাম একলাফে অনেকটা বেড়ে যাওয়ার পর থেকেই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে রিপাবলিকান সমর্থকদের অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। প্রথমবারের মতো, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ভূমিকার সমালোচনা করা রিপাবলিকানদের সংখ্যা তাকে সমর্থন জানানো রিপাবলিকানদের চেয়েও বেড়ে গেছে—সমর্থন ৪৪ শতাংশ হলেও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ৫১ শতাংশ।
ট্রাম্পের এই জনসমর্থনের হার তার ডেমোক্রেটিক পূর্বসূরি জো বাইডেনের মেয়াদের সর্বনিম্ন সূচকের চেয়েও নিচে নেমে গেছে। বাইডেনের শাসনকালও ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির সম্মুখীন হয়েছিল এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতায় খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে বয়স সংক্রান্ত উদ্বেগ দেখা দিলে তিনি তার পুনর্নির্বাচনী লড়াই বাতিল করেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষভাগে বাইডেনের জনসমর্থন সর্বনিম্ন ৩৫ শতাংশে নেমে আসে।
জরিপে মাত্র ৩৪ শতাংশ উত্তরদাতা ইরানে হামলার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। এ সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে উৎপাদিত তেল ও গ্যাসের একটি বড় অংশকে বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আর ব্যবসায়ীরা তেলের এই অতিরিক্ত খরচ গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য স্থানে তা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ট্রাম্প শুরুতেই বলেছিলেন, এই সংঘাত কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখতে ইরানে বোমা হামলা চালানো প্রয়োজন ছিল। এই মাসের শুরুর দিকে রিপাবলিকান এই নেতা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নির্বাচনের "পরপরই" যুদ্ধ শেষ হবে। তবে ইরান হাল ছাড়ার কোনো লক্ষণ দেখায়নি এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেহরান ও তার মিত্ররা জ্বালানি তেলের বাজারে নতুন করে বিঘ্ন ঘটানোর হুমকি দিয়েছে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৮২ শতাংশ—যার মধ্যে ১০ জনের মধ্যে ৯ জন ডেমোক্র্যাট এবং তিন-চতুর্থাংশ রিপাবলিকান সমর্থক রয়েছেন। তারা বলেছেন, এই সংঘাত সম্ভবত "দীর্ঘ মেয়াদে" চলবে।
জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের কাছে যখন জানতে চাওয়া হয় তারা মধ্যবর্তী নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন, তখন তারা রিপাবলিকানদের (৩৫%) চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের (৪৩%) বেশি পছন্দ করেছেন। চলতি বছর রয়টার্স/ইপসোসের জরিপগুলোতে ৮ পয়েন্টের এই ব্যবধানই ডেমোক্র্যাটদের প্রাপ্ত সবচেয়ে বড় ব্যবধান।
রিপাবলিকানদের জন্য কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোও ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরের এজেন্ডা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি করতে পারে। কংগ্রেসে ভোটাভুটির পরিকল্পনা সম্পর্কিত এই জরিপের ফল পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ কোন দলকে কংগ্রেসের দায়িত্বে দেখতে চায় তার একটি সার্বিক চিত্র তুলে ধরে, যদিও এই ফলাফল সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণকারী অঙ্গরাজ্যভিত্তিক ও আসনভিত্তিক প্রতিযোগিতার সব সূক্ষ্ম বিষয়গুলোর প্রতিফলন নয়।
অভিবাসন ইস্যুতে ট্রাম্প তার নিজ দল রিপাবলিকানদের মাঝে এখনও বেশ জনপ্রিয়—যেখানে দলের ৭৯ শতাংশ কর্মী-সমর্থক তাকে সমর্থন করেন। তবে সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ এই বিষয়ে তার গৃহীত নীতি সমর্থন করেন এবং ৫৫ শতাংশ মানুষ অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
কংগ্রেসের কিছু রিপাবলিকান মিত্র বলেছেন, দেশে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের বের করে দেওয়ার জন্য তার এই আক্রমণাত্মক অভিযান সম্প্রতি আমেরিকায় অভিবাসি হওয়া স্বজন থাকা ভোটারদের (যেমন হিস্পানিক বা ল্যাটিনো জনগোষ্ঠীর একটি অংশ) দূরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
অপরাধ দমনে ট্রাম্পের নেওয়া পদক্ষেপকে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৩৫ শতাংশ সমর্থন জানিয়েছেন, পক্ষান্তরে ৫০ শতাংশ মানুষ এর বিরোধিতা প্রকাশ করেছেন। রয়টার্স/ইপসোসের এ জরিপটি অনলাইনে পরিচালিত হয় এবং এতে দেশজুড়ে ১,২৭৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক এতে প্রতিক্রিয়া জানান।
জরিপটিতে ভুলের সম্ভাব্য মাত্রা ৩ শতাংশ।
