কিউবার ওয়াকআউট, এআই-এর নতুন নামকরণ, ইরানকে ‘ধ্বংসের’ হুঁশিয়ারি: জাতিসংঘে ট্রাম্পের ভাষণে যা যা ছিল
মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে বিশ্বনেতাদের সামনে নিজের প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির সাফল্য তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে সেখানে উপস্থিত কয়েকটি দেশের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘ ওই ভাষণে ইরানের যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কিউবা এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভূমিকার মতো বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
আমেরিকার সামরিক শক্তি নিয়ে বার্তা দিলেন ট্রাম্প
জাতিসংঘের বিরুদ্ধে উগ্র বামপন্থী এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ট্রাম্প।
মঙ্গলবারের ভাষণে নিজের প্রশাসনের সাফল্য তুলে ধরার পাশাপাশি নিজেকে শান্তিরক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে কয়েকটি দেশকে কড়া হুঁশিয়ারিও দেন।
শান্তি চুক্তি না হলে 'ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস' করে দেওয়ার, মাদক চোরাচালানের সন্দেহে ছোট নৌযানে প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত রাখার এবং কিউবার সরকারকে উৎখাত করা হতে পারে বলে বার্তা দেন তিনি।
জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন মনে করলে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিক শক্তি ব্যবহারে প্রস্তুত রয়েছে বলেই বক্তব্যে স্পষ্ট করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, তিনি 'আমেরিকার শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা' করছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের 'অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শক্তির' কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'পশ্চিম গোলার্ধের কোথাও আমেরিকার জন্য হুমকি তৈরি করার সুযোগ আর যুক্তরাষ্ট্র দেবে না।'
তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আবারও বিশ্ববাসীর সামনে 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির জোরালো ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
কিউবাকে 'ব্যর্থ রাষ্ট্র' বলায় ট্রাম্পের ভাষণের সময় বেরিয়ে যায় কিউবার প্রতিনিধিদল
প্রতিবেশী কিউবাকে 'একেবারেই ব্যর্থ রাষ্ট্র' আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তার প্রশাসন 'কিউবার পরিস্থিতিতে মৌলিক পরিবর্তন' আনার জন্য কাজ করছে। তিনি বলেন, 'এর পতন ঘটবেই।'
ট্রাম্পের বক্তব্য চলার সময় কিউবার প্রতিনিধিদল অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
গত এক বছরে কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের সমালোচনায় আরও সরব হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মঙ্গলবার তিনি বলেন, দেশটি 'প্রচণ্ড চাপের' মধ্যে রয়েছে এবং 'আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ব্যর্থ হচ্ছে'।
তবে কিউবার পরিস্থিতিতে ট্রাম্প কী ধরনের পরিবর্তন চান, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
এদিকে, ট্রাম্পের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে 'ভুয়া তথ্য' ছড়ানোর অভিযোগ এনেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রদ্রিগেজ লেখেন, 'কিউবা একটি পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্র এবং তাদের সেই অধিকার রয়েছে—এটি মেনে নেওয়ার সক্ষমতা মার্কিন সরকারের নেই।'
শান্তি চুক্তি না হলে 'ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস' করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ট্রাম্প ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সংঘাতের অবসানে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো না গেলে তিনি 'ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস' করতে পারেন।
যুদ্ধ বন্ধে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সম্ভাব্য সমঝোতা হতে পারে বলে জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের বক্তব্যে তার পরিচিত চাপ প্রয়োগের কূটনীতির কৌশলই ফুটে ওঠে—একদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখা, অন্যদিকে ব্যাপক সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দেওয়া।
এর আগেও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পসহ মার্কিন কর্মকর্তাদের 'উদ্বেগজনক বক্তব্য' নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্প এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো 'সম্পূর্ণ ধ্বংস' করে দিতে পারে।
মঙ্গলবারের ভাষণে ইরানের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য 'বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ' ও 'কোনো আশা' না থাকার মতো মন্তব্যও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে এমন হুমকি দেওয়ার বিষয়টি কিছুটা পরিহাসেরও। কারণ, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষার লক্ষ্যেই জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
গ্রিনল্যান্ড চুক্তির প্রশংসা ট্রাম্পের
গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে নতুন একটি চুক্তিরও প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। তিনি জানান, এই চুক্তির আওতায় আর্কটিক অঞ্চলের ওই ভূখণ্ডে দুটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করবে যুক্তরাষ্ট্র।
চুক্তির বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, 'আমেরিকা মহাদেশের পাশাপাশি ইউরোপকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করার পূর্ণ সক্ষমতা আমাদের থাকবে।'
শুক্রবার প্রথমবারের মতো চুক্তিটির ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ন্যাটোর প্রতিরক্ষা জোটকে 'অনেক বেশি শক্তিশালী' করবে।
ট্রাম্পের ভাষণের কিছুক্ষণ পর জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের একটি যৌথ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
গ্রিনল্যান্ড একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হলেও এটি ডেনমার্ক রাজ্যের অংশ। এর পররাষ্ট্রনীতি মূলত ডেনমার্কই পরিচালনা করে।
এআইয়ের নতুন নামকরণের চেষ্টা ট্রাম্পের
নামকরণ নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহের কথা নতুন নয়। এবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' (এআই)-এর নতুন নাম দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। এআইকে 'সুপার ইন্টেলিজেন্স' নামে অভিহিত করেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, 'আর্টিফিশিয়াল শব্দটি ব্যবহার করলে এটিকে নকল কিছু মনে হয়। এটি নকল নয়, বরং অসাধারণ। তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।'
এরপর ট্রাম্প বলেন, 'সুপার ইন্টেলিজেন্সের নতুন জগতে স্বাগতম।'
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, এআই উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে শীর্ষে থাকতে হবে। গত সপ্তাহে তিনি বলেন, 'এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, সে-ই জিতবে।'
এআই খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা নতুন বিধিনিষেধ আরোপের ঘোর বিরোধী ট্রাম্প। এ কারণে জাতিসংঘে জড়ো হওয়া অনেকের অবস্থানের সঙ্গে তার মতপার্থক্য রয়েছে।
