যুক্তরাষ্ট্র সফরে নেতানিয়াহুর চুল ও মেকআপের পেছনেই খরচ ১৩,০০০ ডলার, ধূমপানের বিল ৫০০!
তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা এক আবেদনের ভিত্তিতে বুধবার কিছু নথি প্রকাশ করেছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তাতেই উঠে এসেছে ২০২৫ সালে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফরের দীর্ঘ খরচের খতিয়ান। ওই এক সফরেই তার চুল ও মেকআপের পেছনে খরচ হয়েছে ১৩ হাজার ডলারের বেশি। সেইসঙ্গে রয়েছে ৫০০ ডলারের 'স্মোকিং ফি', দূতাবাসের একটি দরজা মেরামতের জন্য ২৯৫ ডলার ও ট্রাফিক আইন ভাঙায় ১২৫ ডলারের জরিমানার বিল।
হাজলাকা নামক এক সংস্থার আইনজীবী ইলাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই এসব নথি সরবরাহ করা হয়েছে। নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে বিলিং টেবিল, সফরসঙ্গীদের তালিকা ও নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফরের বিস্তারিত সূচি।
জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে নথির বেশ কিছু অংশ ঢেকে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আরও জানানো হয়েছে, কিছু কিছু বিল পর্যালোচনার কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
ফেব্রুয়ারিতে নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফরের খরচে সবচেয়ে চমকপ্রদ এন্ট্রি হলো মেকআপ আর্টিস্ট ও হেয়ারড্রেসারের বিল। মেকআপের জন্য ৬ হাজার ৭৭২ ডলার ও চুল কাটা ও কেশশয্যার জন্য ৬ হাজার ৭৪৭ ডলার—সব মিলিয়ে শুধু সাজগোজেই খরচ হয়েছে ১৩ হাজার ৫১৯ ডলার।
ওই সফরে নেতানিয়াহুর স্যুইটের ভাড়া ছিল ২৫ হাজার ডলার। স্যুইটের ভেতরে খাবারের বিল এসেছে ৫১১.৫০ ডলার ও লন্ড্রি খরচ প্রায় ২৯৮ ডলার।
ছোট একটি এন্ট্রি আলাদা করে নজর কাড়ে। সেখানে লেখা: 'স্মোকিং ফি—কনফারেন্স রুম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্স'। এর বিল ৫০০ ডলার।
এছাড়া আলোকসজ্জা, ফটোগ্রাফি, যাতায়াত, ওয়ার্ক রুম, হালকা নাশতা ও সফরসঙ্গীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতির অতিরিক্ত খরচের হিসাবও রয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
মেকআপ আর্টিস্ট ও হেয়ারড্রেসারে ফের ৬ হাজার ডলার পার!
এপ্রিলের যুক্তরাষ্ট্র সফরেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এবার মেকআপ আর্টিস্টের জন্য ৩ হাজার ৩৬ ডলার এবং হেয়ারড্রেসারের জন্য আরও ৩ হাজার ৩৬ ডলার খরচ হয়েছে। মোট বিল এসেছে ৬ হাজার ৭২ ডলার।
ওই প্রতিবেদনেই 'প্রিন্টার ও টোনার' বাবদ ১ হাজার ২২৮ ডলার ও একটি 'হোয়াইটবোর্ড ও কর্কবোর্ড'-এর জন্য প্রায় ২৪০ ডলারের হিসাব দেখানো হয়েছে।
এপ্রিলের ওই সফরে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে ওয়াশিংটনের ওয়াটারগেট হোটেলে, ৫১ হাজার ৬৬১ ডলার। সব মিলিয়ে ওই সফরের বিস্তারিত মোট বিল দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৯০০ ডলার।
এরপর নেতানিয়াহুর জুলাইয়ের সফরে খরচের অঙ্ক আরও বেড়ে যায়। ওই সফরে ওয়াশিংটনের উইলার্ড ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের বিল এসেছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৭০১০ ডলার।
ওই সফরে একটি তালা মেরামতের কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে ২৯৫ ডলার। খরচের বিবরণে লেখা: 'দূতাবাসের প্রবেশপথের দরজা মেরামত—প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় যান্ত্রিক ত্রুটি'।
নথিপত্রে অ্যামাজন, কস্টকো, টার্গেট ও স্টেপলসের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন কেনাকাটার হিসাবও উঠে এসেছে। পাশাপাশি হালকা নাশতা, অফিসের সরঞ্জাম, যানবাহন, কাস্টমস ও ওভারটাইমের মতো বিদিধ খরচের বিবরণও রয়েছে।
জুলাইয়ের সফরের মোট খরচের শেষপর্যন্ত দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৭০০ ডলার।
সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন সফরের খরচের হিসাবে চোখে পড়ে আরেকটি এন্ট্রি—একটি ট্রাফিক জরিমানার বিল বাবদ ১২৫ ডলার। নথিতে বিবরণ দেওয়া: 'ট্রাফিক টিকিট—প্রধানমন্ত্রীর সফর ০৯.২৫'।
ওই সফরে নিউইয়র্কের লোয়েস রিজেন্সি হোটেলে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত স্যুইটের জন্য প্রতি রাতে গুনতে হয়েছে ৫ হাজার ৯৯৯ ডলার। সব মিলিয়ে শুধু রুম ভাড়াতেই গেছে ৪১ হাজার ৯৯৩ ডলার।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালীন নিউইয়র্কজুড়ে হোটেলের চাহিদা বেশি থাকায় খরচ বেশি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে নথিতে।
নথির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া সফরসূচি অনুসারে, প্যারাগুয়ে, সার্বিয়া ও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, সাধারণ পরিষদে ভাষণ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা ও ফক্স নিউজকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নেতানিয়াহু। এরপর তিনি ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
তবে নথি অনুসারে, স্যুইটের ভাড়ায় সব রেকর্ড ভেঙেছে বছরের শেষে ফ্লোরিডা সফরের এক খতিয়ান। সেখানে প্রতি রাতের জন্য বিল উঠেছে ১০ হাজার। পাঁচ রাতের মোট ৫০ হাজার ডলার।
হিসাবের তালিকা অনুসারে, সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সাধারণ কক্ষের জন্য গড়ে প্রতি রাতে খরচ হয়েছিল ২৫০ ডলারের কাছাকাছি।
আনুষ্ঠানিক শিডিউল অনুযায়ী, ফ্লোরিডা সফরে নেতানিয়াহু বৈঠক করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে। এছাড়া ফোনে কথা হয় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গেও।
পরবর্তী সূচিতে ছিল ফক্স নিউজ ও নিউজম্যাক্সকে সাক্ষাৎকার, ক্যাসিনো মোগল স্টিভ উইনের সঙ্গে স্খাত, ওরাকলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসনের বাসভবনে নৈশভোজ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক।
খরচের এমন খতিয়ান সামনে আসার পর তড়িঘড়ি সতর্কতা জারি করেছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তাদের দাবি, নথিতে উল্লেখিত এই অঙ্কগুলো সবসময় চূড়ান্ত খরচের নিখুঁত হিসাব না-ও হতে পারে।
তথ্য অধিকার আইনের আবেদনের জবাবে কার্যালয়টি আরও জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর বিদেশ সফরের যাবতীয় বিল সরাসরি তাদের তহবিল থেকে মেটানো হয় না; বরং এই খরচের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে।
