আটককৃত মার্কিন ডুবোযানটির ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ করতে পারে ইরান
ইরান কর্তৃক মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি ডুবোযান (অ্যান্ডারওয়াটার ড্রোন) আটকের ঘটনা তেহরানকে যানটি পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য 'রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং' (নকশা তৈরি বা অনুকরণ) করার সুযোগ করে দিয়েছে, যা পেন্টাগন এবং ড্রোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডুরিল-এর জন্য একটি বড় ধাক্কা।
তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং অ্যান্ডুরিল ড্রোনটি ইরানের হাতে পড়ার বিষয়টিকে ততটা গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। 'ডাইভ-এলডি' নামের এই ডুবোযানটি মূলত দূরপাল্লার নজরদারি এবং সাগরের তলদেশের মিশনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এটি সামরিক ড্রোনের নতুন প্রজন্মের এমন একটি যান, যা মানুষের প্রত্যক্ষ সাহায্য ছাড়াই টানা কয়েকদিন কাজ চালাতে সক্ষম। অতীতে ইরানের কাছে উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন হারানোর বিষয়গুলোকে ওয়াশিংটন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে।
২০১১ সালে ইরান যখন একটি 'আরকিউ-১৭০ সেন্টিনেল' স্টিলথ নজরদারি ড্রোন আটক করে, তখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রকাশ্যে তেহরানের কাছে বিমানটি ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানান। ইরান পরবর্তীতে দাবি করে যে তারা ড্রোনটির 'রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং' সম্পন্ন করেছে এবং পরে তাদের নিজস্ব তৈরি কিছু মডেল প্রদর্শন করে, যা ওই মার্কিন নকশার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
সম্প্রতি, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানি বাহিনীর হাতে তাদের চালকহীন সামুদ্রিক প্রযুক্তি যেন না পড়ে, সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মার্কিন নৌবাহিনীর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে পারস্য উপসাগরে একটি ইরানি নৌযান যখন একটি 'সেইলড্রোন' চালকহীন সারফেস ভেসেল টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন মার্কিন নৌবাহিনীর একটি টহল জাহাজ এবং একটি এমএইচ-৬০এস সিহক হেলিকপ্টার তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে মোতায়েন করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দখলকৃত ড্রোনটি থেকে ইরানের নির্ণায়ক সামরিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ঘটনাটি তেহরানের জন্য একটি প্রচারণামূলক বিজয় এবং ওয়াশিংটনের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে এক ধাক্কা।
বিশ্বজুড়ে ইরানি দূতাবাসগুলো তাদের ড্রোন হারানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে উপহাস করেছে। ঘানায় অবস্থিত ইরান দূতাবাস এক্স-এ দেওয়া একটি পোস্টে প্রণালি থেকে সাবমার্সিবল ড্রোনটি উদ্ধার করার কথা জানিয়ে লিখেছে, 'এটি এমন এক প্রণালি যা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে যারা এমনকি চিংড়ি মাছের হাঁচিও শুনতে পায়। আমাদের ছেলেরা এটিকে মাছ ধরার জালে প্লাস্টিকের বোতল তোলার মতো করে তুলে এনেছে। একদম অক্ষত। এখনও বোকার মতো মিটমিট করে আলো জ্বলছে। যিনি এর জয়স্টিক ধরেছিলেন, তার প্রতি সমবেদনা।'
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ইউএস নেভি ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, 'ত্রুটিপূর্ণ এই ড্রোনটি ছিল একটি পুরোনো মডেলের, যা কোনো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করত না এবং এতে কোনো গোপনীয় সোনার বা রাডার সরঞ্জামও ছিল না।' প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানডুরিল তাৎক্ষণিকভাবে এ মন্তব্যের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির একজন সিনিয়র ফেলো ফারজিন নাদিমি বলেন, 'অবশ্যই ইরান প্রচারণামূলক বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার প্রতিটি সুযোগই ব্যবহার করবে। এটিিউরানের বিপ্লবী গার্ড-কে (আইআরজিসি) তাদের নিজেদের তৈরি নকশাগুলোর আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।'
হাডসন ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর ডিফেন্স কনসেপ্টস অ্যান্ড টেকনোলজির পরিচালক ও সিনিয়র ফেলো ব্রায়ান ক্লার্ক জানান, ইরান প্রায় নিশ্চিতভাবেই ড্রোনটির হার্ডওয়্যার খোলার বা পরীক্ষা করার চেষ্টা করবে, তবে ড্রোনটির সফটওয়্যারে অন্তর্নির্মিত সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। বন্দি করা আমেরিকান উড়োজাহাজ নিয়ে তেহরানের পূর্ব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'ইরানি প্রকৌশলীরা এর মেকানিক্যাল সিস্টেমগুলো অবশ্যই রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ার (খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করে নতুন করে তৈরি) করতে পারে।'
হায়দ্রাবাদে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস এক্স পোস্টে বলা হয়, 'আগামীকাল সকালে আমাদের রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারদের মাধ্যমে আনবক্সিং অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে!'
এই ঘটনাটি ড্রোনের প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান 'অ্যানডুরিল' এবং এর ক্রেতা 'মার্কিন নৌবাহিনী'-র মধ্যকার বক্তব্যের অমিলকেও তুলে ধরেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডাইভ-এলডি ড্রোনটি ছিল একটি পুরোনো মডেলের যান, যা যান্ত্রিক ত্রুটির শিকার হয়েছিল এবং পানিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে থাকার পর ইরানি বাহিনী এটিকে উদ্ধার করে।
অন্যদিকে, অ্যানডুরিল তাদের ডাইভ-এলডি ড্রোনটিকে বাজারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বহুমুখী উপযোগী বৃহৎ স্বায়ত্তশাসিত ডুবোযান হিসেবে প্রচার করে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, এটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টানা ১০ দিন পর্যন্ত পরিচালনায় সক্ষম। মার্কিন নৌবাহিনীতে ব্যবহারের পাশাপাশি, ডাইভ-এলডি ড্রোনটি অস্ট্রেলিয়ার নতুন 'গোস্ট শার্ক' নামক বৃহৎ আন্ডারওয়াটার ড্রোনের উন্নয়নে পরীক্ষার যান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, 'এটি এমন একটি বিষয় যা ইরান নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে অত্যন্ত পারদর্শী বলে প্রমাণ করেছে। তারা ঘটনাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চাইছে যেন এটি আমেরিকার অক্ষমতা, আর সেই সুযোগে তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়টি ফুটিয়ে তুলছে।'
