শীঘ্রই হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌ-পথ চালুর বিষয়ে চুক্তি হবে: ইরান
ইরান আশা করছে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে একটি নতুন নৌপথ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র হামলা ও অন্যান্য শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ না করা পর্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেবে না বলে দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা রোববার জানিয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, প্রস্তাবিত এই নৌপথ দিয়ে কোন জাহাজ প্রবেশ করবে এবং কোন জাহাজ বের হবে, তা তেহরান নিয়ন্ত্রণ করবে।
ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে একটি অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে। প্রস্তাবিত এই নৌপথের কিছু অংশ ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দুই দেশ এসব আলোচনা করছে।
রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা এবং ইরান যেসব কর্মকাণ্ডকে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করছে, সেগুলো থেকে বিরত থাকলেই কেবল তেহরান হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার নিশ্চয়তা দেবে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ সমাপ্তি এবং একটি বিস্তৃত চুক্তির কাঠামো তৈরির জন্য জুনে স্বাক্ষরিত মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারকের মূল সমস্যা ছিল গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার অভাব। মধ্যস্থতাকারীরাও ওই সমঝোতা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিতে পারেননি বলে তিনি জানান।
ওই চুক্তির আওতায় ওয়াশিংটনকে ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে, তেহরানের দায়িত্ব ছিল হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করা। তবে চুক্তিটি বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিরোধের জেরে পরে তা ভেঙে পড়ে।
নতুন নৌপথ নিয়ে আলোচনা চললেও রেজাই জোর দিয়ে বলেছেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি 'সম্পূর্ণ বন্ধ' রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন এই জলপথ দিয়ে সর্বোচ্চ সাত বা আটটি জাহাজ চলাচল করছে। এর মধ্যে পাঁচ বা ছয়টি জাহাজ ইরানের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য বহন করছে।
রেজাইয়ের দাবি, মার্কিন বাহিনী মাঝেমধ্যে ওমানের কাছাকাছি জলসীমা দিয়ে পাঁচ বা ছয়টি জাহাজ চলাচলে সহায়তা করে। তবে তিনি বলেন, এসব জাহাজ সাধারণত হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং অক্ষত অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। তার ভাষ্য, এ ধরনের জাহাজ চলাচলকে কোনোভাবেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া বলা যায় না।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে জলপথটি কতটা খোলা রয়েছে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছে।
রেজাই আরও জানিয়েছেন, ইরান শীঘ্রই হরমুজ প্রণালির আশপাশে একটি নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা করবে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ওই এলাকায় প্রবেশকারী জাহাজগুলোকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা হবে। এরপর তেহরানের অনুমতি ছাড়া এসব জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে না।
তিনি বলেন, ইরান এই জলপথে বিধিনিষেধ আরও কঠোর করছে। তাঁর দাবি, সেখানে তেহরানের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রভাবের চেয়েও বেশি হবে।
সামরিক দিক থেকে রেজাই বলেন, ৪৮ ঘণ্টা আগে ইরান প্রথমবারের মতো দেশটিতে তৈরি একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌযানের বিরুদ্ধে পরীক্ষা করেছে।
দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সমুদ্রপথে সংঘর্ষের সময় তাঁর এসব মন্তব্য আসে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড শনিবার জানিয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দুটি মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর মার্কিন বাহিনী ইরানের তিনটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।
ইরানের ওপর এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব কমিয়ে দেখানোরও চেষ্টা করেছেন রেজাই। তিনি বলেছেন, ইরানের কাছে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি এখনও তেল বিক্রি করছে এবং রপ্তানি করা তেলের অর্থও গ্রহণ করছে।
রেজাইয়ের এসব মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশকারী ও সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তেহরানের তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। তেল রপ্তানি ইরান সরকারের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।
