ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটছে, হয়ে উঠছেন ‘আরও বিপজ্জনক’: দাবি নোবেলজয়ীর
নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী এক ব্যক্তি সতর্ক করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য এবং তার হাতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা তাকে এখন 'আরও বিপজ্জনক' করে তুলেছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হেনরি ডেভিড আব্রাহাম সেই ৩৬ জন চিকিৎসকের একজন, যারা ৩০ এপ্রিল একটি খোলা চিঠিতে সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করে ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। চিঠিটি কংগ্রেসের সরকারি নথিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে ট্রাম্পের 'চিন্তাশক্তির উল্লেখযোগ্য অবনতি' এবং 'বিচারবোধ ও আবেগ-আচরণ নিয়ন্ত্রণের গুরুতর দুর্বলতা' নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছিল।
চিঠিটি লেখার তিন মাস পর চলতি সপ্তাহে সিরিয়াসএক্সএমের উপস্থাপক ডিন ওবেইদাল্লাহর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আব্রাহামকে জিজ্ঞেস করা হয়, তার সেই মূল্যায়নে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না।
আব্রাহাম বলেন, 'হ্যাঁ, যদি কিছু হয়ে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।'
১৯৮৫ সালে পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক চিকিৎসক সংগঠনকে দেওয়া শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের অংশীদার আব্রাহাম বলেন, 'আমি বলতে চাচ্ছি, কোনো বিমানচালকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের যে লক্ষণগুলোর অর্ধেকও যদি থাকত, তাহলে আমরা তাকে বিমানে উঠতে দিতাম না। নিশ্চিতভাবেই আমরা তার সঙ্গে বিমানযাত্রা করতে চাইতাম না।'
তিনি আরও বলেন, 'এটি কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। অথচ আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্যকে গোপনীয়তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়।'
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইংল দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, 'হেনরি ডেভিড আব্রাহাম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দূর থেকে রোগ নির্ণয়ের চর্চা করা ট্রাম্প-বিদ্বেষে আক্রান্ত এক পরাজিত ব্যক্তি। তিনি চিকিৎসা পেশার জন্য লজ্জাজনক।'
এপ্রিলের ওই চিঠিতে আব্রাহাম ও অন্য চিকিৎসকেরা স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, তারা ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে পরীক্ষা করেননি। তবে তারা বলেছিলেন, তারা 'তার আচরণ ও বক্তব্য গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।'
সাক্ষাৎকারে আব্রাহাম প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, যখন একজন ব্যক্তির হাতে হাজার হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেডের নিয়ন্ত্রণ থাকে, তখন এর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
তিনি বলেন, 'যখন একজন ব্যক্তির হাতে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারে এককভাবে প্রবেশাধিকার থাকে, তখন বিষয়টি পাগলামির পর্যায়ে পড়ে। আর আমরা সেটিই করছি।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি মনে করি, রাগের বশে, প্রচণ্ড ক্ষোভে, বিভ্রান্তির মধ্যে অথবা নিজের আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার ঝুঁকি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি। তাই হ্যাঁ, তিনি আরও বিপজ্জনক।'
তিনি আরও দাবি করেন, ট্রাম্প মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় গোপন যোগাযোগব্যবস্থা বা নিয়ন্ত্রণ-উপকরণের দিকে হাত বাড়িয়ে মাত্র '১০ সেকেন্ডের' মধ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ট্রাম্প, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়া সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি, তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্নের মুখে রয়েছেন। দিনের বেলায় তার ঘুমঘুম ভাব, হাতে বারবার কালশিটে পড়া এবং গোড়ালি ফুলে যাওয়ার মতো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মে মাসে সিএনএনের চিকিৎসাবিষয়ক বিশ্লেষক চিকিৎসক জনাথন রাইনার বলেন, 'প্রেসিডেন্টের দিনের বেলায় প্রচণ্ড ঘুমঘুম ভাব রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'তিনি প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়েন। লোকজন তার সঙ্গে কথা বলার সময়ও তিনি একাধিকবার ওভাল অফিসে ঘুমিয়ে পড়েছেন।'
রাইনার আরও বলেন, 'দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা একটি গুরুতর অসুস্থতা। এর ফলে স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের জ্ঞানীয় সক্ষমতা কমে যেতে পারে।'
হোয়াইট হাউস অবশ্য এসব দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে, ৮০ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনের জন্য সম্পূর্ণ সক্ষম।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ইংল বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন, সবচেয়ে সহজে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম এবং সবচেয়ে কর্মচঞ্চল প্রেসিডেন্ট।'
ট্রাম্পের হাতে কালশিটে পড়ার বিষয়টি হোয়াইট হাউস ঘন ঘন করমর্দনের কারণে হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করেছে। আর তার গোড়ালি ফুলে যাওয়ার কারণ হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী শিরাজনিত রক্তসঞ্চালন সমস্যাকে দায়ী করা হয়েছে।
ট্রাম্প নিজেও দাবি করেছেন যে তিনি চমৎকার স্বাস্থ্যের অধিকারী। মে মাসে শারীরিক পরীক্ষা শেষে তিনি বলেন, 'সবকিছুই পুরোপুরি নিখুঁতভাবে ঠিকঠাক পাওয়া গেছে।'
এদিকে জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য নিয়ে হোয়াইট হাউসের দেওয়া তথ্যের বিষয়ে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে।
জুন মাসে কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে ৫৯ শতাংশ ভোটার বলেছেন, প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য নিয়ে হোয়াইট হাউস যথেষ্ট স্বচ্ছ নয়।
অন্যদিকে, ৩৪ শতাংশ ভোটার বলেছেন, প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য সম্পর্কে হোয়াইট হাউস সৎ ও সত্যনিষ্ঠ তথ্য দিচ্ছে।
