প্রাণঘাতী বন্যার পর চীন সীমান্তে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণ করছে নেপাল
চীন সীমান্তের একটি অংশে ভূমিধসের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করছে নেপাল। এ জন্য ভূমিকম্প শনাক্তকারী যন্ত্র, ক্যামেরা ও উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন নেপাল সরকারের দুজন কর্মকর্তা। গত সপ্তাহে হিমবাহধস থেকে সৃষ্ট বন্যায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার এক সপ্তাহ পর এই পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
নেপালের রাসুয়া জেলার সীমান্তবর্তী জনপদ তিমুরেতে এসব সরঞ্জাম স্থাপন করা হচ্ছে। চীনের সীমান্তবর্তী একই নদীপথের এলাকায় এই জনপদটি অবস্থিত, যে পথ ধরে একটি হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ কাদা, পানি ও পাথরের বিশাল ঢল পাহাড়ি উপত্যকার মধ্য দিয়ে ধেয়ে এসেছিল।
দুই দেশ মিলিয়ে অন্তত এক হাজার ১১৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই নেপালের নাগরিক। এ ছাড়া প্রায় চার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
যে সীমান্ত এলাকায় এসব যন্ত্র স্থাপন করা হবে, সেটি চীনের তিব্বত অঞ্চলের সঙ্গে নেপালের সীমান্তের অন্যতম স্পর্শকাতর অংশ। উচ্চভূমিতে অবস্থিত এই এলাকাটি নেপাল, চীন ও ভারত—তিন দেশেরই ঘনিষ্ঠ নজরদারির মধ্যে রয়েছে।
নেপাল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এই পরিকল্পনার ঘোষণা দেয়নি। আর রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন, কারণ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য তাদের আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছিল না।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে এক ধরনের তাগিদ অনুভূত হচ্ছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, 'বড় ধরনের ওই দুর্যোগের পর ভূপ্রকৃতি এখনো পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে এর কারণে আরও কয়েকটি ভূমিধসের ঘটনা ঘটতে পারে।'
হেলিকপ্টারে জরিপ
পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ হলো উপগ্রহভিত্তিক একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা, যার নাম ভিএসএটি (ভেরি স্মল অ্যাপারচার টার্মিনাল)। এর মাধ্যমে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেলেও পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের আওতায় রাখা হবে। ফলে নতুন কোনো বিপদ শনাক্ত করা এবং দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে জানিয়েছেন দুই কর্মকর্তা।
গত সপ্তাহের বন্যায় সীমান্তের কাছে অন্তত চারটি পানির পরিমাপক কেন্দ্র অচল হয়ে যাওয়ার সময় এমন যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটেছিল।
এক কর্মকর্তা বলেন, 'আমাদের কাছে সেন্সর ও পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ছিল, কিন্তু সেগুলো ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হতো না।' তিনি জানান, আগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাটি কয়েক মিনিট পরপর একটি বার্তা পাঠাত। কিন্তু বুধবারের বন্যায় সেটিও ভেসে যায়।
তিনি বলেন, 'আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত না থাকায় সেগুলো কখন বিকল হয়ে পড়েছিল, তা পরীক্ষা করতে পারিনি।'
আপাতত নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ একটি মাত্র স্থানে ক্যামেরা, সেন্সর ও উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করবে। পরে আরও স্থানে এগুলো স্থাপন করা হবে বলে দ্বিতীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, এসব সরঞ্জাম কোথায় স্থাপন করা হবে, তা নির্ধারণ করতে কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে হেলিকপ্টারে করে ওই এলাকা জরিপ করেছেন।
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ধর্মরাজ উপ্রেতি বলেন, বন্যায় ভেসে যাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলোর পরিবর্তে নতুন পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন ক্যামেরাও বসানো হবে।
তিনি বলেন, 'এর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ নদীর পানির প্রবাহের তাৎক্ষণিক তথ্য পাবে। এরপর নতুন কোনো বন্যা শনাক্ত হলে কর্তৃপক্ষ সেই অনুযায়ী খুদে বার্তার মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠাবে।'
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নেপালে অবস্থিত দেশটির দূতাবাস রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।
দুর্যোগের পর থেকে চীন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ছবি, উপগ্রহ ও পানিসম্পর্কিত তথ্য এবং উজানে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বাঁধের হ্রদ নিয়ে আগাম সতর্কতার তথ্য নেপালের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে।
হাতে থাকবে মাত্র কয়েক মিনিট
হিমবাহ ধসে সীমান্তের কাছে তৈরি হওয়া দুটি প্রাকৃতিক বাঁধের হ্রদ থেকে তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা এখন কেটে গেছে। কারণ হ্রদ দুটির পানি বের হয়ে গেছে। তবে পাহাড়ি ভূখণ্ড এখনো অস্থিতিশীল এবং তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা।
ভূমিধস থেকে সৃষ্ট যেকোনো ঘটনার জন্য একটি আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা থাকলে নতুন কোনো বন্যার বিষয়ে ভাটির দিকে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে সতর্ক করার জন্য কর্তৃপক্ষ মাত্র কয়েক মিনিট সময় পাবে। সময়টি খুবই অল্প হলেও মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহের বন্যা সকাল ৮টা ৩২ মিনিটে একটি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রে আঘাত হানে। কিন্তু জনসাধারণের জন্য সতর্কবার্তা জারি করা হয় সকাল ৯টা ১৩ মিনিটে।
দুর্যোগের কয়েক মাস আগে থেকেই নেপাল চীনের কাছে হিমবাহের গতিবিধি এবং পানির উচ্চতা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ও তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানের জন্য অনুরোধ জানিয়ে আসছিল। এখন নেপালের কর্মকর্তারা দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করার পরিকল্পনা করছেন।
