মার্কিন বিচার বিভাগ, নাসা, সিনেট ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ঢুকে পড়েছিল ‘চীনা হ্যাকার’রা—দাবি যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্র বুধবার জানিয়েছে, তারা চীনের একটি হ্যাকিং অভিযান ব্যাহত করেছে। এ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, নাসা, ফেডারেল রিজার্ভ, সিনেটসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল সরকারি সংস্থার সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করেছে বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছে।
এক বিবৃতিতে বিচার বিভাগ জানিয়েছে, হ্যাকিং অভিযানে ব্যবহৃত 'কিউস্ক্যান' এবং 'কিউটিরাউটার' নামের দুটি হ্যাকিং প্ল্যাটফর্মের ডোমেইন তারা জব্দ করেছে।
একটি হলফনামায় (অ্যাফিডেভিট) প্রকাশ পেয়েছে যে—যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ, স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার চারটি বেনামী বেসরকারি কোম্পানিও এই হ্যাকারদের লক্ষ্যবস্তু ছিল।
ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্র ইমেইলে জানিয়েছেন, বিচার বিভাগের বিবৃতিতে উল্লিখিত নির্দিষ্ট ঘটনাগুলো সম্পর্কে তারা অবগত নন, তবে 'চীন সরকার আইন অনুযায়ী সব ধরনের সাইবার হামলার তীব্র বিরোধিতা করে এবং এর বিরুদ্ধে লড়াই করে।'
মুখপাত্র আরও বলেন, সাইবার নিরাপত্তার বিষয়গুলো ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে 'কলঙ্কিত বা হেয়' করছে। জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে অতিরঞ্জিত করে চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর বৈষম্যমূলক বিধিনিষেধ আরোপের অজুহাত হিসেবে এটি ব্যবহার করার বিরোধিতা করে চীন। একই সঙ্গে চীনা কোম্পানিগুলোর বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় দেশটি দৃঢ় অবস্থানে থাকবে।
বিচার বিভাগ জানিয়েছে, প্ল্যাটফর্ম দুটি পরিচালনা করত চীনভিত্তিক নানজিং সিনজিউওয়েই নেটওয়ার্ক টেকনোলজি কোম্পানি। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের মধ্যে চীনের বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি এবং দেশটির সামরিক বাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) ছিল।
তবে এ বিষয়ে নানজিং সিনজিউই কোম্পানির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
২০১৮ সাল থেকে হ্যাকিংয়ের চেষ্টা
আদালতের হলফনামা অনুযায়ী, হ্যাকাররা অন্তত ২০১৮ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সংবেদনশীল নেটওয়ার্কগুলো হ্যাক করতে তাদের নিজস্ব তৈরি টুল বা সফটওয়্যার ব্যবহার করে আসছিল।
তবে তাদের সব চেষ্টা সফল হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালের আগস্টে হ্যাকাররা একটি ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক-এর দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নাসার নেটওয়ার্কে প্রবেশের ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল।
হলফনামা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হ্যাকাররা তিনটি বেনামী জ্বালানি বিভাগের ল্যাবরেটরি, এনআইএইচ , একটি বেনামী স্বাস্থ্য ও মানবসেবা সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে সফলভাবে অনুপ্রবেশ বা হ্যাক করতে সক্ষম হয়েছিল।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই, এনএসএ এবং মার্কিন সাইবার কমান্ডের যৌথ সাইবার নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় বিগত বছরগুলোতে হওয়া একাধিক হ্যাকিংয়ের ঘটনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের মে মাসে বেশ কয়েকটি বেনামী প্রতিরক্ষা ঠিকাদার কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলভাবে তথ্য চুরির ঘটনাও রয়েছে।
হ্যাকাররা দুর্বলতা খুঁজে বের করতে নেটওয়ার্ক স্ক্যান করেছিল এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের মার্চ মাসে মার্কিন সিনেট এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালের নেটওয়ার্কে প্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল।
এ বিষয়ে নাসার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, সংস্থাটি সুনির্দিষ্ট কোনো সাইবার নিরাপত্তা ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করে না। অন্যদিক, স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ এ সংক্রান্ত সব প্রশ্ন বিচার বিভাগের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হ্যাকিং গ্রুপগুলো মার্কিন সরকারের সংবেদনশীল ও বেসরকারি নেটওয়ার্কগুলোতে বারবার হানা দিয়েছে। গত মার্চ মাসে এফবিআই মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছিল যে, হ্যাকাররা তাদের তদন্তাধীন ব্যক্তিদের ফাইল থাকা কিছু নেটওয়ার্কে প্রবেশ করেছে, যার পেছনে চীন জড়িত ছিল বলে পরবর্তীতে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। এছাড়া মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের কমিটির নেটওয়ার্ক এবং বেশ কয়েকটি বড় টেলিযোগাযোগ কোম্পানিতে হওয়া সাইবার হামলার পেছনেও চীনা হ্যাকারদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
চীনা সাইবার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে বেসরকারি সাইবার নিরাপত্তা ঠিকাদার কোম্পানিগুলোই সাধারণত এই ধরনের হাই-প্রোফাইল হ্যাকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান 'সেন্টিনেলওয়ান'-এর চীন বিষয়ক বিশ্লেষক ডাকোটা ক্যারি বলেন, 'গত এক দশকে চীনে এই ধরনের আক্রমণাত্মক সাইবার সেবা দেওয়া কোম্পানির সংখ্যা অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।'
